We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.
ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

ইতিবাচক জীবনযাপন

দৈনন্দিন জীবনে চাই সচলতা - ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

জীবনের সচলতা মানুষকে কাজের মধ্যে এমনভাবে ডুবিয়ে রাখে যার ফলে সে আর কোনও কিছুই ভাবতে পারে না। এই অভিজ্ঞতাটা খুবই সুখকর। যে কোনও মূল্যেই মানুষ এই আনন্দ ধরে রাখতে চায়।

আমেরিকান বাস্কেটবল সুপারস্টার কোবি ব্রায়ান্ট বলেছিলেন “সব কিছুই যেন ধীর গতিতে চলছে আর তুমি শুধু এই মুহূর্তটার মধ্যেই থেমে থাকতে চাও। তুমি তোমার নিজের বাইরে বেরতে চাও না কারণ তাহলেই তোমার ছন্দপতন ঘটবে।” অর্ধ শতাব্দী আগে শিল্পী পল ক্লি বলেছিলেন “'আমার চারপাশে সবকিছুই অদৃশ্য হয়ে যায়, এবং সৃষ্টি যেন শূন্যতা থেকে উঠে আসে...আমার হাত সঞ্চালিত হয় নিজের বাইরে থাকা কোনো ইচ্ছাশক্তির দ্বারা।”

পেশাদার খেলোয়াড় বা শিল্পী না হয়েও আপনি কী কাজের মধ্যে ডুবে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন ও তাতেই আনন্দ পেয়েছেন বা সময় কোথা দিয়ে কেটে গিয়েছে, তা বুঝতেই পারেননি? যদি এমন ঘটে থাকে, তাহলে বলতে হবে যে, আপনি জীবনের সচলতা সম্পর্কে সম্যক অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এর প্রভাব মানুষের ব্যক্তিগত এবং পেশাদারী জীবনে কতটা সেই বিষয় নিয়ে এখন গবেষণা চলছে কারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে কাজ করার অনীহার দ্বন্দ্ব প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কাজ মানুষের জীবনে খুশি থাকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এই বিষয়টা খুবই অবাক হওয়ার মতো যে, জীবনের গতিমানতার সঙ্গে ইতিবাচক মানসিকতার বড় একটা যোগ নেই। বরং ডাঃ মিহাই চিক্সজেন্টমিহ্যালির গবেষণায় এই ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষণাটি ভদ্রলোকের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে করা। মিহাইর জন্ম হাঙ্গেরিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি তাঁর শৈশবের কিছুদিন জেলে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। এখানে থাকাকালীন তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে, মস্তিষ্ক চালনার ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি-বুদ্ধি সব লোপ পাচ্ছে এবং তিনি যন্ত্রণা ভোগ করছেন। পরে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ওই জগৎটা ছিল একদম আলাদা। সেখানে ভয়াবহতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সেই সময় বাস্তবটা ছিল কড়া শাসনে বাঁধা।” বড় হয়ে তিনি যখন আঁকতে শুরু করলেন তখন দেখলেন যে সেই কাজটার মধ্যে তিনি ডুবে গিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিহাই ডক্টরেট করেন। শিল্পী এবং সৃষ্টিশীল মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। ঘটনাক্রমে এই গবেষণাই তাঁর মধ্যে জীবনপ্রবাহের ধারণা গড়ে দিয়েছিল। তাঁর মতে জীবনের সচলতা মানুষকে কাজের মধ্যে এমনভাবে ডুবিয়ে রাখে যার ফলে সে আর কোনও কিছুই ভাবতে পারে না। এই অভিজ্ঞতাটা খুবই সুখকর। যে কোনও মূল্যেই মানুষ এই আনন্দ ধরে রাখতে চায়। এর থেকেই গড়ে উঠেছে মিহাইর ইতিবাচক জীবনপ্রবাহের ধারণা।

জীবনের সচলতার উপাদানগুলি হল—

জীবনের গতিময়তা কীভাবে বোঝা যাবে? দৌড়বিদদের অভিজ্ঞতা 'বিইং ইন দ্য জোন'-এর উপর ভিত্তি করে রচিত গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সুশান জ্যাকশন এবং অস্ট্রেলিয়ার হার্বাট মার্‌শ ১৯৯৬ সালে তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশ করেন। জীবনপ্রবাহের ৯টি বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা হয়েছে—

১। চ্যালেঞ্জ-দক্ষতার ভারসাম্য— একজন মানুষের উচিত নিজের দক্ষতা ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে চলা। চ্যালেঞ্জ যদি খুব কঠিন হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা, অস্থিরতা বা বিমর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু আবার ঝুঁকিহীন কাজের মধ্যেও মানুষের একঘেয়েমি জন্মায়। মনঃসংযোগের ব্যাঘাত ঘটে।

২। কাজ এবং সচেতনতার মধ্যে সীমারেখা— কাজের মধ্যে যদি গতি থাকে তাহলে মানুষ সেই কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে। পেশাদার খেলোয়াড়রা প্রায়ই বলে থাকেন যে, মনের সচেতনতা সব কিছুকেই সহজ করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে মানুষের অহংকারও দূর হয়ে যায়।

৩। স্পষ্ট লক্ষ্য স্থির— একজন মানুষ কী কাজ করতে যাচ্ছে সে বিষয়ে তার পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। লক্ষ্যকে আগে স্থির করা প্রয়োজন। তারপর উপযুক্ত কাজের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যপূরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া দরকার। খেলার মাঠের প্রতিযোগিতার মধ্যে এই প্রবাহই লক্ষ্য করা যায়। লক্ষ্য স্থির হলে তবেই খেলায় জেতা সম্ভব।

৪। স্পষ্টভাবে সাড়া দেওয়া— মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে সাড়া পেতে চায়। কারণ নিজের কাজ সম্পর্কে মানুষ ওয়াকিবহাল থাকে। আসলে যে কোনও কাজের প্রতিক্রিয়া থেকে মানুষ সেই কাজের গতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে।

৫। কাজের প্রতি একাগ্র থাকা— মানুষের জীবনে প্রবাহ ঠিক থাকলে তারা লক্ষ্যে স্থির থাকে এবং তা থেকে বিচ্যুতি ঘটে না। সম্পূর্ণ মনঃসংযোগ জীবনের সচলতার একটা বৈশিষ্ট্য।

৬। নিয়ন্ত্রণের বোধ— মানুষের মধ্যে নিজেকে যোগ্য ভাবা এবং নিজের উপর প্রভুত্ব করার প্রবণতা রয়েছে। তবে বিষয়টা হেঁয়ালি হয়ে যায়, যদি না এর সঙ্গে মানুষের দক্ষতা যুক্ত হয়। দক্ষতা না থাকলে নিয়ন্ত্রণের বোধ জাগে না।

৭। আত্মসচেতনতা হারিয়ে ফেলা— মানুষের জীবন যখন তীব্র গতিতে প্রবাহিত হয়, তখন সে থামতে বা নিজের কৃতকর্মকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে বিরক্ত বোধ করে। আসলে এ সময়ে তার মধ্যে অহমিকা বোধ একদমই দেখা যায় না।

৮। সময় পরিবর্তন— সময় পরিবর্তনশীল। কখনও সময় ধীরে চলে। আবার কখনও খুব তাড়াতাড়ি সময় বয়ে চলে।

৯। আত্মসন্তুষ্টি (অটোলেটিক এক্সপিরিয়েন্স)— এই শব্দটির উদ্ভাবক চিক্সজেন্টমিহ্যালি। এটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে। “অটো” মানে আত্ম বা নিজ এবং “টেলস” মানে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। সহজভাবে বললে বলা যায় নিজের কাজে সন্তুষ্ট থাকার মনোভাব দেখা দেয়।

জীবনের সচলতার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলির সবই থাকতে হবে তেমন নয়। তবে জীবনপ্রবাহের ক্ষেত্রে এগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে কোনও সর্বজনগ্রাহ্য মত নেই। কিন্তু সাধারণভাবে বলা যায় যে, চ্যালেঞ্জ-দক্ষতা ভারসাম্য, কাজের প্রতি মনঃসংযোগ, আত্মসচেতনতা হারিয়ে ফেলা এবং অটোলেটিক মনোভাব থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এগুলি বহু মানুষের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সত্যিই কি এগুলি আমাদের ভালো থাকতে সাহায্য করে? উত্তরটা সবসময়েই 'হ্যাঁ'। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ জুডিথ লুফেভরুর গবেষণার কথা। মানুষের জীবন যদি গতিময় থাকে, তাহলে তার মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে ওঠার প্রবণতা থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মনোযোগ, সৃষ্টিশীলতা এবং সুস্থ মেজাজ-মর্জি। এই বিষয়ে বয়স্কদের উপরে গবেষণা চালান সিওল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডাঃ সিওংয়েউল হান। একজন কোরিয়ান মহিলা তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, জীবনের প্রবাহ তাঁকে আনন্দ দেয়। যাঁদের ক্ষেত্রে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না, তাঁদের থেকে তিনি ভালো রয়েছেন। জীবনে তাঁর একা লাগে না। খুব ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে তিনি জীবন কাটান।

জীবনপ্রবাহ সৃষ্টি করা

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, জীবনের গতিময় প্রবাহ সব বয়সের মানুষের আনন্দ এবং আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি করে। এই কারণে এই বৈশিষ্ট্যকে আরও বেশি করে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে জাগানো উচিত। সবচেয়ে বড় কথা কে না ভালোভাবে জীবন কাটাতে চায়? জীবনের সচলতা আমাদের জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে সাহায্য করে। আর এই একঘেয়েমির সঙ্গে মানুষের মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা যুক্ত। জীবনের প্রবাহের গতি সম্পর্কে আগে থেকে কোনও ধারণা করা যায় না, বা এটা সুযোগের উপর নির্ভর করে- এটা খুব ভুল ধারণা। কারণ অনেক মানুষই জানে কীভাবে জীবনের প্রবাহ বজায় রাখতে হয়। এবং তারা সেই মতোই কাজকর্ম করে।

এখানে তিন ধরনের কাজের কথা উল্লেখ করা হল—

১। জীবন যখন সচল সেই সময়টা লিখে রাখতে হবে—অতীতের অভিজ্ঞতাই এখানে লিপিবদ্ধ করা জরুরি। সেখানে কোনও সৃষ্টিশীল কাজ, ঘরের কাজ, প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত কাজ, শিল্প-সাংস্কৃতিকমূলক কাজ যেমন— আঁকা, নাচ বা খেলায় অংশগ্রহণ করা প্রভৃতি থাকতে পারে। এই বিষয়গুলি সম্পর্কে সবকিছুই লিখে রাখতে হবে। যেমন—এগুলি কোথায় হয়েছে, কে সঙ্গে ছিল, কতক্ষণ ধরে চলেছিল আর কী উদ্দেশ্যে এগুলি হয়েছিল।

২। এসব চিন্তা করার পাশাপাশি কাজের চ্যালেঞ্জ এবং দক্ষতার বিষয়টিও মনে করতে হবে। যেমন— সেই সব কাজের মধ্যে কতটা ভাবাবেগ, বুদ্ধি বা শারীরিক সক্ষমতার দরকার ছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে মানসিক এবং শারীরিকভাবে কতটা সক্ষমতা দেখাতে হয়েছে, সেই বিষয়টিকেও চিন্তাভাবনা করতে হবে।

৩। জীবনের সচলতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে। কীভাবে জীবন প্রবাহকে ধরে রাখা যায় সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ঘরের কাজ করতে না অন্য কাজের মধ্যে দিয়ে জীবনের সচলতা রক্ষা করা সম্ভব, তা উপলব্ধি করতে হবে। এটাও বুঝতে হবে যে, জীবনের গতিকে ধরে রাখতে একা না সবাইকে নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগছে। এভাবে আত্মপ্রতিক্রিয়া জীবনের ধারাকে সঠিক পথে চালিত করে জীবনকে সুস্থ-সুন্দর করে তোলে।    

এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান নিউ ইয়র্কের ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে অতিরিক্ত সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। তাছাড়া উনি একজন অনুমতিপ্রাপ্ত মনোচিকিৎসক। মনোবিজ্ঞান জগতে ওঁনার সম্পাদিত এবং লেখা ২৫টিরও বেশি বই আছে। সম্প্রতি ডাঃ উইলিয়াম কম্পটন রচিত পজিটিভ সাইকোলজি: দ্য সায়েন্স অফ্‌ হ্যাপিনেস অ্যান্ড ফ্লারিশিং বইটিতে সহ লেখকের ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া উনি ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ্‌ পজিটিভ সাইকোলজি এবং জার্নাল অফ্‌ হিউম্যানিস্টক সাইকোলজি’র সম্পাদক মণ্ডলীর অন্তর্গত। 

আপনি তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org ঠিকানায় চিঠি লিখতে পারেন।