ডিমেনশিয়া

ডিমেনশিয়া কী?

মস্তিষ্কের কোষ ও কলা ক্ষতিগ্রস্ত হবার ফলে যে সমস্ত উপসর্গ দেখা দেয় তাঁকে ডিমেনশিয়া বলে। সুতরাং ডিমেনশিয়া কোনও ডিস্‌অর্ডার নয়, বরং এক ধরনের সিনড্রোম। এর ফলে পারকিনসন্‌স বা অ্যালঝাইমার্‌স এর মতো ব্যাধি দেখা দিতে পারে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তির বিস্মৃতি, মানসিকতায় পরিবর্তন, চিন্তা-ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়া, ভাষা এবং অঙ্ক বুঝতে না পারার জন্যে দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রচণ্ড সমস্যা দেখা দেয়।

ডিমেনশিয়া মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

বিঃ দ্রঃ – ডিমেনশিয়া ইন্ডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে আনুমানিক ৩৭ লাখ মানুষ ডেমেনশিয়ার শিকার এবং ২০৩০ এর মধ্যে এই সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে

কোনটি ডিমেনশিয়া নয়?

  • বয়সের সঙ্গে বিস্মৃতি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার কারণে স্মৃতি নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হলে দৈনন্দিন জীবনে আমাদের মস্তিষ্কের কমপক্ষে দুই ধরনের কাজে অসুবিধা হতে পারে (বিস্মৃতি বা সিদ্ধান্ত নিতে না পারা)।

ডিমেনশিয়ার প্রকারভেদ

রোগের ধরণ ও উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে ডিমেনশিয়া অনেক রকম হতে পারে।

১. অ্যালঝাইমার্‌স সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায় ডিমেনশিয়া আক্রান্তদের মধ্যে। মাত্র ৭-১০ বছর সময়ের মধ্যে এই রোগ আপনাকে সম্পূর্ন রূপে গ্রাস করে ফেলে। মস্তিষ্কের যাবতীয় জ্ঞান আহরণ করার ক্ষমতা যেমন, বিচার-বুদ্ধি, স্মৃতি, ভাষা বা কিছু মনে রাখার ক্ষমতা স্তব্ধ হয়ে যায়।

২. লিউই বডি ডিমেনশিয়াঃআমাদের মস্তিষ্কে একধরনের অস্বাভাবিক প্রোটিনের পিণ্ড থাকে যাকে লিউই বডি (Lewy Body) বলা হয়। এই ধরনের ডিমেনশিয়া রোগীর স্বপ্ন দেখার সময় দ্রুত চোখের পাতা কাঁপা (Rapid Eye Movement) এবং স্বপ্নে দেখা জিনিস বাস্তবে করার চেষ্টা লক্ষ করা যায়।

. ফ্রন্টোটেম্পোরালডিমেনসিয়াঃ এই ধরনের ডিমেনশিয়া অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই অর্থাৎ ৪০-৬৫ বছর বয়সের মধ্যে আঘাত হানে। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও টেম্পোরাল লোবের স্নায়ুকোষ গুলির অবক্ষয় হতে থাকে। এই ফ্রন্টাল লোব ও টেম্পোরাল লোবের কাজ হল আমাদের ব্যাক্তিত্ব, ব্যবহার ও ভাষাজ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করা। এর ফলে ব্যাক্তির চিন্তাভাবনা থেকে শুরু করে হাঁটাচলা অবধি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

. সংবহনতান্ত্রিক ডিমেনশিয়াঃএই ক্ষেত্রে স্ট্রোক, হৃৎপিণ্ডের ভালভে সংক্রমণ বা অন্যান্য কারণে রক্ত চলাচল ব্যাহত হবার জন্য মস্তিষ্কে কোষের অবক্ষয় দেখা যায়। 

ডিমেনশিয়ার উপসর্গ কী?

