কল্যাণ

যোগের অন্তরালে বিজ্ঞান

গবেষকেরা যোগাভ্যাসের উপকারিতার স্বপক্ষে বাস্তব সম্মত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করে দিয়েছেন।

ডাঃ রামাজয়ম জি

যোগাভ্যাস শিল্প ও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের অঙ্গ হিসাবে হাজারের বেশী বছর ধরে বর্তমান। যদিও, অল্প কিছুদিন আগেই প্রকৃত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কাজ চালু হয়েছে। এর সব উপকারিতাগুলো খুঁজে এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, আর পাঁচটা বিজ্ঞানের মত এর বিষয়েও বিস্তারিত জানাটা যোগকে শিল্প রূপে দেখানোর মতই দরকারী।

পতঞ্জলির দেখানো নিয়মনিষ্ঠ পথ

মূলস্রোতের বিজ্ঞানে যেমন কিছু নির্দিষ্ট পথ আছে তেমনি পতঞ্জলির দেখান আটটা শাখাই হল যোগকে শেখার সঠিক রাস্তা। ইয়ম্‌, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণ, ধ্যান ও সমাধি হল যোগের আট অঙ্গ। ইয়ম্‌ ও নিয়ম হল ব্যবহারিক অদলবদল, আসন ও প্রাণায়ম হল শারীরিক সুস্থতার জন্য; প্রত্যাহার ও ধারণ মানসিক স্থিতির এবং ধ্যান ও সমাধি হল আত্ম-উপলব্ধির উপায়।

আমরা দেখতে পাই যে, পতঞ্জলি বিভিন্ন ধরণের মানুষের জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখেই মনকে বশে রাখার একই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও, কোন একটা বিষয়ে প্রথাগত রাস্তা গ্রহণের মাধ্যমেই সেই বিষয়ের উৎসে পৌঁছনো যায় কিন্তু কোন একটা বিষয় যার নিজেরই আটটা ভাগ আছে, তা ঠিক কিভাবে কাজ করে, স্বাভাবিকভাবেই সেটা বৈজ্ঞানিকদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। অনেক বাধা থাকা সত্ত্বেও গবেষকেরা এখন যোগাভ্যাসের উপকারিতার স্বপক্ষে বাস্তব সম্মত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন ও এর ফলেই যোগাভ্যাসকে যুক্তিযুক্ত বৈজ্ঞানিক সমর্থনে সফল হবে।

গবেষকেরা দেখেছেন যে যোগের দ্বারাঃ

হোমিওস্ট্যাটিক অবস্থাকে পুর্নবিন্যাস করে (রিসেট)

মানুষের শরীর সামঞ্জস্য বজায় রেখে কাজ করে। প্রত্যেকটা কোষ আশপাশের পরিবর্তনের সাথে অল্পবিস্তর মানিয়ে নিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে তার কাজ করে চলে। কিছু কিছু টিস্যুর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম আবার কিছু কিছু টিস্যুর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বেশী। যখন, কিছু কিছু ঘটনা যেমন হরমোনের ক্ষরণ হয়, তখন এই দুই ধরণের টিস্যুর মধ্যে প্রতিক্রিয়া (ফিডব্যাক) তৈরী হয়। এই প্রতিক্রিয়া বা ফিডব্যাকগুলোই  কোষের কর্মক্ষমতাকে স্থায়িত্ব ও স্বাভাবিকতা দেয়। এই পদ্ধতি, যা আশপাশের পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে, মানুষের শরীরের আভ্যন্তরীণ পরিবেশকে স্থায়িত্ব দেয় তাই হোমিওস্ট্যাটিস্‌ নামে পরিচিত। বেপরোয়া জীবনযাত্রা এই পদ্ধতির স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করে দেয় আর তা নিয়মিত যোগাভ্যসের দ্বারাই আটকানো যায়।

