We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.
ডাঃ শ্যামলা বৎসা

বিস্ময়কর বছরগুলি

সন্তানের আচরণগত অস্বাভাবিকতা কি বিপদের পূর্বাভাস? - ডাঃ শ্যামলা বৎসা

অল্পবয়সিদের কেন তাদের অভিভাবকরা ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া উচিৎ?

আমার যখন অর্জুনের সঙ্গে পরিচয় হয় তখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। সে তার বারো ক্লাসের পরীক্ষায় পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং অঙ্কে ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল। কিন্তু এত নম্বর পেয়েও তার মন ভরেনি। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আবার পরীক্ষায় বসার। আসলে অর্জুন ১০০ শতাংশ নম্বর পেতে চেয়েছিল। তারপর থেকে যখনই পরীক্ষা হত ততবারই সে পরীক্ষায় বসার জন্য ফর্ম পূরণ করত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পরীক্ষায় বসত না। সে বই নিয়ে বসে থাকত এবং সবসময়ে চিন্তা করত। এইভাবে পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ নম্বর না পাওয়ার জন্য তার মধ্যে গুরুতর মানসিক উদ্বেগ দেখা দেয়। তাছাড়া ছেলেটি সবসময়ে ভাবে যে, সে পরীক্ষা দিচ্ছে।

নমিতা ছিল একজন অল্পবয়সি, ছিমছাম থাকা মেয়ে। সে সবসময়ে তার সুন্দর  হাতের লেখা, পরিচ্ছন্ন স্কুলের পোশাক এবং বইয়ের যত্ন করার জন্য সবার কাছ থেকে প্রশংসা পেত। নমিতা ক্লাস সেভেন পর্যন্ত প্রথম হত। কিন্তু ক্লাস এইটে উঠে নমিতা বুঝতে পারল যে, পড়াশোনার চাপ সামলানো তার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ সব কাজে নিখুঁত হতে গিয়ে সে ক্রমশ মনের দিক থেকে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছিল। এইভাবে নমিতা একপ্রকার ভয়ে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ফাইনাল পরীক্ষার আগে সে একেবারেই ভেঙে পড়ে। নমিতা তার ডাক্তারের সুপারিশ মতো আমার কাছে আসে। তারপর তাকে অস্থিরতা দূরকারী ওষুধের সাহায্যে শান্ত করার চেষ্টা শুরু হয়।

মারিয়া তাঁর ১৬ বছরের ছেলে শ্যামকে নিয়ে আমার কাছে আসেন। ছেলেটির সমস্যা ছিল সে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ছ'বার সদর দরজা বন্ধ রয়েছে কিনা দেখত। বিছানায় শোওয়ার পর সে তার মাকে আরও তিনবার দরজা ঠিকঠাক লাগানো রয়েছে কিনা, তা দেখতে বলত। এভাবে গাড়ি পার্ক করে তা ঠিকমতো বন্ধ করা হয়েছে কিনা, তাও সে বারবার দেখা শুরু করে। ক্রমে এগুলি তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। শ্যাম বরাবরই বেশ সতর্ক ছেলে ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে কেন যে সে এত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করল, তা তার মায়ের কাছে কিছুতেই বোধগম্য
হচ্ছিল না।

লতিকা একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করত। বোর্ডিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক জানান যে, লতিকা অনেকক্ষণ ধরে বাথরুমে থাকে। এমনকী ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সে হাত ধুতে বেরোয়। খেতে বসে লতিকা তার থালা এবং চামচ ভালো করে ধুয়ে নিয়ে তবে খেত। এসব দেখে অন্যান্যরা হাসাহাসি করত। ঘটনাক্রমে মেয়েটির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বাতিকের ফলে সে তার ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে শুরু করে বা ক্লাসে পৌঁছাতে তার দেরি হয়ে যায়। এভাবে কিছুদিন চলার পর স্কুল থেকে লতিকার বাড়িতে খবর দেওয়া হয়। মাস তিনেক আগে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে
যাওয়া হয়েছে।

পড়াশোনার জন্য সজাগ থাকা, নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, চনমনে এবং সতর্ক থাকা বাচ্চাদের গুণ বলে বিবেচনা করা হয়। ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ে উন্নতি করার জন্য সবসময়েই একটা চেষ্টা থাকে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল অল্পবয়সিদের কেন তাদের অভিভাবকরা ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়?

