We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

ড্রাগ বা মাদক দ্রব্যে আসক্তিঃ ওষুধ ও থেরাপি কীভাবে সাহায্য করে?

অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ড্রাগ বা মাদক দ্রব্যকে 'না' বলাটাই আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। যদিও ড্রাগে আসক্ত যে কোনও মানুষেরই চিকিৎসা ও সহায়তা প্রয়োজন।

ড্রাগের আসক্তি কী?  

ড্রাগের প্রতি আসক্তি বা টান একটা বিশেষ অবস্থাকে চিহ্নিত করে। এই অবস্থায় একজন মানুষের মধ্যে নিয়মিত একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে ড্রাগ নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায় এবং নিজের স্বাভাবিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সে ড্রাগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যদি কেউ ড্রাগ নিতে অভ্যস্ত হয় তাহলে এটা ছাড়া বাঁচতে পারবে না ভেবে সর্বক্ষণ এর জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। ড্রাগের আসক্তি শারীরিক, মানসিক ও অপরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে। আসক্ত ব্যক্তি সহজে এই অভ্যাস কাটিয়ে উঠতে পারে না, মন থেকে চাইলেও নেশা ছেড়ে বেরোতে পারে না।  

অনেকের ধারণা যে, ড্রাগ একটা কড়া ধাতের মেজাজ পাল্টে দেওয়ার বস্তু। যে কোনও রাসায়নিক দ্রব্য যা মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়াকে পালটে দিতে পারে তাকেই ড্রাগ বলে। মস্তিষ্কে যে রাসায়নগুলো স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়, ড্রাগ মস্তিষ্কে গিয়ে সেগুলিকে নিস্ক্রিয় বা অকেজো করে দেয়। সেই হিসেবে কফি, অ্যালকোহল, তামাক, শুধুমাত্র ডাক্তারের পরামর্শে বিক্রি হওয়া কিছু ওষুধ যাদের প্রেসক্রিপশন ড্রাগস্ বলা হয় এবং আনন্দবর্ধক সব বস্তুকেই ড্রাগ বলা চলে।

কীভাবে ড্রাগে আসক্তি  তৈরি হয়?

মদ বা অ্যালকোহলের মতোই মানুষ প্রথমে কৌতূহলে, অন্যকে দেখে, শিক্ষা বা ক্রীড়াক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার জন্য অথবা মানসিক অস্বস্তি বা সমস্যা কাটাতেই ড্রাগ নিতে শুরু করে। ক্রমশ এর প্রভাবে মস্তিষ্কের ক্রিয়ায় পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে আসক্ত ব্যক্তি ড্রাগের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং গ্রহণের মাত্রা ছাড়ায়। তাঁরা ড্রাগ ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা ও ক্ষমতা দুটই হারিয়ে ফেলেন। চাইলেও এর হাত থেকে নিস্তার পান না।

অধিকাংশ মানুষই মনে করেন, যারা ড্রাগ সেবন করেন, তাঁরা মানসিকভাবে দুর্বল। সাধারণ ধারণা যে, আসক্ত ব্যক্তি নিজের অভ্যাস পরিবর্তনের বিষয়ে অত্যন্ত অলস, ইচ্ছা করলে তাঁরা ড্রাগকে 'না' বলতেই পারে। বাস্তবে অ্যাডিকশন পরিবেশ ও মূলগত সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করে। যেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ। 'না' বলাটা ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব সামান্য বিষয়। নেশা সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হলে আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও সহায়তা পাওয়া জরুরি।  

ড্রাগ নেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। ধুমপান, নাক দিয়ে টানা, ইঞ্জেকশন, চিবিয়ে খাওয়া বা পানীয়ের সাহায্যে নেওয়া যায়। ভারতে প্রচলিত নেশার মধ্যে রয়েছে মারিজুয়ানা, তামাক এবং অন্যান্য মাদকের প্রতি আসক্তি।

মানুষের মস্তিষ্কে ড্রাগ কীভাবে ক্রিয়া করে?

মানব মস্তিষ্কে ড্রাগের লক্ষণীয় ক্রিয়া হল ডোপামিন নিস্কাশন। ডোপামিন একটি নিউরোট্রান্সমিটার। ড্রাগ ব্রেনের বার্তাবহ ব্যবস্থার উপর বেশি রকম ক্রিয়াশীল হয়। এর ফলে ডোপামিন ক্ষরণ হতে থাকে এবং মস্তিষ্কে এক ধরনের আরাম অনুভূত হয়। মস্তিষ্ক সেই অনভূতি বারবার চাইতে শুরু করে। এভাবেই ড্রাগের প্রতি টান তৈরি হয়। নিয়মিত সেবনের ফলে মস্তিষ্কে সচেতন অবস্থার ঘাটতি দেখা দেয়। ড্রাগের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে মস্তিষ্কে আগেকার স্বাভাবিক অবস্থার অনুভূতি পাওয়ার জন্য। পরোক্ষে মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় আরও ড্রাগের চাহিদায়, যা মানুষের কোনও প্রকৃত ধারণাতে আসে না।  

দীর্ঘদিন ধরে ড্রাগের নেশা ব্রেনের কগনিটিভ ফাংশন বা পরিস্থিতি অনুযায়ী চিন্তা করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। নিয়মিত ড্রাগ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্রেনের যে অংশগুলি শিক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে সেইগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তি ডিপ্রেশন ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

অন্যান্য সমস্যাগুলি হল - কাঁপুনি থামতে না চাওয়া, খিদে ও ঘুম কমে যাওয়া, ওজন কমা-বাড়া, অসামাজিক হয়ে পড়া, অল্পে রেগে যাওয়া, নার্ভাস বা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠা, উদ্বেগ ও সন্দেহবাতিক বেড়ে যাওয়া।

ড্রাগ অ্যাডিকশন চিহ্নিতকরণ -

কয়েকটি সূত্র থেকে যে কোনও মানুষের ড্রাগ নেওয়ার অভ্যাস আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে কি না তা বোঝা যায়।

  • ড্রাগ নেওয়ার পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে কি না।
  • উইথড্রয়াল সিম্পটম, বা ড্রাগের প্রভাব শেষ হয়ে গেলে যে শারীরিক লক্ষণগুলো দেখা যায়, যেমন কাঁপুনি, খিঁচুনি ইত্যাদি প্রথম ডোজ নেওয়ার আগে বেড়ে যায়।  
  • নিজের জন্য একটা ড্রাগ-মুক্ত দিনও কল্পনা করতে না পারা।
  • পরবর্তী ডোজটি নেওয়ার জন্য নানারকম বাহানা তৈরি হয়।
  • দৈনিক কাজকর্ম অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ ও সহনশীল হয়ে ওঠে, যদি দিনের শুরুতেই কিছুটা ড্রাগ নেওয়া হয়।
  • ক্রমশ পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও অন্যান্য দায়িত্ব পালনে অনীহা আসে।
  • সব সময় অন্যদের থেকে ড্রাগের অভ্যাস আড়াল করার চেষ্টা থাকে। এর পরিমাণ ও টানের ব্যাপার অস্বীকার করতে হয়।
  • ড্রাগের অভ্যাসের জন্য নিজেকে অপরাধী ও লজ্জিত মনে হয়।
  • মনে হয় ছেড়ে দেব, কিন্তু কোনওভাবেই হয়ে ওঠে না।

উপরের বিষয়গুলি যখন ড্রাগ ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যাবে, তখনই তার বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। সিএজিই (CAGE) বা "কেজ" টেস্টের আধুনিক ভার্সান মানুষ ড্রাগ অ্যাডিকটেড কি না জানতে সাহায্য করে।   

  • কখনও মনে হয়েছে কি, ড্রাগ বা মদ্যপানের ব্যবহার কমিয়ে ফেলা উচিত?
  • লোকজন কি মদ্যপান বা ড্রাগ অ্যাডিকশন নিয়ে বিরক্ত বা সমালোচনা করছে?
  • মদ্যপান বা ড্রাগ আসক্তিতে নিজেকে অপরাধী মনে হয়, বিরক্তি আসে?
  • হ্যাংওভার কাটাতে বা নার্ভকে চাঙ্গা রাখতে গিয়ে কি দিনের প্রথম কাজ হিসেবে ড্রাগ বা মদ্যপান জরুরি বলে মনে হয়? 

