যোগ বনাম ব্যায়াম

ব্যায়ামের উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও যোগ মানুষকে শান্তি, আনন্দ ও সুখ দেয়।

আমরা সবাই ক্রমশ শারীরিক সুস্থতার গুরুত্বের বিষয় জানতে পারছি। জিমের সদস্যপদ, রানারদের (যাঁরা দৌড়ন) দল, সাইকেল আরোহীর দল, এগুলো আজকাল খুব বেশী দেখা যাচ্ছে। যোগাসন আজকাল আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হছে যদিও সাধারণত লকে একে শারীরিক কসরত বোলে ভুল করেন। প্রকৃতপক্ষে, যোগের শারীরিক দিক বা আসন হল যোগাভ্যাসের একটা গৌণ দিক। তার থেকেও বড় কথা হল এই আসনগুলো সাধারণ শারীরিক কসরতের থেকে অভ্যাস ও ফল দুটো দিক দিয়েই অনেকটা আলাদা।

নির্দিষ্ট ভঙ্গিমা ও মাসল্‌-এর শিথিলতা হল যোগের লক্ষ্য। পতঞ্জলি আসনকে “এক স্থির ও আরামদায়ক অবস্থা” বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে খুবই ধীর ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হয়; শ্বাসপ্রশ্বাস একই ছন্দে ঘটে। কিন্তু সাধারণ ব্যায়ামের ক্ষেত্রে নড়াচড়া ও মাসল্‌-এর স্ট্রেসের ওপর জোর দেওয়া হয়। ব্যায়ামে সাধারণত বার বার একই রকম অনুশীলন দেখা যায় যেখানে শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দেও পালটে যায়, যদিও আমরা শ্বাস পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। যার ফলস্বরূপ যোগ ও ব্যায়ামের উপকারিতার পার্থক্য দেখা যায়।

মাসক্যিউলার সিস্টেম (মাংসপেশী সম্বন্ধীয় তন্ত্র)

যোগঃ এর ফলে শরীরের প্রত্যেক হাড়ের ওপর সমানভাবে মাংসপেশী গঠিত হয়, তাই শরীরের নমনীয়তা বাড়ে। যোগে শারীরিক শক্তি অনেক কম খরচ হয়।

ব্যায়ামঃ ব্যায়ামের প্রধান লক্ষ্য হল মাসল্‌ বা মাংসপেশীর পরিমাণ বাড়ানো। যার ফলে মাসল্‌-এর দৈর্ঘ কমে যায় ও নমনীয়তাও হ্রাস পায়। যখন আমরা ব্যায়াম করি, তখন শারীরিক শক্তি অনেকটা খরচ হয়।

হার্ট বা হৃৎপিণ্ড

যোগঃ যোগআসনের সময় শরীর অনেক শিথিল (রিল্যাক্স্‌ড) থাকে ও শরীরে রক্তের প্রয়োজনীয়তাটা কমে যায়। এতে হার্টের ওপর চাপ বা স্ট্রেস্‌ অনেকটা কমে যায়।

ব্যায়ামঃ ব্যায়ামের ক্ষেত্রে এর ফলাফল ঠিক উল্টো। সাধারণ ব্যায়াম মাসল্‌-কে প্রসারিত করে। এতে রক্ত সঞ্চালনের গতি (ব্লাড সার্কুলেশন) ও রক্তের চাপ (ব্লাড প্রেসার) বেড়ে যায়, যা হার্টের কাজের চাপ বাড়িয়ে দেয় যেহেতু হার্টকে অনেক তাড়াতাড়ি পাম্প করতে হয়।

রেসপিরেটরী সিস্টেম বা শ্বাস তন্ত্র

যোগঃ যোগাভ্যাসের সময় শরীর শিথিল অবস্থাতে থাকে বা বিশ্রাম নেয়, কাজেই শ্বাস তন্ত্র বা রেসপিরেটরী সিস্টেমের কাজের চাপও কম থাকে।

ব্যায়ামঃ সাধারণ ব্যায়ামে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ঘন ঘন সঞ্চালনে মাসল্‌ বা মাংসপেশীর অক্সিজেনের প্রয়োজন বেড়ে যায়। যা শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বাড়িয়ে দেয় ও এর ফলে লাংস বা ফুসফুসকে অনেক বেশী কাজ করতে হয়।

ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিষেধক তন্ত্র

যোগঃ শরীরের প্রতিষেধক কোষগুলোর পরিমাণ ও কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে, যোগ প্রতিষেধক তন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেমকে ভেতর থেকে শক্তির যোগান দেয়।

ব্যায়ামঃ এই একই ভাবে ব্যায়ামও কাজ করে, তবে এটা ব্যায়ামের প্রকৃতি, তীক্ষ্ণতা ও স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করে।

স্ট্রেস্‌ লেভেল বা চাপের পরিমাণ

যোগঃ যোগ শরীরে কর্টিসল্‌ হরমোনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এই কর্টিসল্‌ হরমোন  কোলেস্টেরল থেকে তৈরী হয় এবং এই হরমোন স্ট্রেস্‌ বা চাপ বাড়ায়।

ব্যায়ামঃ ব্যায়ামের ফলে শরীরে কর্টিসল্‌-এর পরিমাণ বেড়ে যায় কারণ, শরীর ব্যায়াম করাকে স্ট্রেস্‌ হিসাবে নেয়।

যোগ নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পদ্ধতি বিষয়ে মানুষের ঞ্জান বৃদ্ধি করে; যা নিয়মিত ব্যায়ামে হয় না। যেহেতু নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ু তন্ত্রের ওপর এক মনোরম প্রভাব দেখা যায়, সেহেতু যোগের পর শরীরে বিশ্রামের অনুভুতি হয়। ব্যায়ামের ফলে ল্যাক্টিক অ্যাসিড উৎপন্ন হয়, যা শরীরকে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত করে তোলে। যোগের অন্যান্য উপকারিতা যা ব্যায়ামের ক্ষেত্রে দেখা যায় না তা হল, যোগের ফলে মানুষের যন্ত্রনা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ে, আবেগতাড়িত ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হয় এবং শরীরকে নতুন ছন্দে নিয়ে আসে। সব মিলিয়ে, যোগের দ্বারা ব্যায়ামের বেশীরভাগ উপকারিতাতো উপলব্ধি করা যায়ই, এছাড়াও, এর ফলে জীবনের অন্যান্য উপলব্ধি যেমন শান্তি, সুখ ও আনন্দও বৃদ্ধি পায়।