উপরে বাচ্চাদের যেসব আচরণের কথা বলা হল সেগুলি তাদের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেগুলির মধ্যে খানিকটা বাড়াবাড়ি রয়েছে। কোন কাজটি করা উচিত, তা তারা সবসময়ে নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে না। পরিষ্কারের বাতিক বা খুঁতখুঁতে স্বভাব বাচ্চাদের মনে একপ্রকার অসন্তুষ্টির মনোভাবের জন্ম দেয়। তাই জন্য তারা এক কাজ বারবার করতে চায়।

পরিষ্কার করা, বারবার কোনও জিনিস পরীক্ষা করা বা জিনিসপত্র ছিমছাম করে গুছিয়ে রাখার কাজগুলি সময়সাপেক্ষ। যে সব মানুষের এইসব বাতিক থাকে, তারা এমনভাবে এই ধরনের বিষয়ে নিজেদের আটকে রাখে, যার ফলে তারা অন্য কাজ করতে পারে না, ঘুমায় না, বাড়ির বাইরে বেরোতে চায় না। তাদের এই আচরণের পিছনে আসল কারণটা কেউ বুঝতে পারে না বলে তারা খিটখিটে হয়ে যায়, মাঝে-মাঝে রেগে যায়।

মানুষের এই ধরনের অস্বাভাবিক আচরণের পিছনে থাকে তার মনের অদ্ভুত চিন্তাভাবনা। আর সেসব চিন্তাভাবনার বদল বা সংশোধন করা একান্ত জরুরি বিষয়। চশমা পরলে যেমন আমরা ভালো দেখতে পাই, ইনহেলার ব্যবহার করলে যেমন শ্বাস নেওয়ার সুবিধা হয়, তেমন মানুষের চিন্তাভাবনার উন্নতির ক্ষেত্রেও এরকম সাহায্যের প্রয়োজন থাকে। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এক্ষেত্রে সব দিক খতিয়ে দেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

রোগ নির্ধারণের পর মনোবিদ সাধারণত ওষুধ প্রয়োগ করেই চিকিৎসা শুরু করেন। যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে রুগিকে বিশেষ থেরাপির জন্য একজন সাইকোলজিস্টের কাছেও নিয়ে যাওয়া যায়। প্রাথমিক রোগ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে সবসময়ে একজন ডাক্তারের পক্ষে রোগের যথাযথ লক্ষণগুলি বোঝা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের অসুস্থতার পিছনে ঠিক কোন কারণ রয়েছে, তা আগে থেকে ধারণা করা খুবই কঠিন। রুগির মুখ দেখে হয়তো মনে হচ্ছে সে খুব বিরক্তিপূর্ণ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি ঠিকঠাক পরীক্ষা না করে যদি চিকিৎসা করা হয়, তাহলে তা বিপদও ডেকে আনতে পারে। রোগ সারানোর ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখা হয়। কমবয়সিরা চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে কিনা, তা প্রকাশ পায় তাদের চালচলনের মাধ্যমে।

অর্জুন চিকিৎসা শুরু হওয়ার চার মাস বাদে বারো ক্লাসের পরীক্ষায় বসে। সে ভালো ফল করে এবং তামিলনাড়ুর নাম-করা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়। সেখানেও সে নিয়মিত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং মাঝে-মাঝে আমাকে ফোন করে তার অবস্থার উন্নতির কথা জানাতে থাকে। তার কাছ থেকে আমি শেষ ফোন পেয়েছিলাম প্রায় সাত বছর আগে। ওই বছরই অর্জুন তার জীবনের প্রথম চাকরিতে যোগ দেয়।

নমিতা এখন বারো ক্লাসে পড়ছে। বিগত পাঁচ বছর ধরে সে খুব ভালো পড়াশোনা করছে এবং কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখনও নমিতা অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। তার মধ্যে ছিমছাম ও টিপটপ থাকার লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিন্তু নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা আর নেই।

শ্যাম গত আট মাস ধরে চিকিৎসাধীন। দরজা বন্ধ রয়েছে কিনা বারবার দেখার বাতিক তার অনেকটাই কমে গিয়েছে। সে এখন ৭০ শতাংশ সুস্থ।

লতিকার মাত্র এগারো বছর বয়স। তার সমস্যা ছিল পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন থাকতে গিয়ে স্কুলে দেরি করে পৌঁছনো বা ক্লাসে না যাওয়া। এর থেকে তার গুরুতর মানসিক উদ্বেগের সমস্যা হয়। ওষুধ প্রয়োগের ফলে তার এই সমস্যা অনেকটাই কমেছে এবং পরিচ্ছন্নতার বাতিকও কমেছে। কিন্তু রোগের লক্ষণ গুরুতর হওয়ায় নমিতা এখন থেরাপির সাহায্য নিচ্ছে।

এই লেখার মধ্য দিয়ে ডাঃ শ্যামলা বৎসা দেখাতে চেয়েছেন যে, কমবয়সি ছেলে-মেয়েদের আচরণগত পরিবর্তনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা। কীভাবে অল্পবয়সিদের আচরণগত বদলের পূর্ব লক্ষণগুলি মানসিক বিকারের রূপ নেয়, তা এই প্রবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এই লেখায় যেসব ছেলে-মেয়েদের সমস্যার কথা গল্পের ছলে বলা হয়েছে, তা থেকে সমাজ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবারই শিক্ষা নেওয়া জরুরি। তা না হলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।

ডাঃ শ্যামলা বৎসা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন মনোবৈজ্ঞানিক (সাইকিয়াত্রিস্ট) যিনি কুড়ি বছরেরও বেশী সময় ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত। এই সংক্রান্ত আরও লেখা এখানে পাক্ষিক ভাবে প্রকাশিত হবে। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন।