ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

ইতিবাচক জীবনযাপন

আপনার হাস্যরস কোন ধরণের? - ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

আপনি কি এর মধ্যে প্রাণ খুলে হেসেছেন? এই সপ্তাহে কি কোনও মজার ঘটনা ঘটেছে আপনার সাথে? কোন ধরণের কৌতুক আপনাকে সব থেকে বেশি হাসিয়েছে? এই ধরণের প্রশ্ন এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে – কারণ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে আমাদের হাস্যরস বোধ আমাদের সুস্থতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

যদিও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের কথা ভাবলেই চোখের সামনে গোমড়া-মুখো ব্যক্তিদের চেহারা ভেসে উঠে, মনোবিজ্ঞানীরা এই বিষয় নিয়ে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উৎসাহিত। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত সিগ্মান্ড ফ্রয়েডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই ‘উইট অ্যান্ড ইট্‌স রিলেশন টু দা আনকনশ্যাস’ এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী অবদান। ফ্রয়েডের প্রভাবশালী সুত্রে মানুষ বেশিরভাগ সময় হাস্যরস ব্যবহার করেন পরোক্ষভাবে নিজেদের এমন অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য যা অচৈতন্য মন অন্যভাবে প্রকাশ করতে বাঁধা সৃষ্টি করে। একটি ভালো উদাহরণ হল ব্যঙ্গ, যার নির্ধারণ ফ্রয়েড সঠিকভাবে করেন প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষ রূপে। তাঁর মতে, কৌতুক আমাদের চেপে রাখা অনুভূতিগুলি (যেমন অভিযোগ বা হিংসা)-কে উপরে উঠে আসতে এবং ব্যক্ত করতে সাহায্য করে – এর ফলে আমাদের আন্তরিক টানাপড়েন কমে। আমরা সবাই এমন ব্যক্তিদের চিনি যারা অন্যদের হেয় করার জন্য বিদ্রূপ ব্যবহার করেন, নিজের অভিযোগের কথা সরাসরি না জানিয়ে।

এটা প্রচলিত তথ্য যে ফ্রয়েডের হাস্যরস-বোধ সাংঘাতিক ছিল, যদিও তাতে অমায়িক বা মৃদু ভাবের বদলে বিদ্রূপ থাকত বেশি। সাধারণ জীবনে গির্জার বুরূজ এবং স্মৃতিস্তম্ভের মতো যৌন চিহ্নের উপস্থিতির উপর অনেক লেখার প্রকাশ করার ফলে ফ্রয়েডকে একবার তাঁর নিজের চুরুট খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাঁর এক সহকর্মী জানিয়েছিলেন ফ্রয়েডের এই বিখ্যাত উক্তিঃ “কখনো-কখনো একটি চুরুট কেবলই চুরুট।”

ফ্রয়েড দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত ছিলেন অস্ট্রিয়ান চিকিৎসক আলফ্রেড এডলারের সাথে, যিনি ফ্রয়েডের মতে ব্যক্তিগত মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এই ক্ষেত্রে অনেক বিজ্ঞানী উৎসাহ দেখাচ্ছেন বিশেষত এশিয়াতে, এর কারণ হয়তো এই যে সুন্দর জীবনযাপনের জন্য একাকী ব্যক্তিবাদের উপর অস্বাভাবিক জোর না দিয়ে এডলার জোর দিয়েছিলেন সামাজিক বন্ধন এবং বন্ধুতের উপর। এডলার মানসিক সুস্থতার জন্য হাস্যরসের বোধের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন – আর বলেছিলেন যে নিজেকে খুব গম্ভীরভাবে না নেওয়াই শ্রেয়। একবার ডাক্তারদের এক ট্রেনিং সেমিনারে এডলার তাদের চুপিসারে বলেছিলেন “আমি অস্বীকার করতে পারব না যে আমি আমার রুগীদের সাথে ঠাট্টা করি, যদিও এমনটা আমি বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে করি, এবং মজার ছলে রোগের বিষয়ে তাদের বোঝাবার চেষ্টা করি। আপনাদের কাছে মজার গল্পের সম্ভার থাকা খুবই উপকারী। কখনো-কখনো মজার ছলে আপনি রুগীকে বোঝাতে পারবেন যে তার বাতিক কতটা অবান্তর।”

এডলারের অন্তর্দৃষ্টির মতে, আমার অহমিকা আমাদের ভেতরে দেওয়াল তুলে দেয় যা ব্যক্তিগত পরিবর্তনের পথে বাঁধা সৃষ্টি করে – বিশেষত তখন যখন আমাদের মনে হয় যে আমাদের ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে একটি মজার গল্পের পক্ষে সম্ভব আমাদের সতর্ক অহমিকার পাশ কাটিয়ে যাওয়া – এবং ব্যক্তিগত উন্নতির নতুন ধরণের সঞ্চার ঘটানোর। এডলার শিখিয়েছেন যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের উচিৎ সবসময় কাউন্সেলিং-এর সময় হাস্যরসের সাহায্য নেওয়ার। এতে মানসিক যন্ত্রণার সাথে লড়াই করছেন যে রুগীরা তাদের মধ্যে সেই সময় যে ধরণের মানসিক বিপর্যয় বা অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশের ভাব থাকে, সেটার সাথে মোকাবিলা করতে হাস্যরস সাহায্য করে। তাঁর উষ্ণ, মাটির মানুষের মতো ব্যবহার এই বিষয়ে খুবই আশ্বাসপূর্ণ ছিল।

এডলারের বিখ্যাত শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন এব্রাহ্যাম মাস্‌লো, যিনি হিউমানিস্টিক সাইকোলজি বা মানবতাবাদী মনোবিজ্ঞানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং এখনকার প্রেরণা তত্ত্বের গুরু। উনি চূড়ান্ত ভাবে সফল এবং সৃজনশীল মানুষদের মধ্যে হাস্যরস নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন – যাকে উনি আখ্যা দিয়েছিলেন আত্ম প্রকৃতকরণ।মাস্‌লো দেখেছিলেন যে এমন ব্যক্তিরা কৌতুককে উপভোগ করেন – কিন্তু শুধু কিছু প্রকারের। মানে, জীবনের অদ্ভুত বিষয়গুলিকে তারা উপভোগ করেন এবং অতি সহজে হাসি-ঠাট্টা করতে পারেন, এবং নিজেদের দুর্বলতা নিয়েও মজা করতে পারেন। আত্ম প্রকৃতকরণকারীরা এমন কৌতুক করেন না বা শুনতে রাজী হন না, যা অপমানজনক, বিদ্রূপ বা নিষ্ঠুর, মানে অন্যদের দুর্ভাগ্যের উপর হাসতে তারা রাজী নন।

ইদানিং, ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান হাস্যরসকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারার সাথে ব্যক্তিগত ভালথাকার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এই বিষয়ে যাদের দক্ষতা রয়েছে তাঁদের মধ্যে একজন হলেন কানাডার পশ্চিম অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ রড মার্‌টিন। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাঃ মার্‌টিন এবং তাঁর সহকর্মীরা হাস্যরসের বিভিন্ন ধরণ (আহ্বান পর্যায়) নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং প্রচুর তথ্য যোগাড় করেছেন এই বিষয়ে যে প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হাস্যরসের নানা ভূমিকা নিয়ে। মার্‌টিন চার ধরণের হাস্যরসের কথা জানিয়েছেন –

১। অনুমোদনকারিঃ একটি কার্যকর "সামাজিক লুব্রিকেন্ট (তেল জাতীয় দ্রব্য)" হিসাবে হাস্যরসকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেমন পার্টি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সমাবেশে পরিবেশের উন্নতি করা;

২। আত্ম-উন্নতিঃ যা মানসিক চাপের সঙ্গে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য হাস্যরসের উপর নির্ভর করে, এবং স্থিতিস্থাপকতা একটি ধরণ;

৩। আক্রমনাত্মকঃ যার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা অধিকারের অনুভূতি বজায় রাখার জন্য তিক্ততা এবং অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল শব্দসমষ্টি ব্যবহার করা;

৪।আত্ম-পরাজয়ঃ কৌতুকের আড়ালে নিজেকে ছোট করা, এবং যা কয়েক দশক ধরে কৌতুক নামে চলে আসছে।

যেমন হয়তো আপনি বুঝতে পেরেছেন, প্রথম দুটি ধরণের সাথে জড়িয়ে থাকে সুস্থ মানসিক এবং সামাজিক বোধ। অন্যদিকে বাকি দুটোর সাথে যুক্ত থাকে অসুস্থ মানসিকতা – যেমন বদরাগী মেজাজ, নিজেকে অযোগ্য ভাবা, সামাজিকতা এড়িয়ে চলা, এবং অবসাদ। প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে প্রেম সম্পর্কে সুখের সাথে হাস্যরসের যোগাযোগ রয়েছে। যেমন, ডেট করছেন এমন যুটিদের একটি পর্যবেক্ষণ পরীক্ষায় পশ্চিম অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ লর্‌ণ ক্যাম্পবেল এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখেন যে প্রেমিক জুটিদের মধ্যে বেশিমাত্রায় অনুমোদনকারী হাস্যরস এবং কম মাত্রায় আক্রমণাত্মক হাস্যরস তাদের মাঝের সংঘাত কম করতে সাহায্য করে।

আপনি কি আপনার নিয়মিত হাস্যরসের ধরণ পাল্টাতে পারবেন যাতে তা আরও বেশি স্বাস্থ্যকর এবং পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠে? যদিও এই প্রশ্নের উত্তর এখনো বিপুলভাবে পাওয়া যায়নি, মনে হয় যে উত্তরটি অবশ্যই হ্যাঁ হবে। একটি পদ্ধতি যার সুপারিশ আমি করতে পারি তা হল এমন একজনের কথা ভাবা যার মধ্যে কঠিন পরিস্থিতিতে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এই ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত এমন একটি ঘটনার কথা ভাবুন যখন ব্যক্তি এই স্বভাবের পরিচয় দিয়েছেন। এর পর নিজেকে এমন একটি পরিস্থিতিতে ভাবুনঃ আপনি কি এই ব্যক্তির মতো হতে পারবেন? যদি তাই হয়, এমন একটি পরিস্থিতির কথা ভাবুন যখন চাপ অনুভব করা সত্ত্বেও আপনি এর মধ্যে হাসির উপাদান খুঁজে পেয়েছিলেন – আপনার কৌতুক বা রসিকতা কী নিয়ে ছিল?

মিশ্র সাংস্কৃতিক ধারণাগুলির বিষয়ে কী ভাবেন – যেমন জার্মানরা গোমড়া বা ইংরেজদের হাস্যরস শুকনো ধরণের? সিনেমা জগতের কর্তারা ভালভাবেই জানেন যে মারপিটের, রোমাঞ্চকর বা প্রেমের গল্পের তুলনায় কৌতুকপ্রদ সিনেমাকে সফলভাবে বাজারে ছাড়া বেশ কষ্টকর কারণ হাস্যরসের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতার একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে, যা বুনিয়াদী নিষেধাজ্ঞা এবং লালিত মূল্যবোধের মেলবন্ধন।

যে কোনও ক্ষেত্রে, হাস্যরস মোটেই হাসির বিষয় নয়।

বিশ্বব্যাপী ওষুধ নির্মাণকারী কোম্পানিগুলি এর সাথে নিশ্চিত লড়াই করবে কিন্তু এমন একটি দিন আসতেই পারে যখন আপনার ডাক্তার পরামর্শ দেবেন, “দুবার পেট ভরে হাসবেন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আর সকালে আমাকে ফোন করবেন।”