লজ্জার স্থিতিস্থাপকতা: প্রিয়জনের আত্মহত্যা সহ্য করার শক্তি যোগায়
আত্মহত্যা প্রতিরোধ

লজ্জার স্থিতিস্থাপকতা: প্রিয়জনের আত্মহত্যা সহ্য করার শক্তি যোগায়

ডঃ নন্দিনী মুরলী

আমি এমন একজন যার প্রিয়জন আত্মহত্যা করেছে এবং এটা আমি অনেক আগেই বুঝেছিলাম যে আমাকে নিজের জীবনের এই সত্য মেনে নিতে হবে এবং গল্প সততার সাথে বলতে হবে। আমার ক্ষেত্রে সুবিধা ছিল যে আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাকে এমন লজ্জার মুখোমুখি হতে হবে যা মানুষের ক্ষমতা বা বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু আমি সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত ছিলাম এবং এতে সোজা ঝাঁপ দিয়েছিলাম। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার আমার তাগিদ – অন্যদের ইচ্ছে অনুযায়ী প্রতিরূপ তৈরি না করে নিজের সত্যিকারের রূপ তুলে ধরা – নিরাপত্তার ভ্রান্ত ধারনা এবং স্বস্তিদায়ক জায়গায় বঞ্চনার মধ্যে আমাকে থাকতে দেয়নি।

ব্রেনে ব্রাউন তাঁর 'দি গিফট্‌স অফ ইমপারফেকশন'-এ লিখেছেন, ''যদি আমরা মন-প্রাণ দিয়ে বাঁচতে এবং ভালোবাসতে চাই ও যদি আমরা নিজেকে যোগ্য মনে করে পৃথিবীর সাথে নিজেকে যুক্ত রাখতে চাই তাহলে সেই পথে এমন কয়েকটি বিষয় রয়েছে যার মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে- বিশেষ করে লজ্জা, ভয় এবং দুর্বলতার।''

লজ্জা এমন এক চিরাচরিত অনুভূতি যা আমরা সবাই অনুভব করেছি বা করব। কিন্তু আত্মহত্যাজনিত ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে লজ্জার মাত্রা ও প্রভাব বিস্তৃত। যখন কার্ল জুং লজ্জাকে '' সোল ইটিং ইমশন'' হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন তখন তিনি লজ্জাকে সাথে জড়িয়ে থাকা ক্ষমতাহীনতা বা দুর্বলতার কথাই বলেছিলেন। এর কারণ লজ্জা মানুষের অভিজ্ঞতাগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেয়, তাকে ছোট করে দেখে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোকে একেবারে নস্যাৎ করে দেয়। লজ্জার মধ্য দিয়ে মানুষ তার জীবনের প্রকৃত সত্যকে ঢেকে রাখতে বা তাকে বর্জন করতে চায়। লজ্জা মানুষকে ক্ষুদ্র, দ্বিধাগ্রস্ত এবং অযোগ্য করে তোলে। জুং-এর বিশ্লেষণে লজ্জা মানুষের আত্মাকে একেবারে ভাসিয়ে দিয়ে একটা জলাভূমিতে পরিণত করে। ব্রাউন লজ্জার এই রূপকধর্মী ব্যাখ্যাকে আরও প্রসারিত করেছেন এবং বলেছেন, ''আমাদের শেখা উচিত কীভাবে এই জলাভূমির পার করা যেতে পারে। সেই জলাভূমির কিনারায় দাঁড়িয়ে এর দিকে তাকিয়ে থাকা এবং কল্পনা করা যে সত্যি কথা বললে আমাদের জীবনে কী সর্বনাশ ঘটতে পারে অনেক বেশি বেদনাদায়ক একজন বিশ্বস্ত সহচরের হাত ধরে জলাভূমি পার করার তুলনায়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আমাদের অবশ্যই শেখা জরুরি যে জলাভূমির অন্য প্রান্তটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পাশাপাশি - যে প্রান্তে যোগ্য হওয়ার অনুভূতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে - সমানে বদল হওয়া পরিস্থিতির মধ্যে নিজের অবস্থানকে বজায় রাখার চেষ্টা করা জলাভূমি পার করার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন কাজ।''

