We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.
ডাঃ শ্যামলা বৎসা

বিস্ময়কর বছরগুলি

সম্পর্কের অবসান তোমার জন্য এক নতুন সূচনা হতে পারে - ডাঃ শ্যামলা বৎসা

কাউকে কেন আমাদের ভাল লাগে তা বলে বোঝানো কঠিন। তোমার মনের মানুষটিকে ভাল লাগার হাজারটা কারণ তুমি দেখাতেই পারো, কিন্তু তাও তুমি তাঁকে ভালবাসার কোনও যুক্তি খুঁজে পাবে না। তোমরা একে অপরের সাথে হাসিঠাট্টা এবং গল্প করে সময় কাটাতে পছন্দ করো। দুজনেই একই ধরণের বই পড়তে বা গান শুনতে পছন্দ করো। একসাথে থাকলে চারপাশের দুনিয়াটা যেন রঙিন হয়ে ওঠে। স্বভাবতই তুমি চিরকালের মত সেই দুনিয়াতে থাকতে চাও। কিন্তু চাইলেই কি আর সব কিছু পাওয়া যায়? সম্পর্কেও চিড় ধরে। সব প্রেম পরিণয় অবধি পৌঁছায় না।

তাছাড়া তুমি কি সত্যিই বিয়ে করতে চেয়েছিলে? তুমি শুধু জানতে যে তোমার ওর সাথে সময় কাটাতে ভাল লাগে, ব্যাস! নিবিড় ঘনিষ্ঠতাই যখন তোমার অসহ্য লাগতে শুরু করবে, তাকে বিচ্ছেদের বিপদ সঙ্কেত বলে জানবে। বিশেষত তোমার সাথে প্রথমবার এই রকম হলে হয়ত তুমি খুবই ভেঙ্গে পড়বে। বিগত দিনের মিষ্টি স্মৃতিগুলিকে তখন ভুলে যাওয়াটা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। কোনো নিকটজনের মৃত্যুর শোকের চেয়ে বিরহ শোক কোনও অংশেই কম নয়। ফলে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার, খাওয়াদাওয়া, পড়াশুনো বা খেলাধুলো সব কিছুই শিকেয় ওঠে। প্রেম শেষ, জীবন শেষ!

এই রকমটা যে হবে তা তুমি আগে বোঝোনি? রাতারাতি তো আর কিছু হয় না। এখন যদি তোমার বয়স ২০-২১ হয় তাহলে আন্দাজ ১৬-১৭ বছর বয়েসে তুমি এই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলে। প্রথম দেখাতে ভাল না লাগলে আজ হয়ত তোমরা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি মানুষে পরিণত হতে। তোমাদের পছন্দ অপছন্দও হয়ত আলাদা হত। হয়ত তোমাদের মধ্যে বর্তমানে কেউ একজন আর এই সম্পর্কের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। সে হয়ত অন্য কারও সাথে অনেক বেশী সচ্ছন্দ বোধ করে। কাজেই সম্পর্কে দাঁড়ি টেনে যাওয়ার অর্থ অপর জনের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, তোমার মধ্যে নয়।

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বা সমস্যাগুলি তোমার সঙ্গী তোমাকে বলতেই পারে। সেটা খুবই স্বাভাবিক। মন খুলে কথা বলতে পারলে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। অনিশ্চিয়তার ক্ষেত্রে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ভাঙ্গলে তুমি কষ্ট পাবে কিন্তু ভালবাসার স্বার্থে একে অপরের সাথে রোজ মানিয়ে নেবার চেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়াটা কি বেশী ভাল না?

কিছুদিনের জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিলেও আসতে আসতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তোমাকে ফিরতেই হবে। চারপাশে ভাল বন্ধুদের পেলে ক্রমশ সব কিছু স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করবে। তাছাড়া প্রেমে পড়ার পাশাপাশি অন্যান্য লোকজনের সাথে আলাপ হওয়াটাও তো জরুরি। কারণ অন্যদের সাথে মিশলে পরেই তুমি লোকজনকে এবং সর্বোপরি নিজেকে আরও ভাল ভাবে চিনতে পারবে। এর ফলে আগামী দিনে বিয়ের মতন গুরুত্বপূর্ণ সিধান্ত নিতে তোমারই সুবিধা হবে।

প্রেম ভেঙ্গে যাবার বহুদিন পর অবধিও ধাক্কা না সামলাতে পারলে কি করবে? কারণ এই দুঃখ তোমাকে ধীরে ধীরে শেষ করে দেবে। তোমার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যদি এই সবের ফলে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সম্ভবত তুমি ডিপ্রেশনে ভুগছো। তোমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটিও হয়ত আর তোমাকে সামলাতে পারছে না। সেইক্ষেত্রে তুমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবার কথা ভেবে দেখতে পারো।

আমাদের দেশে অনেক অভিভাবক নিজের সন্তানের প্রেমে পড়াটা মেনে নিতে পারেন না। সঠিক সময় হলে তাঁরা নিজেরাই সন্তানের জন্য যোগ্য জীবনসঙ্গী বেছে দিতে চান। বিভিন্ন কারনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তানেরা তা মেনেও নেন।

অনেকের কাছেই জীবনে কেরিয়ারের পরে প্রেম একটি অবশ্যম্ভাবী পর্যায়। আর তা হবে নাই বা কেন? প্রেম তো অন্যদের দেখাদেখি করার জিনিস না। সেইরকম সম্পর্ক তো আরোই টেঁকে না। প্রেম বা ভালবাসা পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না। দুজনের দুজনকে ভাল লাগে, এক সাথে কিছুদিন সময় কাটাবার পর সারা জীবন একসাথে কাটাবার ইচ্ছে মনের কোণে দানা বাঁধে। কিন্তু কিছু সময় না পেরোনো অবধি কোনো সম্পর্কের পরিণতি বোঝা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে তা আরও মজবুত হতে পারে বা ভেঙ্গেও যেতে পারে। অতিরিক্ত উচ্চাশার ফলেই অধিকাংশ প্রেম ভেঙ্গে যায়। কারণ মনে প্রাণে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও দেখা যায় দুইজনের মধ্যে কেউই কাউকে ভাল করে চেনে না। কেন? আমরা নিজেরাই নিজেদের সঠিক ভাবে চিনে উঠতে পারিনা তা ওপর আবার আরেকজন জটিল মানুষ!

এক সময় প্রেমের পরিণতি যেমন হবে আশা করেছিলে শেষমেশ সেই রকম হল না - সম্পর্কে বিচ্ছেদ মানে শুধু এইটুকুই। একটা অভিজ্ঞতা, জীবন খাতার একটা পাতা, তোমার সম্পূর্ণ অস্তিত্তের মাপকাঠি না। ভাল স্মৃতিগুলো মনে রেখে এগিয়ে যাওয়া, এটাই তোমার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

ডাঃ শ্যামলা বৎসা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন মনবৈজ্ঞানিক (সাইকিয়াত্রিস্ট) যিনি কুড়ি বছরেরও বেশী সময় ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত। এই সংক্রান্ত আরও লেখা এখানে পাক্ষিক ভাবে প্রকাশিত হবে। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন।