মেন্টরিং-এর ইতিবাচক ভূমিকা
কল্যাণ

মেন্টরিং-এর ইতিবাচক ভূমিকা

ডা: এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

ভারতের রাষ্ট্রনায়ক এবং দার্শনিক ডঃ সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন বলেছেন, ''একজন ভালো শিক্ষকের অবশ্যই জানা উচিৎ যে কীভাবে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে একজন ছাত্রের মধ্যে তার প্রিয় বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহ বাড়াতে হয়। পড়াশোনার বিষয়ে শিক্ষক নিজেই পারদর্শী হন এবং লেখাপড়ার বিভিন্ন বিষয়ের সর্বশেষ বিকাশ সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ ওয়ালিবহাল থাকেন। জ্ঞান অর্জনের নেশায় তিনি সবসময়ে ছুটে বেড়ান।'' ডঃ রাধাকৃষ্ণানের এই বক্তব্য মেন্টরিং-এর মতো একটি বড় বিষয়ের  ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য-

ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে তাদের জীবনকে অর্থবহ ও সৃষ্টিশীল করে তোলা জরুরি। বর্তমানে ইতিবাচক মনস্তত্ত্বের (পজিটিভ সাইকোলজি) ক্ষেত্রে এই বিষয়টি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে যেসব মানুষ এই কাজে যুক্ত আছেন তাঁদের ক্ষেত্রে মেন্টরিং একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিককালে কীভাবে মেন্টরিং সম্পর্কে পরামর্শ গ্রহণকারীরা (মেনটিস) উপকৃত হচ্ছেন তা নিয়ে নানা গবেষণা শুরু হয়েছে (যেমন- প্রযুক্তিগত দক্ষতার শিক্ষা, সফল কেরিয়ায় গড়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করা এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার শিক্ষা)। এর ফলে মেন্টর বা পরামর্শদাতারাও মানসিক ও শারীরিকভাবে উপকৃত হন।

মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায় মেন্টরিং-এর ধারণাটি গড়ে উঠেছে সাইকো-অ্যানালিস্ট এরিক এরিকসন-এর জেনারেটিভিটি (উৎপাদকতা) নামক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে। ১৯৫০ সালে তাঁর 'চাইল্ডহুড এবং সোসাইটি' নামক বইতে এই বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়। এই যুগান্তকারী বইতে এরিকসন শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত মানুষের বিকাশের আটটি পর্যায় তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ে মানুষের নির্দিষ্ট দায়-দায়িত্ব বা চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়েও এই বইতে আলোচনা করেছেন তিনি।

মানুষের মধ্যবর্তী জীবনে অর্থাৎ বিকাশের সপ্তম পর্যায়ের সঙ্গে এই জেনারেটিভিটি যুক্ত- এর অর্থ হল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা এবং তাদের সঠিক পথ দেখানো। এরিকসন অভিভাবকত্বকে জেনারেটিভিটির মূল কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই বিষয়টি পৃথিবীর অধিকাংশ পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদিও তিনি গভীর বিশেষণ করে বলেছেন সব অভিভাবকই যে তাদের সমস্ত উৎপাদক (জেনারেটিভ) শক্তি নিজেদের সন্তানদের প্রতি উৎসর্গ করে তা নয় এবং জেনারেটিভিটি অভিভাবকত্বকে বাদ দিয়েও সম্ভব হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে বলা  যায়, অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের সামাজিক কল্যাণ বা উপকারিতার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হল তাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা।

যুগান্তকারী বই এবং জনপ্রিয় সিনেমার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যবর্তী জীবনের মূল বিষয়গুলোর চ্যালেঞ্জ ও সংকটগুলো ক্রমশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং নতুন নতুন গবেষণায়ও শুরু হয়। যেমন- অ্যান আরবরের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন জেসুইট ধর্মযাজক ডঃ জন কোট্রে এরিকসনের গবেষণাকে আরও প্রসারিত করেন এবং চার ধরনের জেনারেটিভিটি চিহ্নিত করেন। এগুলো হল- ১) বায়োলজিকাল বা জৈবিক- এর মধ্যে রয়েছে একটি শিশুর জন্মানোর প্রক্রিয়া, তাকে জন্ম দেওয়া এবং তার সেবা-শুশ্রুষার বিষয়গুলো; ২) অভিভাবকত্ব- শিশুদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও পারিবারিক ঐতিহ্য স্থাপন করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা; ৩) কৌশলগত- বাচ্চাদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে বাস্তব বোধের জন্ম দেওয়া; ৪) সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত বিষয়- শিশুদের মধ্যে মূল্যবোধ গড়ে তোলা, যেমন- ব্যক্তিস্বাধীনতা বা ধার্মিকতার শিক্ষা দেওয়া, একটি বিশেষ সংস্কৃতি বা ভাবধারাকে মূল্য দেওয়া। কোট্রে এরিকসনের কয়েকটি অনুমানের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেমন- এই উৎপাদক প্রবণতা বা ঝোঁক কি মানুষের মধ্যবর্তী জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে? এই প্রসঙ্গে ইদানীং কয়েকজন মনস্তত্ত্ববিদের জোড়ালো বক্তব্য হল তরুণ-তরুণীরাও তাদের দক্ষতা ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে এবং এই কাজের মধ্য দিয়ে তারা উপকৃতও হয়।