যদি দুটি বা তার বেশি প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে মানতেই হবে আসক্তি রয়েছে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

যদি কোনও প্রিয়জন ড্রাগে আসক্ত হয়, তবে এই শারীরিক ও ব্যবহারিক লক্ষণগুলি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ড্রাগ অ্যাডিকশনের চিহ্নিতকরণঃ

এমন লক্ষণ রয়েছে, যেগুলি থেকে ড্রাগ আসক্তির পেশাদারি চিকিৎসা করা সম্ভব। নিজে বা নিকটজনের মধ্যে কেউ যদি ড্রাগের নেশায় আচ্ছন্ন হয়, তবে কোনও মনোচিকিৎসক বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যিনি বা যাঁরা সমস্যাটি বিচার করে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়ার জন্য সঠিক হদিশ দেবেন। বিশেষজ্ঞ সুনির্দিষ্টভাবে পরীক্ষা করে সমস্যা কতটা গুরুতর সেই বিষয়ে নিশ্চিত হবেন এবং নিয়মিত শারীরিক চিকিৎসার মাধ্যমে বিষয়টির জটিলতা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেবেন।

ড্রাগ আসক্তির চিকিৎসাঃ -  

ড্রাগের নেশার চিকিৎসা চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভরশীলঃ -

১) রোগীর শরীর থেকে ড্রাগের কারণে জমা হওয়া টক্সিন বের করা।

২) রোগীকে নেশার টান এবং উইথড্রয়াল সিম্পটম সামলানোতে সাহায্য করা।

৩) আসক্তিজনিত যে কোনও মানসিক ও আবেগজড়িত বিষয়ে রোগীকে সামলানোর জন্য সহায়তা দান।

৪) নেশার চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে এক নতুন জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে সাহায্য করা।  

ড্রাগে আসক্তির চিকিৎসা অন্যান্য নেশার আসক্তির মতোই, ওষুধ, ব্যক্তিগত ও দলবদ্ধ বা গ্রুপ থেরাপির সমন্বয়ে করা উচিত। চিকিৎসার ধারার প্রতিটি ধাপই রোগীর প্রয়োজন অনুসারে মেডিক্যাল হিস্ট্রি পর্যবেক্ষণ করেই তৈরি করা প্রয়োজন। দেখা দরকার ঠিক কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার হবে এবং রোগীর অবস্থা কতটা জটিল। চিকিৎসার লক্ষ্য থাকবে রোগীর স্বাভাবিক দক্ষতা বাড়ানো, যা তাকে নেশা থেকে দূরে রাখতে বা আবার নেশার কবলে পড়া থেকে আটকাতে পারে। অধিকাংশ রোগীর অল্প সময়ের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এরপর রিহ্যাবিলিটেশন এবং ফলো আপ সেশনের মাধ্যমে নেশামুক্ত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করে।

চিকিৎসা পদ্ধতির এক তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হল আবার নেশার কবলে পড়া রুখে দেওয়া। একজন ড্রাগ অ্যাডিক্টের চিকিৎসা করে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর যখন সে নেশা ছাড়া কিছুদিন থাকে, তখনই আবার নেশাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। যাকে রিল্যাপ্‌স বলা হয়। এর সঠিক মোকাবিলা করতে হলে প্রাথমিক চিকিৎসার সঙ্গেই সমানতালে নজরদারি প্রয়োজন। যাতে রোগী নিজেই নেশার টান এড়িয়ে যেতে পারে।  

 

দ্রষ্টব্যঃ অনেকেই মনে করেন, ড্রাগকে 'না' বলাটাই আসক্তি কাটানোর পথ। অ্যাডিকশন বা আসক্তি শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করে না, নেশাগ্রস্ত মানুষের মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অংশে ড্রাগ বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটায়। যে কারণে 'না' বলাটা বাস্তবিক অসম্ভব। তাঁরা 'না' বললেও ভয়মিশ্রিত ব্যাকুলতা বা টান এবং নানা রকম উইথড্রয়াল সিম্পটম তাদের আবার ড্রাগ নিতে বাধ্য করে। নেশা ছাড়তে ওই মানুষটির যথেষ্ট সহায়তা দরকার। সে জন্যই বলা হয় ড্রাগ অ্যাডিকশনের মোকাবিলায় সক্রিয় হতে গেলে মেডিকেশন ও থেরাপির মিলিত প্রয়াস জরুরি।              



প্রস্তাবিত