We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.
ডাঃ অনিল পাটিল

যতনের যতন

যত্নপ্রদানকারীর সমস্যাটি বুঝুন - ডাঃ অনিল পাটিল

আমি এর আগের প্রবন্ধে বলেছিলাম যে আমি একজন যত্নপ্রদানকারীর মানসিক সুস্থতার বিষয়ক লেখায়, পরিচর্যা করলে তা শারীরিক অবস্থার উপর কি রকম প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বলব। আমাদের কাজ চলাকালীন আমরা অনেক সময়েই শুনতে পাই যে যত্নপ্রদানকারীরা নিজেদের পরিস্থিতির কথা ভেবে মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন। একজন মানুষের যত্ন নেওয়া বেশ কঠিন কাজ হতে পারে, এর কারণে একজন যত্নপ্রদানকারীর মাঝেমাঝে বিরক্তি লাগতে পারে। যদিও, এতে লজ্জার কোনও কারণ নেই। কেউ যদি তাঁদের প্রশংসা করে বলেন যে “আপনি একজন দেবীর মতো যত্ন নেন, যা অন্য কেউ পারে না”, বা “বিশেষ সন্তানদের জন্য বিশেষ অভিভাবকের প্রয়োজন হয়, তাই উনি আপনার কাছে এসেছেন”, তখন সেই যত্নপ্রদানকারী খুব উজ্জীবিত বোধ করেন। কিন্তু এর ফলে হিতে-বিপরীত হতে পারে।

একজন যত্নপ্রদানকারীর কাছে পরিচর্যা করার বেশ কিছু অংশ খুব কঠিন লাগতে পারে, যেমন তাঁদের উপর নির্ভরশীল ব্যাক্তির অদ্ভুত ব্যবহার বা নিজেদের ঘুমের সমস্যা, ইত্যাদি। যত বেশি তাঁরা রোগীর পরিচর্যা করেন, তত বেশি তাঁদের মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সম্পর্কের কারণে চাপের প্রভাবটি আরও বেশি করে পড়ে, যেমন, একজন যত্নপ্রদানকারী যদি তাঁর নিজের স্বামী বা স্ত্রীয়ের যত্ন নেন, তাহলে তাঁর মধ্যে হতাশ হওয়ার প্রবনতা বেশি দেখা যেতে পারে।  

যদি একজন যত্নপ্রদানকারী তাঁদের এই সব সমস্যাগুলি অন্যদের সাথে আদান প্রদান না করতে পারেন, তাহলে তাঁরা দুশ্চিন্তা, চাপ আর একাকীত্বে ভুগবেন। তাই অন্যদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে একটু নিজের কাজ থেকে বিরতি নেওয়া প্রয়োজনীয়। মানসিক সাহায্যের জন্যও একজনকে প্রয়োজন হবে, যাকে তিনি নিজের সমস্যাগুলির কথা বলতে পারবেন। কোন প্রতিবেশী বা বন্ধু এগিয়ে এসে তাঁর সাহায্য করতে পারেন, বা তিনি কোনও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন এবং অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।

চিকিৎসা না করলে বা অবহেলা করলে, যত্নপ্রদানকারীর এই মানসিক চাপ ও আবেগজনিত সমস্যাগুলি মানসিক অসুস্থতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর ফলে তাঁদের নিজের এবং তাঁদের প্রিয়জনের জীবন ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

তাহলে দেখা যাক আসল সমস্যার জায়গাগুলি কি। এর থেকে আপনি একজন যত্নপ্রদানকারীর সাহায্যও করতে পারবেন।

চাপ ও চিন্তা: যত্নপ্রদানকারীর পক্ষে পরিচর্যা করার দায়িত্বটি দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁরা বেশিরভাগ সময়েই নিজেদের প্রিয়জনের কথা ভেবে বা তাঁদের জন্য কি করতে হবে ভেবে কাটিয়ে দেন; এই বাইরে বেরোনো তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই কারণে তাঁদের ঘুমের সমস্যা হয়, খাওয়াদাওয়াও অস্বাভাবিক বেড়ে যায় বা কমে যায়। মনে উদাসীনতাও জন্ম নেয়। এই রকম বেশি দিন ধরে চলতে থাকলে, এটি মানসিক রোগে পরিণত হয় এবং তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন।