স্ট্রেস্‌কে (দৈনন্দিন জীবনের চাপ) নিয়ন্ত্রণ করে

এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে এবং যোগ হল এর খুব ভালো প্রতিষেধক। শরীরের নিউরো-এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের একটা নিজস্ব পদ্ধতি আছে এই স্ট্রেস্‌ বা চাপের সাথে লড়ার জন্য। কিন্তু অনেকদিন ধরে এই চাপের সাথে কোন উপযুক্ত নীতি বা কৌশল ছাড়াই যুদ্ধ করতে করতে এই সিস্টেমও বিপর্যস্ত হয়ে যায়। এর হলে না-বাচক কাজ যেমন চাপ বাড়ানোর হরমোনের প্রভাব বেড়ে যায় যার ফলে মানুষের শরীরে বিপরীত ক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। যোগ প্রথমে এর মূলে গিয়ে একে উচ্ছেদ করে শরীর ও মনকে শিথিলতা (রিল্যাক্স করে)এনে দেয়। এইরূপ নিয়ম মাফিক পদ্ধতিতে শরীরের কোষগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া, দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও তার নিয়ন্ত্রনের ওপর প্রগাঢ় ছাপ ফেলে।

অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমকে ফাইন টিউন করে

অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমের দুটো ভাগ আছেঃ সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম। সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম আপৎকালীন অবস্থা বা বিপদের সময় যে শারীরিক পরিবর্তনগুলো ঘটে তার জন্য দায়ী, আর প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম যখন শরীর বিশ্রাম নেয় বা খাবার হজমের সময় বা শারীরিক উত্তেজনার সময়। এগুলো সবই হল একে অন্যের পরিপূরক ব্যবস্থা যা একই সূত্রে কাজ করে শরীরকে সুস্থতা দেয়। যদিও, বেশিবার ব্যবহারের ফলে এই সব সিস্টেমগুলোর ভারসাম্যের তারতম্য ঘটে যার ফলে অসুস্থতা দেখা যায়। যোগের ফলে এই দু’প্রকার অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা পায় ও সার্বিক স্বাস্থ্যর উন্নতি ঘটে।

জীবনযাত্রার মানের উন্নতি

আমাদের জীবনে যোগের অনেক ইতিবাচক দিক আছে। এই উপকারিতাগুলো যিনি যোগাভ্যাস করছেন কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করেননি তিনিই বুঝতে পারবেন। মনের শান্তি, আনন্দ, সুখ ও আত্ম-সচেতনতা এগুলো হল কয়েকটা দিক যেখানে যোগের ইতিবাচক ফল দেখা যায়। এই পজিটিভ অনুভূতিগুলো শুধুমাত্র সুস্থ ভাবে বেঁচে তাকার ভিত নয়, এটা যাঁরা শেষ বা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন (ক্যান্সার, দুরারোগ্য রোগী বা শয্যাশায়ী রোগী) তাঁদের জন্যও খুব উপকারী যেহেতু এটা তাঁদের জন্য একটা আলোর মত যেখানে তাঁরা কিছুটা হলেও আলোর দিশা দেখতে পান। শরীরের না অঙ্গে এই সব কাজের ফলে যোগ সরাসরি কি কি উপকার করে তা নিচে লেখা হলঃ

  • রক্তের চাপ (ব্লাড প্রেসার) কম করে
  • হার্টের গতিবেগ বা রেট কমায়
  • অক্সিজেনের ব্যবহারের হার বাড়ায়
  • হজম ক্ষমতা বাড়ায়
  • শরীরে বিষের (টক্সিক সাবস্টেন্‌স) উৎপাদন কমিয়ে দেয়
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি হয়
  • নার্ভ ও মাস্‌লের যোগাযোগেরও (নিউরো-মাস্‌কিউলার কোর্ডিনেশন্‌) উন্নতি হয়
  • হরমনের ভারসাম্য বজায় থাকে

এটা প্রমাণিত যে, যোগের প্রধান লক্ষ্য – শরীরের শিথিলতা, ধীর ও স্থির শ্বাসপ্রশ্বাস এবং শান্ত মন আমাদের ওপরে লেখা উপকারিতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

ডাঃ রামাজয়ম জি নিমহ্যাস্নে যোগ নিয়ে পিএইচডি করছেন।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org