We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.
ডঃ নন্দিনী মুরলী

অর্ধবিরাম

প্রিয়জন আত্মহত্যা করেছেন এই অভিজ্ঞতার পর জীবন কেমন হয়? - ডঃ নন্দিনী মুরলী

যিনি আত্মহননের পথ বেছে নিলেন, তাঁর মানসিক কষ্টের অবসান ঘটল। এবার আপনার নিজেকে সামলানোর পালা।

- হ্যান্ডবুক ফর সার্ভাইভার্স অফ সুইসাইড,জেফ্রি জ্যাকসন

গত বছর আমার স্বামীর আত্মহত্যার পর, ‘সার্ভাইভার্স অফ সুইসাইড’ কথাটার সাথে আমার প্রথমবার পরিচয় হয়। ততদিন পর্যন্ত আত্মহত্যা শব্দটা অন্যদের জন্যেদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছিলাম। এমনটা অন্যদের পরিবারে ঘটছে দেখেছি। নিজের পরিবারে এমন ঘটতে পারে সেটা কল্পনা করতে পারিনি। আত্মহত্যার রাস্তায় যারা হাঁটতেন, তারা আমার কাছে কয়েকটা নামহীন, পরিচয়হীন পরিসংখ্যান ছিলেন। কিন্তু সেই সব প্রচেষ্টা একদিন কঠিন বাস্তবের ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেলো।

‘সার্ভাইভার অফ সুইসাইড’ তাঁকেই বলা হয় যিনি নিজের ঘনিষ্ট কাউকে আত্মহত্যার কারণে হারিয়েছেন। সে যে কেউ হতে পারেন; পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী, এমনকি স্বাস্থ্য কর্মী (বিশেষত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ)।

জেফ্রি লিখেছেন, “আপনাকে যেই মুহূর্তে এই দুর্ভাগ্যের শিকার হবেন, সেই মুহূর্ত থেকে আপনার বেঁচে থাকা — বলা ভাল মানসিক সুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকা — নির্ভর করবে আপনি কত তাড়াতাড়ি আপনার পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারছেন তার ওপর। সবচয়ে কষ্টের ব্যাপার হল, যে এই ঘটনাটা মেনে নিয়ে এগিয়ে চলা।”

আমরা সবাই জানি যে আত্মহত্যা মানে হল নিজে নিজের মৃত্যুকে বেছে নেওয়া। কিন্তু বিখ্যাত সুইসাইডোলজিস্ট (আত্মহত্যাবিদ) এডউইন স্নেইডম্যান এটাকে এক তীব্র মানসিক কষ্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সম্ভবত এই কারণেই ৯০% আত্মহত্যার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকা থাকে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অফ সুইসাইডোলজির মতে, “আত্মহত্যার উদ্দেশ্য নিজের জীবনকে শেষ করা নয়, নিজের যন্ত্রণাকে শেষ করা।”

আত্মহত্যা সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলি আরও ভয়াবহ:

  • প্রতি বছর সমগ্র বিশ্বে ৮০০,০০০ ব্যাক্তি আত্মহত্যার কারণে মারা যান
  • প্রতি ৪০ সেকেন্ডে এই বিশ্বে কেউ না কেউ আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নেন
  • এবং প্রতি ৪১ সেকেন্ডে কাউকে না কাউকে সেই ঘটনার ধাক্কা সামলাতে হয়
  • গোটা জীবন জুড়েই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে
  • গোটা পৃথিবীতে, ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এটি মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ
  • ভারতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার প্রতি ১০০,০০ ব্যাক্তিতে ১৫.৭। রাজ্যভিত্তিক গড় হিসেব করলে সেই সংখ্যাটাই হল ১২.৯। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৫-১৭)

মৃত্যু ও প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা আমরা সবাই বুঝি। কিন্তু আত্মহত্যা কোনও সাধারণ মৃত্যু না। দুর্ঘটনা, খুন বা অকস্মাৎ শারীরিক সমস্যার কারনে মৃত্যুর মত এটা একধরণের পীড়াদায়ক বিচ্ছেদ। তা সত্বেও আত্মহত্যার পরে আশেপাশের লোকজনের মধ্যে সমান সমবেদনা ও সহমর্মিতা লক্ষ্য করা যায় না। এর ফলে সংশ্লিষ্ট পরিবারের লোকজন নিজেদের আরও একলা এবং একঘরে মনে করেন।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রি অ্যাসোসিয়েশনের মতে আত্মহত্যার কারণে প্ৰিয়জনের সাথে বিচ্ছেদ এমন এক “আকস্মিক বিপর্যয়” যার তুলনা নাৎসি বন্দী-শিবিরের অভিজ্ঞতার সাথে করা চলে। যিনি আত্মহত্যার আশ্রয় নিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানদেরও আত্মহত্যার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বেড়ে যায়।

যাঁরা নিজের ঘনিষ্ট কাউকে আত্মহত্যার কারণে হারিয়েছেন, তাঁদের খালি চোখে দেখা যায় না। এক রকম অদৃশ্য হয়ে একলা জীবন কাটাতে হয় এনাদের। অনেক সময় এঁদের নানারকমের অভিযোগ বা দোষারোপের সম্মুখীন হতে হয়। ফলে এই অবস্থায় তাঁদের পক্ষে এই সময়টা খুবই কষ্টের এবং যন্ত্রণার। এর সাথে যোগ হয়  আত্মহত্যার সাথে জড়িয়ে থাকা সামাজিক লজ্জা, গোপনীয়তা ও নিস্তব্ধতা। এর মূল কারণ হল যে আমরা কেউ আত্মহত্যাকে এক মনোরোগ সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে  না দেখে এক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি।

আন্ডারস্ট্যান্ডিং সার্ভাইভার্স অফ সুইসাইড লস্ বইটিতে ডেবোরাহ সেরানি লিখেছেন, “এটা খুবই আশ্চর্য্যের যে যখন কারও পরিবারের সদস্যের ক্যান্সার বা অ্যালঝাইমারের মতন অসুখ হয় তখন কাউকে কোনও দোষারোপ করতে দেখা যায় না। অথচ আত্মহত্যার বেলায় কেউ চারটে কথা শোনানোর সুযোগ ছাড়েন না।”

আত্মহত্যার সাথে লোকলজ্জার এক নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। নিজের ঘনিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় হারানোর পরে অধিকাংশ লোকেই তাই নিয়ে কথা বলা এড়িয়ে চলেন। মুখ ফুটে এই ঘটনাটা কাউকে বলতে আমাদের ভীষণ লজ্জা করে। তাই আমরা নিজেদের পছন্দমত একটা স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ বানিয়ে নিয়ে লোককে বলে বেড়াই। ‘কীভাবে মারা গেলেন উনি’-র উত্তরে হয়ত বললাম যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কারণ সেটা সামাজিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য কারণ।

আমরা আত্মহত্যাকে নিয়ে গর্ব করতে বলছি না, তবে এতে নিন্দা করারও কিছু নেই। যাঁরা আত্মহননের পথ বেছে নেন তাঁরা নিঃসন্দেহে কোনও নায়ক নন, কিন্তু তাঁরা কাপুরুষ বা অপরাধীও নন। এটি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সঙ্কট। এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য জড়িত বিষয় যা চিকিৎসার সাহায্যে এড়ানো সম্ভব।

আত্মহত্যা নিয়ে প্রকৃতরূপে ওয়াকিবহাল থাকলে আমাদের সমাজে এই বিষয়ে নিয়ে আরও আলোচনা হবে। এবং তাহলেই ক্রমশ ‘সার্ভাইভার্স অফ সুইসাইড’-দের পক্ষে জীবনে সুস্থভাবে এগিয়ে চলা সম্ভব হয়ে উঠবে।

ডঃ নন্দিনী মুরলী পেশাদারী ভাবে যোগাযোগ,লিঙ্গ এবং বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন সম্প্রতি নিজের প্রিয়জনকে আত্মহত্যায় হারানোর পর তিনি এম এস চেল্লামুথু ট্রাস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সাথে হাত মিলিয়ে স্পিক নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন,যার মূল উদ্দেশ্য হল আত্মহত্যা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা