পুরুষরা যখন হিংসার শিকার হয়

পুরুষদের উপর হিংসার ঘটনার কথা খুব কম শোনা যায় বা সেই খবর জানাজানি হয় না। এই বিষয়টি প্রায়শই লুকিয়ে রাখা হয় এবং পুরুষরা এমন ঘটনার কথা চেপে যায়। সাধারণভাবে এমন ঘটনার কথা জানাজানি হলেও তাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। এই বিষয়টিকে সমস্যা মনে না করে, একে ঘিরে কলঙ্কের বোধ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এতটাই বেশি যে আলাপ-আলোচনা করাই নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়।

এবিষয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেব কী বলছে?

সারা পৃথিবীর সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেব অনুযায়ী দেখা গিয়েছে যে ছোটবেলায় মেয়েদের তুলনায় ছেলেরাই বেশি মারধর খায় এবং তারপর যত বয়স বাড়তে লাগে তত ছেলেরা আক্রমণাত্মক বা হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। ছেলেদের শুধুমাত্র যে হিংসাত্মক কাজকর্মের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা নয়, প্রায়শই তারা হিংসার শিকারও হয়। ভারতে ২০০৭ সালে নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের (এমডব্লিউসিডি) দ্বারা করা এক সমীক্ষা অনুযায়ী-

  • যে সব শিশু দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে (অন্যের দ্বারা মারধর বা অন্য কোনওভাবে করা শারীরিক আক্রমণ) তার মধ্যে ছেলের সংখ্যা হল ৫৪.৬৮ শতাংশ
  • যে সব শিশু তাদের পারিবারিক পরিবেশে দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদের মধ্যে ছেলেদের পরিমাণ ৫২.৯১ শতাংশ; এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা-মায়েরাই এহেন নির্যাতন করেছে বলে দেখা গিয়েছে
  • পথ শিশু বা ফুটপাথে বাস করা শিশু যারা তাদের পরিবারের সদস্য বা অন্যদের দ্বারা দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে তার মধ্যে ৬৫.৯৯ শতাংশই হল ছেলে

২০১৫-১৬ সালে জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে বা এনএফএইচএস-৪)-র সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ''চিকিৎসা সম্পর্কীয় কারণের জন্য  নয় (দুর্ঘটনা, হিংসা, বিষপ্রয়োগ, হত্যা বা আত্মহত্যা) এমন মৃত্যুর হার মহিলাদের তুলনায় (৮ শতাংশ) পুরুষদের মধ্যেই বেশি ঘটেছে (১২ শতাংশ)। এই ঘটনা ১৫  থেকে ২৯ বছর বয়সি পুরুষ ও মহিলাদের জীবনে বেশি ঘটে, আর যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তার অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সি পুরুষদের জীবনেই ঘটে।'' হিংসার সংখ্যা এবং কারণ গ্রাম ও শহরের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়।

পুরুষদের উপর এহেন হিংসার সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও এটাই সত্যি যে তারা কখনোই এই হিংসার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় না। কারণ তাদের মনে ভয় থাকে যে এজন্য তাদের গায়ে তকমা লেগে যাবে, তারা প্রত্যাখ্যাত হবে, তারা অন্যদের কাছে  মজার পাত্র হয়ে উঠবে, অন্যদের দ্বারা বুলি হবে বা নিজের কাজ হারিয়ে ফেলবে। এভাবে হিংসার ঘটনা লুকিয়ে রাখার জন্য সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

হিংসার সংস্পর্শে আসা

আমাদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শাস্তি দেওয়া বা মারধর করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। আর এর ফলেই ছেলেদের মনে বিশ্বাস জন্মায় যে পুরুষ মাত্রই হিংসাত্মক বা আক্রমণাত্মক হবে। বয়স বাড়ার সাথে-সাথে তাদের মধ্যে হিংসা এবং অন্যদের ভয় দেখানোর প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করে যা পূর্ণবয়সে পৌঁছে উগ্র রূপ ধারণ করে। এর অর্থ হল যে প্রাপ্তবয়সে তাদের আচরণ আক্রমণাত্মক হতে পারে, তারা হিংসার মতো অপরাধ ঘটাতে পারে বা নিজেরাই কোনও হিংসা বা আক্রমনের শিকার হতে পারে।

এনফল্ড ইন্ডিয়া নামক একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শোইবা সালদানাহ লক্ষ্য করেছেন যে একজন পুরুষের দ্বারা ঘটানো হিংসামূলক আচরণের সুত্রপাত ঘটে শৈশব থেকে বাবাদের সব বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার কারণে - ছেলেকে শাসন করা, কী করবে আর কী করবে না, কী বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে, কোন ধরণের কাজ করবে – যা ছেলেদের মধ্যে হতাশা এবং রাগকে বাড়িয়ে তোলে।

যে পুরুষদের সঙ্গীর মধ্যে রাগ বা হিংসাত্মক আচরণের সমস্যা থাকে তাদের পারিবারিক হিংসার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে তারা এই ঘটনা বাইরে কারোর কাছে বলতেই চায় না কারণ তাদের মনে ভয় থাকে যে তারা অন্যের উপহাসের পাত্র হয়ে উঠবে।

কীভাবে এই ঘটনা পুরুষদের উপর প্রভাব বিস্তার করে?

যে ছেলেটির জীবনে শৈশবে কোনও না কোনও হিংসার প্রকাশ ঘটেছে তার প্রভাব ছেলেটির জীবনে পরবর্তীকালে কীভাবে পড়তে পারে? যদি কোনও পুরুষ ছোটবেলায় হিংসার শিকার হয়ে থাকে তাহলে বড় হয়ে নিজে এমন আচরণ করার প্রবণতা কি বেড়ে যায়?

এই বিষয়টি আরও একটু ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে।

একটি বাচ্চা ছেলে যদি শারীরিক নির্যাতন (যেমন- বাবা বা পরিবারের অন্য কারোর দ্বারা মারধর খাওয়া) এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তাহলে তার মধ্যে নীচের অবস্থাগুলি দেখা দিতে পারে-

  • অসহায়তা- নিয়ন্ত্রণহীনতার বোধ, শক্তি বা ক্ষমতাহীনতা, ভয় পেয়ে কোনও কাজ করতে সক্ষম না হওয়া, নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পরোক্ষ আচরণের প্রকাশ, নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কোনও সঠিক পদক্ষেপ না করা। অসহায়তা এমন একটি বোধ যা প্রত্যেকবার নির্যাতনের ঘটনা ঘটার পরে অনুভূত হয়।
  • বুলিইং-এর শিকার হওয়া- (বুলিইং হল অন্যদের ধমক দেওয়া, ভয় দেখানো, মারধার করা, বা এমন ব্যবহার করা যাতে সে কুণ্ঠিত বোধ করে।) হিংসার ঘটনায় মানসিক ও দৈহিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর এই প্রভাব স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘস্থায়ী- দুই-ই হতে পারে। এই ধরণের হিংসার শিকার হওয়া মানুষের আত্মসম্মান একেবারে তলানিতে পৌঁছে যায় এবং তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা, আচরণগত সমস্যা, সামাজিক সমস্যা, আবেগানুভূতির সমস্যা, অবসাদ, আসক্তিগত সমস্যা, শারীরিক আঘাত এবং মাথাব্যথার মতো নানারকম সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি থাকে।
  • নিজে বুলি হয়ে উঠা- নির্যাতিত পুরুষেরা প্রাপ্তবয়সে নিজে হিংসাত্মক এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচার-আচরণ করার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে। এছাড়াও তাদের মধ্যে আসক্তির সমস্যা, মারামারি করা, মারমুখী বা আক্রোশপূর্ণ আচরণ, প্রিয়জনকে নির্যাতন করা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
  • শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়া- পূর্ণবয়সে এই সমস্যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানসিক উদ্বেগ, অবসাদ, ব্যক্তিত্ব বিকার, মারমুখী আচরণ, আসক্তির সমস্যা এবং নানারকম দৈহিক স্বাস্থ্যের সমস্যা দেখা দেয়।

একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির জীবনে পারিবারিক হিংসার প্রভাব (যেমন- সঙ্গীর দ্বারা আঘাত পাওয়া) প্রায়শই পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণা বা বিশ্বাসকে ভেঙে দেয় যা পুরুষের আত্মম্ভরিতা বা অহং বোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাকে অসহায় বা হতাশ করে তোলে। যদি এমন হয় যে কোনও পুরুষের আচরণে হিংসার প্রকাশ নেই বা সে আগে জীবনে কখনও অন্যের দ্বারা মারধরও খায়নি, কিন্তু পরে তার সঙ্গীর কাছ থেকে যদি তার উপর কোনও আক্রমণ হয়, যার মধ্যে ক্রোধ বা আচরণের সমস্যা রয়েছে তাহলে ওই পুরুষের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে-

  • পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই অসহায়তার বোধ বারবার দেখা দিতে পারে। এর ফলে পুরুষদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার অভাব ও অবসাদ জন্মায়।
  • মদ্যপান এবং ধূমপানের প্রতি আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে পরবর্তীকালে গুরুতর মানসিক সমস্যা যেমন- অবসাদ বা উদ্বেগ এবং দৈহিক স্বাস্থ্যের সমস্যা যেমন- হার্টের অসুখ এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা প্রভৃতি দেখা দেয়।
  • ক্রোধ, অবসাদ,আত্মহত্যার সমস্যা দেখা দেয়। এর মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একজন পুরুষের নিজের এবং তার কাছের মানুষের খুবই অসুবিধা হয়।
  • কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে সমস্যা গড়ে ওঠে। দৈনন্দিন সাধারণ কাজকর্ম যেমন- কোনও নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা, খুঁটিনাটি মনে রাখা, সময়মতো কাজ করা প্রভৃতির ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়।
  • তার মধ্যে বেশ কয়েকটি শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়ার প্রবণতা গড়ে ওঠে। যেমন- হার্টের অসুখ, উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন, অবসাদ, উদ্বেগ প্রভৃতি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে।

পুরুষরা কেন তাদের উপর হওয়া হিংসার কথা অন্যকে বলতে পারে না?

নীহার (নাম পরিবর্তিত) নামক ৩০ বছর বয়সি একটি ছেলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তার কথায় ''যদি পুরুষরা তাদের উপর হওয়া হিংসার কথা অন্যকে বলে তাহলে তাদের নিজেদেরকে দুর্বল বলে মনে হয়''।

এক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হল পুরুষরা তাদের উপর হওয়া হিংসার কথা অন্যকে  বলতে দ্বিধাবোধ করে এবং শেষ পর্যন্ত কাউকে বলতেও সক্ষম হয় না। ডঃ শইব্যা সালদান্‌হা বলেছেন যে হিংসা ঘটানো বা অন্যকে মারধর করাটাই একজন পুরুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। তাই পুরুষরা তাদের উপর হওয়া হিংসার কথা অন্যকে বলতে ভয় পায় পাছে তারা অন্যদের কাছে হাসিঠাট্টার পাত্র হয়ে উঠবে বলে। আর এই কারণেই তারা পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থও হয় না। আসলে পিতৃতান্ত্রিক ধারণায় কোনও পুরুষের উপর আক্রমণ হওয়ার ঘটনা অবিশ্বাস্য বলে
গণ্য হয়।

এক্ষেত্রে কী সাহায্য করা যেতে পারে?

  • লিঙ্গের ধারণা বোঝা, নিজের কথা অন্যকে বলা, একজনের মধ্যে তার নিজের মূল্য বা যোগ্যতা বোধের বিকাশ ঘটানো জরুরি
  • দম্পতিদের বা (যদি প্রয়োজন পড়ে) বিবাহবিচ্ছিন্ন পুরুষ, যে পারিবারিক হিংসার শিকার হয়েছে তার কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন
  • লিঙ্গভিত্তিক হিংসার বিষয়টি বোঝার জন্য শিশু ও বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে জীবন-শৈলীর দক্ষতা গড়ে তোলা দরকার  

হেল্পলাইন

যদি আপনি হিংসার শিকার হন তাহলে নীচের যেকোনও একটি হেল্পলাইনের সঙ্গে আপনি যোগাযোগ করতে পারেন-

  • আইকল: ০২২-২৫৫২১১১১ (সকাল ৮টা থেকে ১০টা, সোম থেকে শনিবার)
  • পরিবর্তন: ৭৬৭৬৬০২৬০২ (বিকেল ৪টে থেকে রাত ১০টা, সোমবার থেকে শুক্রবার)
  • স্নেহা ইন্ডিয়া: ০৪৪-২৪৬৪০০৫০ (সপ্তাহে ৭দিন, ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে)
  • সহায়: ০৮০-২৫৪৯৭৭৭৭ (সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা, সোমবার থেকে শনিবার)।  

 

প্রবন্ধটি লেখার জন্য এনফল্ড-এর প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শোইবা সালদানাহর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।  

 

      

 

        

প্রস্তাবিত