প্রিয়জনকে হারানো মানুষের মধ্যে লজ্জা এবং অপরাধ বোধের প্রকাশ           

আত্মহত্যার গভীর প্রভাব বেঁচে থাকা মানুষের উপর বেশি করে পড়ে। আর এক্ষেত্রে শোকপ্রকাশের একমাত্র ধরন হল আমাদের প্রিয়জনের মৃত্যুর আসল কারণটিকে লুকিয়ে রাখা, অস্বীকার করা বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য কারণ 'আবিষ্কার' করা। এই পরিস্থিতিতে পড়লে কেন আমরা সত্যি কথা বলতে ভয় পাই? আমরা ভয় পাই এই ভেবে যে মানুষ আমাদের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করবে, তারা নিজের মতামত আমাদের উপর চাপিয়ে দেবে এবং আমাদের দোষ দেবে। আমরা চাই না যে লোকে আমাদের বিষয়ে মনে করুক যে আমরা ভালোবাসা এবং সম্পর্কের যোগ্য নই। আর আমরা এটা ভেবেও ভয় পাই যে একটা আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতকেও নানারকম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে। এছাড়া যে বেঁচে থাকে তার মধ্যে লজ্জা বোধের পাশাপাশি অপরাধ বোধও জেগে উঠে এবং এই দুটি অনুভূতির মধ্যে প্রায় মল্লযুদ্ধ বেঁধে যায়। আমরা ঠিক কেমন- এই ভেবে আমাদের মধ্যে লজ্জা দেখা দেয়। যেমন- একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে চিন্তা করে যে ''আমি খুব খারাপ মানুষ''। অন্যদিকে, লজ্জার যমজ অনুভূতি হিসেবে অপরাধ বোধ জাগে এবং নিজেদের আচার-আচরণের জন্যই এই অপরাধ বোধ দেখা দেয়। এই কারণে মানুষ নিজের কৃতকর্মকে দোষ দেয়, যেমন- ''আমি খুব ভুল কাজ করেছি''।

লজ্জা গোপনীয়তা, নীরবতা এবং মতামতের মাধ্যমে বেড়ে উঠে। প্রিয়জনের আত্মহত্যার ঠিক পরে আমিও লজ্জায় প্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। এভাবেই আমরা আত্মহত্যার কলঙ্ককে সামাজিক মূল্যবোধ এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে আত্মস্থ করতে চাই এবং নিজেদের মতো করে ঘটনাটিকে সবার সামনে বলতে বাধ্য হই। আমার ক্ষেত্রে আমি আমার আচার-আচরণের মধ্যে লজ্জার বোধকে স্বীকৃতি জানিয়েছিলাম, বোধগম্য করে তুলেছিলাম এবং সম্মান জানিয়েছিলাম। নিজের জীবনের সত্যকে আমি নির্ভয়ে, সাহসের সঙ্গে বলার জন্য লজ্জাকে নিরপেক্ষভাবে জায়গা দিয়েছিলাম। লজ্জাকে কখনোই আমি আমার কাজের সাফাই হিসেবে জায়গা দিইনি।

কিছুদিন আগে আমি 'লজ্জার স্থিতিস্থাপকতা' নামক বিষয়টির সম্বন্ধে জানতে পারি। জানার পর আমার নিজের মত এই বিষয়ে আরও পুষ্ট হয়। ব্রেনে ব্রাউন লজ্জার স্থিতিস্থাপকতা নামক তত্ত্বের উদ্ভাবক। এই তত্ত্বে তিনি লজ্জার সংজ্ঞা, তার ফলাফল এবং কীভাবে মানুষের মধ্যে লজ্জা বোধ জেগে ওঠে তার ব্যাখ্যা করেছেন। লজ্জা বোধের কারণে মানুষ ''একটা জালে আটকে পড়ে, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নিজেকে অপদার্থ বলে ভাবে।''

ব্রাউন বলেছেন, ''লজ্জার স্থিতিস্থাপকতা এমন একটা দক্ষতা যার মাধ্যমে লজ্জার বোধ অনুভব করা যায়, এই বোধকে যোগ্য এবং খাঁটি হিসেবে মনের মধ্যে জায়গা দেওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত এই লজ্জা আমাদের মধ্যে সাহস, সমবেদনা এবং সংযোগ গড়ে তোলার মতো অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। তাই প্রথমে আমাদের লজ্জার স্থিতিস্থাপকতার বিষয়ে বোঝা জরুরি যে আমরা যা নিয়ে কম আলোচনা করব সেটাই আমাদের লজ্জার কারণহয়ে দাঁড়াবে।''