ডিমেনশিয়ার উপসর্গ নির্ভর করে মস্তিষ্কের কোন অংশে কোষ অবক্ষয় হয়েছে বা কেন হয়েছে তার ওপর। ফলে ব্যক্তি বিশেষের ওপর নির্ভর করে উপসর্গও আলাদা আলাদা হয়।

একজন ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তির মধ্যে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি দেখা যেতে পারে।

  • সাম্প্রতিক কাজ বা ঘটনা মনে রাখতে অসুবিধা।
  • কথা বলতে গিয়ে সঠিক শব্দ নির্বাচনে অসুবিধা।
  • লোকজন বা রাস্তাঘাট চিনতে না পারা।
  • দৈনন্দিন কাজকর্ম, যেমন রান্নাবান্না বা ঘরদোর গোছানোতে অসুবিধা।
  • পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা, যেমন ঘড়ি ধরে ওষুধ খাওয়া বা ব্যাঙ্কের কাগজপত্র সামলানোতে সমস্যা হয়।
  • আপৎকালীন পরিস্থিতিতে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত না নিতে পারা।
  • নিজেরও যত্ন নেওয়া যেমন স্নান করা বা পোশাক পরা।
  • মানসিকতার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।

কোন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উপসর্গ দেখা যায়?

লিউই বডি ডিমেনশিয়াঃরোগীর চূড়ান্ত পর্যায় দৃষ্টিবিভ্রম বা ডিটেল্‌ড হ্যালুসিনেশন হয়ে থাকে। অর্থাৎ রোগী স্পষ্টভাবে অলীক বা অবাস্তব জিনিস দেখতে পান।

ফ্রন্টোটেম্পোরালডিমেনশিয়াঃব্যাক্তিত্ব ও ব্যবহারে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে রোগী লোকজনের প্রতি কঠোর, অভদ্র ও উদাসীন মানসিকতার পরিচয় দেন।

সংবহনতান্ত্রিক ডিমেনশিয়াঃমস্তিষ্কে নতুন কোনও অবনতির কারণে বিশৃঙ্খলা ও ডেলিরিয়াম দেখা দিতে পারে।

রোগ নির্ণয়ের উপায়

ডিমেনশিয়া নির্ণয় করার কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস, আচার-আচরণে পরিবর্তন এবং অন্যান্য ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় সম্ভব।

ডিমেনশিয়া যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে ততই মঙ্গল। কারণ এতে রোগী ভবিষ্যতের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হবার সময় পান এবং সঠিক চিকিৎসার সাহায্যে রোজকার কাজও সহজে করতে পারেন। 

ডিমেনশিয়া নির্ণয়ে নিম্নলিখিত ডাক্তারি পরীক্ষার সাহায্য নেওয়া হয়ে থাকেঃ

রোগীর জ্ঞানগত এবংস্নায়ুশারীরিক পরীক্ষাঃরোগীর মানসিক অবস্থান, ভাষাজ্ঞান, যুক্তি ও বিচার ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি বোঝার জন্য কিছু স্নায়ু শারীরিক পরীক্ষা বা নিউরোফিজিকাল টেস্ট করা হয়।

স্নায়ুপরীক্ষাঃ রোগীর হাঁটাচলা, ভারসাম্য, বোধশক্তি এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়।

মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণঃ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, স্ট্রোক বা টিউমারের সম্ভাবনা বুঝতে রোগীর সি টি স্ক্যান বা এম আর আই পরীক্ষা করা হয়।

মানসিক পরীক্ষাঃ ডিপ্রেশন বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার জন্য উপসর্গগুলি দেখা যাচ্ছে কি না বোঝার জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হতে পারে।

ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা

যেহেতু ডিমেনশিয়া সময়ের সঙ্গে মারাত্মক রূপ ধারণ করে, এর চিকিৎসা এক কথায় অসম্ভব। যদিও একজন সঠিক বিশেষজ্ঞের সাহায্যে ডিমেনশিয়ার উপসর্গ কমানো সম্ভব। ডিমেনশিয়ার পাশাপাশি যদি রোগী ডিপ্রেশন বা অবসাদের শিকার হন তাহলে সেগুলোর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা করা যায়।

রোগীকে ভালবেসে তাঁর সঠিক যত্ন নেওয়া সম্ভব। রোগী এখন যা করতে সক্ষম, ডাক্তার এবং পরিবারের তাতে আরও বেশি করে উৎসাহ দেওয়া উচিত। 

ডিমেনশিয়া কি এড়ানো সম্ভব?

চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজছেন। যদিও ডিমেনশিয়া সম্পুর্ণ রূপে এড়ানো সম্ভব নয়, এঁকে ঠেকিয়ে রাখতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

  • মস্তিষ্ককে যতদূর সম্ভব সচল রাখতে সুদোকু, শব্দছক, ধাঁধা খেলা বা নতুন ভাষা শেখার চেষ্টা করা উচিত।
  • চারপাশে নিজেকে মেলে ধরা উচিত। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা,সমান মানসিকতার লোকের সঙ্গে আলাপ, নতুন কোনও শখ পালন বা সমাজ-কল্যাণমূলক কাজে বেশি করে যোগদান করা উচিত।
  • দৈনন্দিন কাজের একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত।
  • ধূমপান এবং মদ্যপান সম্পূর্ন রূপে বর্জন করা উচিত।

ডিমেনশিয়া রোগীর পরিচর্যা

ডিমেনশিয়া ধরা পড়লে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারবর্গ মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই রোগীকে প্রচণ্ড বিশ্বাস ও ভরসা জোগানো উচিত যাতে পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনযাত্রা মসৃণ হয়ে উঠতে পারে।

পরিস্থিতি অনুসারে রোগীর যত্ন নিতে কিছু পরামর্শ নীচে দেওয়া হলঃ

  • বাক্যালাপঃ আপনার প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার সময় সরাসরি চোখের দিকে তাকান। স্পষ্ট ভাবে ধীরে ধীরে যে কোনও একটি বিষয়ে বুঝিয়ে বলুন।
  • ব্যায়ামঃডিপ্রেশন কমাতে, শান্ত থাকতে ও নার্ভকে ঠিক রাখতে রোগীকে নিয়মিত ব্যায়াম করতে উৎসাহ জোগান।
  • খেলাধুলোঃবুদ্ধি খাটাতে হয় এমন খেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণে মস্তিষ্কের কোষের অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব।
  • রুটিনঃঅসময়ে খাওয়া বা ঘুম এড়াতে একটা নির্দিষ্ট ছকে জীবনটাকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করুন।
  • ভবিষ্যৎঃ রোগীর হাতে সময় থাকতে তাঁকে ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা করতে বলুন।  বিষয়সম্পত্তির দেখভাল, বা বয়সকালে কে  তাঁর দেখাশোনা করবেন সেই সমস্ত সিদ্ধান্ত রোগের প্রাথমিক পর্যায় নিয়ে ফেলা ভাল।

পরিচর্যাকারীরও যত্নের প্রয়োজন

একজন ডিমেনশিয়া রোগীর সেবা করা মানসিক ও শারীরিক ভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর। ক্ষোভে,হতাশায় ও দুঃখে আপনি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। কাজেই রোগীর পাশাপাশি আপনার নিজের শরীর ও মনেরও যত্নের সমান প্রয়োজন।

  • ডিমেনশিয়া সম্বন্ধে যত বেশি করে পারেন জানার চেষ্টা করুন। এতে আপনার রোগীকে বুঝতে ও তাঁকে সাহায্য করতে সুবিধা হবে। 
  • কাউন্সেলার ও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
  • প্রয়োজন মতো আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের পরামর্শ চান।
  • নিজের জন্যেও কিছুটা সময় রাখুন। 
  • নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। পুষ্টিকর খাবার খান ও নিয়মিত ব্যায়াম করুন। মনঃসংযোগ বজায় রাখতে নিয়মিত ধ্যান করুন।
  • সহায়ক দলে যোগদান করুন। নিজের মতো অন্যান্য পরিবারের পাশেও দাঁড়ান।