ডাঃ অনিল পাটিল

যতনের যতন

সাহায্য গোষ্ঠী যত্নপ্রদানকারীদের উপর থেকে চাপ কমাতে পারে - ডাঃ অনিল পাটিল

এর আগের প্রচ্ছদটিতে আমরা দেখেছি যত্নপ্রদানকারীদের উপর কি রকম চাপ সৃষ্টি হয় এবং সেই কারণে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কি রকম প্রভাব পড়তে পারে। তাঁদের সমস্যাগুলিকে তাড়াতাড়ি বুঝে, তাঁদের সাহায্য প্রদান করলে তাঁরা সুস্থ থাকবেন এবং রোগীর যত্নও নিতে পারবেন। ফলে সহজেই তাঁদের মধ্যে মানসিক বা আবেগজনিত সমস্যারও প্রতিকার করা যাবে।

পরিবারের সদস্য বা বন্ধুবান্ধবরাই একজন যত্নপ্রদানকারীকে ভাল ভাবে সাহায্য করতে পারবেন। তাঁদের সাহায্য পেলে একজন যত্নপ্রদানকারী মানসিক ও শারীরিক ভাবে চাপমুক্ত থাকবেন। খেয়াল রাখতে হবে, তাঁরা যেন ভাল করে খাওয়াদাওয়া করেন এবং ভাল করে ঘুমান। আপনি তাঁকে নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যেতে পারেন, বা তাঁকে টাটকা শাকসব্জি এবং ফল কিনে খাওয়াতে পারেন। ভাল ঘুমের অভাবে অনেক সময় হতাশা ও ক্লান্তি দেখা দেয়। খেয়াল রাখুন, তাঁরা ঠিক মতো রোজ ঘুমাচ্ছেন কিনা, বা যদি ঘুম না হয় তাহলে অন্য একজনকে রাখার ব্যাবস্থা করুন, যিনি রাত্রের দিকে রোগীর যত্ন নিতে পারবেন। অথবা তাঁকে দিনের বেলায় ঘুমিয়ে নিতে বলুন। দরকার হলে নিয়মিত তাঁদের ব্যায়াম করতে বলুন। আপনি তাঁদের হাঁটতে বা যোগব্যায়াম করতে পাঠিয়ে নিজে একটু তাঁদের প্রিয়জনের পাশে বসুন। যদি তিনি একা হাঁটতে যেতে রাজি না হন, তাহলে আপনিও তাঁর সঙ্গে হেঁটে আসুন। এই রকম করলে আপনিও তাঁদের সঙ্গে খোলামেলা ভাবে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে পারবেন, তাঁদের সম্পর্কে জানতে পারবেন। আর চেষ্টা করবেন এই সময় পরিচর্যা করা নিয়ে কোনও আলোচনা না করার।

এর সঙ্গে সঙ্গে যদি একজন যত্নপ্রদানকারী অন্য একজন যত্নপ্রদানকারীর সঙ্গে সাক্ষাত করে, একে অপরের অভিজ্ঞতার বিষয়ে আলোচনা করেন, তাহলে সেটাও তাঁদের কাছে মানসিক ভাবে একটি বড় প্রাপ্তি। গত দু’বছর ধরে কেয়ারার্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড আরও অন্যান্য কিছু সংস্থার সঙ্গে একত্র হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যত্নপ্রদানকারীকদের এনে, তাঁদের জন্য একটি সাহায্য গোষ্ঠী খোলার চেষ্টা করছে। এই গোষ্ঠীগুলি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের চাহিদা, ভূগোল ও সংখ্যা অনুযায়ী নিজেদেরকে বিস্তার করে। কিছু কিছু গ্রামে এরকম গোষ্ঠী দু’সপ্তাহে একবার করে দেখা করে, আবার কিছু কিছু জায়গায় মাসে একবার করে। এক একটি গোষ্ঠীতে অভিজ্ঞ কর্মীরা থাকেন, বিশেষ করে সেই অঞ্চলের এন জি ও থেকে, যারা মানসিক ভাবে অসুস্থ ব্যাক্তিদের সঙ্গে বছর দশেক ধরে ওখানে কাজ করেছেন । কেয়ারার্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড এই সকল এন জি ও ’র সাথে যুক্ত হয়ে যত্নপ্রদানকারীদের ভূমিকা বোঝার চেষ্টা করে এবং তাঁদের এবং তাঁদের প্রিয়জনের সমস্যাগুলিকে সঠিক ভাবে সমাধান করতে সাহায্য করে। বহু যত্নপ্রদানকারী এই গোষ্ঠীতে অংশগ্রহণ করে, তাঁদের উপর পড়া চাপকে কমিয়ে তুলতে পেরেছেন এবং বাইরের জগতে মেশার সুযোগও পেয়েছেন। প্রথমবার কোনও গোষ্ঠী একত্রিত হলে, সেখানকার সদস্যরা একে অন্যের থেকে অনেক কিছু জানতে পারেন। তাঁরা তাঁদের প্রিয়জনদের যত্ন নিতে এতটাই মগ্ন থাকেন অন্য সময়, যে তাঁদের কাছ থেকে যদি কেউ তাঁদের নিজেদের খবরাখবর জানতে চান, তাহলে তাঁরা খুব খুশি হন। তাঁরা গোষ্ঠীর সঙ্গে ১০০% জড়িত থাকেন। বন্ধুত্ব ও সাহায্যের মাধ্যমে তাঁরা নিজেরা বুঝতে পারেন, যে তাঁরা কেউই একলা নয়। এর থেকে তাঁদের মধ্যে সাহসিকতা ও আত্মমর্যাদা জন্ম নেয়।

এই সব যত্নপ্রদানকারীদের গোষ্ঠী একত্র হবার ফলে যা ভাবা হয়েছিল, তাঁর চেয়ে সবাই অনেক বেশি লাভবান হয়েছেন। উত্তর কর্ণাটকের একটি গ্রামের গোষ্ঠী সদস্যরা মিলে একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন যাতে গোষ্ঠীর বাইরে থেকে তাঁরা তৎক্ষণাৎ সাহায্য পেতে পারেন। যদি কোনও সদস্য অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে অন্য একজন সদস্য তাঁকে ফোন করেন এবং জানতে চান তিনি কেমন আছেন এবং কেন তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। তারপর তাঁরা যে ভাবেই হোক সেই ব্যাক্তির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, যাতে প্রয়োজনের সময় তাঁকে সাহায্য করা যেতে পারে। সদস্যরা নিয়মিত একে অপরকে ফোনে যোগাযোগ করতে থাকেন, যাতে তাঁদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় উপদেশ পাওয়া যায়। কোনও সদস্যের যদি কোনও বিশেষ প্রয়োজন থাকে, তাহলে অন্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করা হয়। তাঁরা একে অপরের হয়ে নিজেদের প্রিয়জনের পরিচর্যা করেন। তিলোত্তমা বলে আমাদের ঝাড়খণ্ডের একজন প্রতিনিধি মাঝেমাঝে অন্য যত্নপ্রদানকারীদের প্রিয়জনের যত্ন নেন, যাতে সেই যত্নপ্রদানকারী একটু সময় নিয়ে পরিবারের অন্য সকল কাজ করতে পারেন। আমরা যখন সাহায্য গোষ্ঠীগুলিতে গিয়েছিলাম, তাঁরা সকলেই বলেছিলেন যে তাঁরা এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে, মানসিক ভাবে একটু শান্তি পেয়েছেন। যে সব যত্নপ্রদানকারীরা বেশি করে মানসিক চাপ বা হতাশায় ভুগতে থাকেন, তাঁদের জন্যও গোষ্ঠীতে যোগদান করা অত্যন্ত প্রয়োজন কারণ সেখানে তাঁরা অভিজ্ঞ ব্যাক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ পাবেন। এই ধরণের সুবিধা কোনও ভয় বা কুণ্ঠা ছাড়াই সকলেরই পাওয়া উচিৎ, যাতে তাঁরা নিজেদের সমস্যাগুলি থেকে একটু মুক্তি পায়।

যত্নপ্রদানকারীরা সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ভুমিকা পালন করেন। তাঁদের সমস্যাগুলি সকলের বোঝা উচিৎ এবং তাঁদেরকে যথেষ্ট সাহায্য করা উচিৎ। রশিদা বেগম নিজের তিন সন্তানের যত্নপ্রদানকারী, যারা মাসল্‌ ডিসট্রফিতে ভুগছেন। তিনি বলেন যে, “জীবনটা এখনও খুব কঠিন, আমার সমস্যাগুলি এখনও রয়েছে, কিন্তু এখন আমার কাছে একটি সাহায্যের হাতও রয়েছে, যার সাহায্যে আমি ভবিষ্যতের সম্মুখীন হতে পারব।”

এর পরের প্রবন্ধটিতে আমি আলোচনা করব, কেন একজন যত্নপ্রদানকারীর সাময়িক ভাবে একটু বিরতির প্রয়োজন হয়, এবং আর কি কি নতুন উপায়ে একটি গোষ্ঠীকে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। 

ডাঃ অনিল পাটিল কেয়ারারস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা এবং কার্যনিবাহী অধিকর্তা। এই সংস্থা মনোরোগীর পরিচর্যাকারী, যারা বিনামূল্যে সেবা করেন, তাদের সাহায্য করে থাকে। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা শুধুমাত্র উন্নয়নশীল দেশগুলিতেই কাজ করে। ডাঃ পাটিল তাঁর সহকর্মী রুথ পাটিলের সাথে এখানে লিখছেন। আরও জানতে আপনি লগ ইন করতে পারেন www.carersworldwide.org তে অথবা লিখে পাঠান columns@whiteswanfoundation.org ঠিকানায়।

এই প্রচ্ছদটিতে লেখক নিজের ব্যাক্তিগত মতামত প্রকাশ করেছেন এবং তা ওয়াইট সোওয়ান ফাউন্ডেশনের মতামত থেকে ভিন্ন হতে পারে।

Was this helpful for you?