সামাজিক একাকিত্ব: অনেক যত্নপ্রদানকারীই সমাজের লোকজনের সঙ্গে ভাল ভাবে মেলামেশা করতে পারেন না এবং নিজেদের শখগুলি পরিপূরণ করতে পারেন না। আমাদের প্রজেক্টের মাধ্যমে দেখা গিয়েছে, যে ৮৮% যত্নপ্রদানকারীই বলেছেন যে তাঁরা নিজেদের জন্য সময় বার করতে পারেন না। অনেক সময় নিজেদের জন্য সময় বার করলে তাঁদের মনে গ্লানি ও সংকোচও দেখা দেয়। তাঁদের বা তাঁরা যাদের পরিচর্যা করেন, তাঁদের কে নিয়ে কুণ্ঠার কারণে, মানসিক অসুস্থতা জড়িত কথাবার্তা কারোর সামনে বলতে পারেন না। এর ফলে তাঁরা একাকীত্ব, হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ভুগতে পারেন, যা ৭৭% মানুষজনের মধ্যে দেখা গিয়েছে।

হতাশা ও রাগ: অনেক সময় একজন যত্নপ্রদানকারীর মনে হতাশা ও রাগ জন্ম নেয়, বিশেষ করে যখন পরিচর্যা করার কারণে তাঁদের কর্মক্ষেত্রকেও বিসর্জন দিতে হয়। তাঁদের মনে হতে পারে, যে তাঁদের কাছে অন্যের পরিচর্যা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। এই রাগ কখনো নিজের পরিবারের সদস্য বা যার পরিচর্যা করছেন, তাঁর উপর বেরিয়ে আসে। এই কারণে তাঁদের মধ্যে গ্লানি শুরু হতে পারে, যার থেকে ধ্বংসাত্মক চিন্তাভাবনা জন্ম নেয়।

আত্ম-সম্মান হানি: যত্নপ্রদানকারী হওয়ার কারণে মানুষের আত্মসম্মানে গভীর ধাক্কা লাগতে পারে। তাঁদের মনে হতে পারে তাঁরা কারোর যত্নের যোগ্য নন, আর তাঁদেরকে সব সময় যার যত্ন নিচ্ছেন, তাঁর খেয়াল রাখতে হবে। তাঁরা নিজেদের উপর থেকে বিশ্বাস হারাতে শুরু করতে পারেন। তাঁরা ভুলে যেতে শুরু করেন যে তাঁদের অন্যের যত্ন নেওয়া ছাড়াও অন্য কাজ করার ক্ষমতা আছে।  

টাকা পয়সার চিন্তা: যত্নপ্রদানকারীদের সর্বদা রোগীকে যত্ন করার কথা ভাবতে হয়, তাঁদের ওষুধের খরচ, চিকিৎসা, যাতায়াত ও ইত্যাদির খরচের কথা ভাবতে হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন পড়তে পারে। ফলে তাঁদের নিজেদের খরচ কমাতে হয়, যার থেকে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি হয়। অনেকে অভাবে পড়ে টাকা ধার নেন। দশ জনের মধ্যে ন’জন ব্যাক্তিই বলেছেন যে তাঁদের অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

একজন যত্নপ্রদানকারীর অবধি যত্নের ও পাশে থাকার প্রয়োজন, যাতে তাঁদের মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে। এরকম যত্ন তাঁরা তখনই পাবেন, যখন আমরা পরিচর্যা করার বিষয়ে খোলাখুলি  কথা বলব। কারণ আমরা প্রত্যেকেই জীবনের কোনও না কোনও সময়ে অন্যের যত্ন নেব বা নিজেরা যত্ন গ্রহন করব। এর পরের প্রচ্ছদটিতে আমি বলব কি ভাবে একজন যত্নপ্রদানকারীর মানসিক ভাবে পাশে দাঁড়ানো যায় এবং কেয়ারার্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড সংস্থা কি ভাবে মানসিক সাস্থের যত্ন নেয়।

ডাঃ অনিল পাটিল কেয়ারারস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা এবং কার্যনিবাহী অধিকর্তা। এই সংস্থা মনোরোগীর পরিচর্যাকারী, যারা বিনামূল্যে সেবা করেন, তাদের সাহায্য করে থাকে। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা শুধুমাত্র উন্নয়নশীল দেশগুলিতেই কাজ করে। ডাঃ পাটিল তাঁর সহকর্মী রুথ পাটিলের সাথে এখানে লিখছেন। আরও জানতে আপনি লগ ইন করতে পারেন www.carersworldwide.org তে অথবা লিখে পাঠান columns@whiteswanfoundation.org ঠিকানায়।

এই প্রচ্ছদটিতে লেখক নিজের ব্যাক্তিগত মতামত প্রকাশ করেছেন এবং তা ওয়াইট সোওয়ান ফাউন্ডেশনের মতামত থেকে ভিন্ন হতে পারে।