আমি কি উত্তরাধিকার সূত্রে কোনও মানসিক অসুখ বহন করতে পারি?

মানসিক অসুস্থতার পিছনে জিনের ভূমিকা

একটা বিষয় আমাদের সবারই কম-বেশি জানা যে, এমন কিছু অসুখ রয়েছে, যেমন- হার্ট বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগ এবং রক্তচাপের (হাইপারটেনশন) সমস্যা, যেগুলি আমরা মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে শরীরে বহন করি। ঠিক একইভাবে, কারও পরিবারে যদি কোনও মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস থাকে, তাহলে সেই পরিবারের কোনও না কোনও সদস্যের মধ্যে প্রজন্মগতভাবে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবনতা থাকে। যদি স্বামী বা স্ত্রী মানসিক কোনও অসুখে আক্রান্ত থাকেন, তাহলে তাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যেও মানসিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর এ বিষয়টি আমাদের কাছে যথেষ্ঠ চিন্তার কারণ।

যদিও মানসিক রোগ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে, তবে গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষ, যারা কোনও মানসিক রোগের শিকার হয়েছে, কিন্তু তাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কোনও মানসিক সমস্যা নেই।

''জিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গয়েছে যে, শুধুমাত্র কোনও একটা জিনের কারণেই কেউ কোনও মানসিক অসুখে আক্রান্ত হয় না। বিভিন্ন ক্রোমোজোম বিশিষ্ট  জিনের মিশ্রণের ফলে মানুষের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে মানসিক অসুখ বহন করার  ঝুঁকি থাকে। আর এটি বংশগতভাবে পাওয়া ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন বা কার্ডিওভাস্কুলার জাতীয় অসুখের মতোই একপ্রকার সমস্যা''- এমনই মত নিমহ্যান্সের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার দীপক জয়রাজনের।

এবার দেখা যাক, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিভিন্ন মানসিক রোগের সম্ভাবনার হার ঠিক কীরকম হতে পারে?

 

স্কিৎজোফ্রেনিয়া

বাইপোলার সমস্যা

মানসিক অবসাদ

মানসিক উদ্বেগ

জীবদ্দশায় হওয়া অসুখের সম্ভাবনা (সাধারণ মানুষের মধ্যে কারও জীবদ্দশায় হওয়া এমন মানসিক রোগের ঝুঁকি)

১শতাংশ

১-২শতাংশ

মহিলাদের ক্ষেত্রে- ১০-২৫শতাংশ

পুরুষদের  ক্ষেত্রে- ৫-১২শতাংশ

১৫-২৫শতাংশ হতে পারে যে কোনওরকম উদ্বেগের সমস্যা

বাবা বা মায়ের মধ্যে যদি কোনও একজনের মানসিক অসুখ থাকে

৯-১৬ শতাংশ

২৭ শতাংশ

৫-৩০ শতাংশ

উদ্বেগের সমস্যা রকমফেরে বিভিন্ন হারে হতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ উদ্বেগের ক্ষেত্রে এর হার ২০ শতাংশ হতে পারে এবং প্যানিক বা ভয়জনিত উদ্বেগের হার ৮-৩১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে

যদি বাবা-মা দু'জনেরই মানসিক সমস্যা থাকে

৩৫-৪৬শতাংশ

৫০-৬৫শতাংশ

৩১-৪২শতাংশ

 

যদি রক্তের সম্পর্কের ভাই বা বোনের মানসিক সমস্যা থাকে

৮-১৪ শতাংশ

৫-২০ শতাংশ

৫-৩০ শতাংশ

 

যমজ সন্তান নয় এমন দু'জনের মধ্যে যদি মানসিক সমস্যা থাকে

১০-১৬ শতাংশ

৫-২০ শতাংশ

১১ শতাংশ

 

যদি যমজ সন্তানের মধ্যে এই সমস্যা থাকে

৪০-৬০ শতাংশ

৫০-৭০ শতাংশ

৪০ শতাংশ

 

যদি কাকা বা পিসীর মতো দ্বিতীয় ধাপের সম্পর্কের আত্মীয়র মধ্যে সমস্যা থাকে

১-৪ শতাংশ

৫ শতাংশ

  

 

 

(উপরের তথ্যগুলির সূত্র- এম্পিরিক রিস্ক ডেটা বাই ন্যাশনাল কোয়ালিশন প্রোফেশনাল এডুকেশন ইন জেনেটিক্স)

মানসিক অসুস্থতাকে কি বংশগত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে?

পৃথিবীব্যাপী এক বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে নানা কারণে বিভিন্নরকম মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। সংখ্যাতত্ত্বের হিসেব অনুযায়ী, কোনও পরিবারের বাবা-মা বা ভাই-বোনের মধ্যে যদি মনের অসুখ থাকে, তাহলে সেই পরিবারের মধ্যে যে কোনও সদস্যের মানসিকভাবে বিভিন্ন অসুখের শিকার হওয়ার ঝুঁকি প্রবল হয়।

মানসিক অসুস্থতার পিছনে কি একমাত্র জিনগত উপাদানই দায়ী?

এককথায় না। গবেষণার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে মানসিক রোগের পিছনে শুধুমাত্র জিনকে দায়ী করা যায় না। এর সঙ্গে আরও অনেক কারণ যুক্ত থাকে। প্রকৃতপক্ষে জিনের প্রভাব এবং পরিবেশগত উপাদানের সংমিশ্রণই মানসিক অসুস্থতার জন্য দায়ী হয়। পরিবেশগত বা পারিপার্শ্বিক উপাদানগুলির মধ্যে থাকে- মানসিক চাপ, নির্যাতন, শৈশবস্থায় মানসিক আঘাত, দারিদ্র্য এবং অপুষ্টি। এর অর্থ হল- কোনও মানুষের মধ্যে যদি মানসিক অসুখের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকিপূর্ণ জিনের আধিক্য থেকে থাকে তাহলে পারিপার্শ্বিক এবং সামাজিক উপাদান সেই উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করা ঝুঁকিপূর্ণ জিনের সঙ্গে মিলেমিশে মানসিক রোগের সম্ভাবনাকে আরও বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এরপর অন্যান্য নানা কারণ যুক্ত হয়ে মানসিক অসুস্থতাকে আরও প্রকট করে তোলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মানসিক অসুস্থতার সম্ভাবনা কমতে থাকে। এক্ষেত্রে অধিকাংশ মানসিক অসুস্থতার সূত্রপাত সাধারণত ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হয়ে থাকে।

মানসিক অসুস্থতার পিছনে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ জিন এবং অন্যান্য কারণ যে যুক্ত থাকে সে বিষয়ে আমি কীভাবে জানতে এবং বুঝতে পারব ও সেই সমস্যাগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করব?

যদি আমরা আগে থেকে জানতে পারি যে একটা মানসিক অসুখের পিছনে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ জিনের সম্ভাবনা এবং এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য উপাদানগুলির উপস্থিতি আমাদের জীবনে মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে, তাহলে ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা থাকতে পারে। ঠিক ডায়াবেটিস এবং হাইপারটেনশনের মতো অসুখ যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে হয়, তেমন মানসিক অসুখের ঝুঁকিও থাকে। কিন্তু কয়েকটি বিষয় জানা থাকলে এই বিপদের সম্ভাবনা  অনেক কমানো যায় এবং এর থেকে দূরে থাকা যায়-

  • মানসিক চাপ সম্পর্কে সতর্ক থাকা
  • অনুভূতিগত বিপর্যয়ের সঙ্গে মোকাবিলা করা এবং বাধা অতিক্রম করার দক্ষতা অর্জন করা
  • মানসিক চাপ কমাতে জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে কিছু বদল ঘটানো
  • পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
  • প্রতিদিন শরীরচর্চা করা
  • পর্যাপ্ত ঘুমানো
  • বিশ্বাসভাজন কাউকে নিজের সমস্যার কথা বলা
  • অ্যালকোহল, তামাক জাতীয় দ্রব্য এবং অন্যান্য নেশার বস্তু এড়িয়ে চলা। মাদক ব্যবহার শুধু মানসিক রোগের ঝুঁকিই বাড়ায় না, সেই সঙ্গে যদি কারও মধ্যে কোনও মানসিক অসুখ থেকেও থাকে তাহলে মাদক ব্যবহারের ফলে অসুখের চরিত্র বদলে যেতে পারে এবং প্রতিষেধক হিসেবে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয় তার কার্যকরীতাও নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • কোনও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে মানসিক অসুস্থতার সম্ভাব্য লক্ষণগুলি জানা প্রয়োজন

পরিবারে কোনও বাচ্চা জন্মগতভাবে কোনও মানসিক অসুস্থতার শিকার কিনা সেই নিয়ে পরিবারের সদস্য এবং পরিচর্যাকারীদের মনে যদি কোনও সন্দেহ বা চিন্তা দানা বাঁধে তাহলে অবিলম্বে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।