যাদের প্রিয়জন আত্মহত্যা করেছেন তাদের জীবনে লজ্জার স্থিতিস্থাপকতা অতি গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এর সাহায্যে তারা জীবনকে আবার নতুন করে গঠন করতে পারবেন -

  • প্রথমত, আমাদের প্রয়োজন নিজেদের সেই দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত এবং স্বীকার করা যার ফলে আমাদের মধ্যে লজ্জার বোধ জেগে ওঠে।

  • দ্বিতীয়ত, লজ্জার অনুভূতি জেগে ওঠার জন্য যেসব বাহ্যিক উপাদান বা কারণ দায়ী সেগুলোকে আমাদের চিহ্নিত করা দরকার। আত্মহত্যার ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কলঙ্ক, লজ্জা, গোপনীয়তা এবং নীরবতাগুলোকে চেনা এবং বোঝা, যা আত্মহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা একজন মানুষের অনুভূতি এবং দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে একেবারে একাত্ম হয়ে যায়। এবং এর ফলেই আমরা নিজেদের দোষ দিই এই ভেবে যে কেন আমরা আত্মহত্যার মতো ঘটনা যে ঘটতে পারে তা আগে থেকে বুঝতে পারলাম না বা আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুকে আটকাতে পারলাম না।

  • তৃতীয়ত, আমাদের উচিত অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং নিজেদের জীবনের কথা অন্যদের বলে তাদের কাছ থেকে সমানুভূতি আদায় করা। সেই সঙ্গে নিজেদের অবস্থাটিকে যথাযথভাবে বিচার করাও জরুরি। লজ্জা বিষয়টিকে এমন একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার করা উচিত যা মানুষের জীবনে ক্ষতি এবং অন্তর্ঘাত ডেকে আনবে না। এর ফলে মানুষ নিজেকে দোষারোপ এবং নির্যাতন করা থেকেও রক্ষা পাবে।

  • চতুর্থত, ব্যক্তিগতভাবে এবং যৌথভাবে লজ্জা বোধটিকে নানা আঙ্গিক থেকে আলোচনা এবং বিনির্মাণ করা জরুরি। যদি এটা করা যায় তাহলে মানুষ জানতে পারবে যে কীভাবে আমরা নিজেদের সাহায্য করতে পারব। আসলে প্রায়শই মানুষ নিজেকে সাহায্য করতে পারে না, কারণ তারা জানেই না যে কীভাবে তা করতে হয়। শুধুমাত্র নিজেদের জীবনের কথা অন্যদের সত্যভাবে বলা নয়, তার সঙ্গে দরকার পারস্পরিক সহায়তাপূর্ণ আলাপ-আলোচনার একটা পরিবেশ গড়ে তোলা। এর ফলে এমন অনেক মানুষ প্রিয়জনের আত্মহত্যার পরেও তাদের কথা অন্যকে বলার সুযোগ পাবে এবং অন্যরাও তাদেরকে দোষ দিতে ও নিজেদের মতামত তাদের উপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।

এজন্য আমাদের একটা সঙ্ঘ গড়ে তোলা জরুরি; যেখানে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ নিজেদের জীবনের কাহিনি একে অপরকে বলতে পারবে; এটা এমন একটা রঙ্গমঞ্চ হবে যেখানে আমরা মনোযোগ সহকারে আমাদের লজ্জার কথা একে অপরকে বলতে পারব, নাচতে পারব, গাইতে পারব এবং মন খুলে কথাও বলতে পারব। আর এভাবেই আমাদের মন থেকে লজ্জা বোধের বোঝা হালকা হবে, নিজেদের জীবনের মূল্য আমরা বুঝতে পারব এবং সাহস, সমবেদনা ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে আমরা জীবনযাপন করতে সক্ষম হব। চলুন আমরা সবাই মিলে এই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাই।

ডঃ নন্দিনী মুরলী পেশাদারী ভাবে যোগাযোগ, লিঙ্গ এবং বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন। সম্প্রতি নিজের প্রিয়জনকে আত্মহত্যায় হারানোর পর তিনি এম এস চেল্লামুথু ট্রাস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সাথে হাত মিলিয়ে স্পিক নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন, যার মূল উদ্দেশ্য হল আত্মহত্যা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org