অতি সম্প্রতি, নর্থওয়ের্স্টান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডঃ ড্যান ম্যাকঅ্যাডামস্‌ এবং তাঁর সহকর্মীদের গবেষণার বিষয় হল- কেন মধ্যবয়সি মানুষের জেনারেটিভিটির মাত্রা একে-অপরের থেকে আলাদা হয়। যখন মধ্য বয়সের কিছু পুরুষ ও মহিলা   অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে উৎসাহ দেখায়, সেটা ঘরোয়াভাবেও হতে পারে আবার প্রাতিষ্ঠানিকগতভাবেও হতে পারে, তখন এই বয়সের অন্যান্যদের মধ্যে এই বিষয়টা নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীনতা লক্ষ করা যায়, এমনকী মেন্টরিং-এর বিরুদ্ধতাও করতে দেখা যায় তাদের। তারা তাদের সময় ও শক্তি বাচ্চাদের শেখানোর কাজে বা কেরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে ব্যয় করার চেয়ে টিভিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা খেলা দেখে ব্যয় করতে পছন্দ করে।

এই বিষম পার্থক্যের পিছনে কী কারণ থাকতে পারে? যেমন হয়তো আপনি অনুমান করতে পারছেন, এবিষয়ে ছোটবেলায় আমরা যাদের দ্বারা অনুপ্রেরিত হই, তাঁদের অনুকরণ করি প্রাপ্তবয়সে। ছোটবেলায় বাবা-মা এমনকী শিক্ষক বা ব্যক্তিগত মেন্টর বা পরামর্শদাতাকে বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হতে দেখার সৌভাগ্য যদি হয় আমাদের তাহলে আমরা বড় হয়ে নিজের জীবনে জেনারেটিভিটিকে আঁকড়ে ধরে চলার চেষ্টা করি। ঘটনাক্রমে এটি আমার জীবনে সত্যি হয়েছিল। কারণ আমার বাবা-মা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাদানের জন্য তাঁরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নতি করে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ার ভাবনাচিন্তা করতেন তাঁরা। স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় যে যাদের মধ্যে জেনারেটিভিটির মাত্রা খুব বেশি থাকে তারা সাধারণত নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কাজকর্মের সঙ্গে বেশি করে যুক্ত থাকে। এইধরনের অভিভাবকরা নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে তাদের  সন্তানদের মধ্যে মূল্যবোধ এবং জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জোর দেন। তারা সামাজিকভাবে উদাসীন সমসাময়িক মানুষের চেয়ে অনেক বেশি আনন্দে থাকেন। এই সমাহার সত্যিই অভাবনীয়!

মেন্টরিং-এর ক্ষেত্রে শুরুতেই যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে নিজেদের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নীচের মূলনীতিগুলো অনুসরণ করা একান্ত জরুরি- ১) এমন কাজ বাছতে হবে তা সে পেশাদারি ক্ষেত্রেই হোক বা অন্য ক্ষেত্রে, তাতে যেন আপনার বা আপনাদের ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রকাশ পায়। এটি আমাদের মানসিক বা দৈহিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ২) বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গী বজায় রাখা। আমাদের জীবনে কোনও সম্পর্কই একেবারে নিখুঁত হয় না। তাই মেন্টর হিসেবে আপনার ও মেন্টিস বা পরামর্শ গ্রহণকারীর মধ্যে মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত বাধা আসতে পারে। ৩) মেন্টিসের বিকাশ ঘটানো, অন্যের উপরে নির্ভরশীলতার পরিবর্তে তার মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। ৪) খুব ভালো শ্রোতা হওয়া জরুরি। মেন্টির নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা এবং কাজের পদ্ধতিকে খোলা মনে গ্রহণ করে আপনাদের দু'জনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এইধরনের মত বিনিময়ের ফলে আপনাদের দু'জনেরই উপকার হবে।         

ডা: এডওয়ার্ড হফ‌ম্যান, নিউ ইয়র্ক শহরে ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। উনি একজন অনুমোদিত মনোবিদ যিনি সাইকোলজি নিয়ে ২৫ টিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্প্রতি উনি ডা: উইলিয়াম কম্পটনের সাথে ‘পজিটিভ সাইকোলজি: দ্যা সায়েন্স অফ হ্যাপিনেস অ্যান্ড ফ্লারিশিং’ রচনা করেছেন। এছাড়াও তিনি ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ পজিটিভ সাইকোলজি’ এবং ‘জার্নাল অফ হিউম্যানিস্ট সাইকোলজি’র সম্পাদক মন্ডলীর সঙ্গে যুক্ত। আপনি তাঁর সাথে columns@whiteswanfoundation.org -এ যোগাযোগ করতে পারেন।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org