We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

শৈশবের নির্যাতনকে ঘিরে অপরাধবোধ থেকে মুক্তি কীভাবে আমাকে জীবনের ছন্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে

রাগি।

বদমেজাজি।

তাড়াতাড়ি রাগে ফেটে পড়া।

অল্পতেই মেজাজ হারানো।

পরিবারের লোকজন, বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীরা আমার আচরণের মধ্যে এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করত। আমার রাগ থাকা সত্ত্বেও, সৌভাগ্যবশত  ভদ্র, মিশুকে স্বভাবের জন্য আমি আমার সব বন্ধুবান্ধবের থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হয়ে যাইনি। কিন্তু যখন আমি কুড়ি বছর পার করতে চলেছি তখন আমি বিশেষ বাচ্চাদের জন্য গড়ে ওঠা একটা স্কুলে কাজ পেয়েছিলাম এবং বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতেও শুরু করেছিলাম। তখনও কিন্তু আমার মধ্যে গড়ে ওঠা অপরাধবোধকে আমি মন থেকে দূর করতে পারিনি। তখন থেকেই নিজের মধ্যে জন্মানো রাগ বা ক্রোধগুলোর কারণ নিয়ে আমার মনে গভীর চিন্তাভাবনা দেখা দিয়েছিল। সেই  সময়ে আমার মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে ছোটবেলার যৌন নির্যাতন এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা অমীমাংসিত সমস্যার জন্যই আমার আচরণের মধ্যে রাগ, ক্রোধ প্রভৃতি জন্মেছে। তখনও আমার মন থেকে ছোটবেলার সেই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ধুয়ে-মুছে যায়নি, তা তখনও আমার মনে টাটকাই ছিল। কিন্তু আমি সেকথা কখনোই কারোর কাছে বলতে পারিনি এবং আমি এটাও বুঝেছিলাম যে আমি যা কিছুই করেছিলাম তার উপর ওই নির্যাতনের
প্রভাব পড়েছিল।

আমার এই উপলব্ধিই আমায় একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করেছিল। যখন আমার মধ্যে মানসিক অবসাদের সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে তখন আমি এমন একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য পেয়েছিলাম যিনি আমায় আমার নির্যাতনের সমস্যার মোকাবিলা কীভাবে করব তার কোনও পথ বা রাস্তা দেখাতে পারেননি। অর্থাৎ, তখন থেকেই আমি আমার উপর পড়া সেই নির্যাতনের প্রভাবগুলো লক্ষ্য করতে শুরু করেছিলাম। শুধু তাই নয়, আমার মধ্যে থাকা রাগের সমস্যা, যা গৌন হলেও অমীমাংসিত ছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কাউকে বিশ্বাস  না করার একটা গুরুতর সমস্যা। তবে এর সঙ্গে দৈহিক ভাবমূর্তিজনিত সমস্যার কোনও যোগ নেই। একটা আত্মবিশ্বাসের মুখোশ পড়ে আমি অন্যদের কাছ থেকে এই সমস্যাগুলো লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম ঠিকই, তবু ভিতরে ভিতরে আমি খুবই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম, নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম, সমস্যাগুলোর পিছনে কী কারণ রয়েছে, তা পুরোপুরি বুঝতেও পারতাম না। সেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু বিষয় হয়তো বোঝা গেলেও, আমার শরীর ও মনের উপর নির্যাতনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যে যুক্ত রয়েছে, সেকথা উপলব্ধি করা মোটেই আমার পক্ষে সহজ ছিল না বা তার কোনও চটজলদি উপায়ও আমার জানা ছিল না।  

মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যখন আমার আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই আমার মনে হত যে কীভাবে আমার এই সমস্যার সঠিক সমাধান সম্ভব, যাতে আমি সুফল পাব, সেই সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই ওই বিশেষজ্ঞের। সেই সময়ে আমি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে রাহি (RAHI) ফাউন্ডেশনের নাম শুনি। এই প্রতিষ্ঠানটি সেইসব মহিলাদের জন্য কাজ করে যারা তাদের শৈশবে যৌন নির্যাতন এবং ইনসেসট্‌ (অতি নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে যাদের যৌন সঙ্গম হয়েছে)-এর শিকার হয়েছে। সেকথা জানতে পেরে আমি রাহি ফাউন্ডেশনে যাই  এবং সেখানে আমার চিকিৎসাও শুরু হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতির দিক থেকে দেখতে গেলে এখানকার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মন থেকে তার শৈশবে ঘটা যৌন নির্যাতনের প্রভাব ও বিপর্যয়ের মনোভাব  দূর করতে  সাহায্য করা, যার সুফল বাস্তব ক্ষেত্রে মানুষ হাতেনাতে টের পায়। আমি উপলব্ধি করতাম যে শৈশবের যৌন নির্যাতনের ফলে গড়ে ওঠা অপরাধবোধ সবসময়ে আমার আবেগ-অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অর্থাৎ আমার অনুভূতিতে সেই অপরাধবোধই একমাত্র অগ্রাধিকার পাচ্ছে । তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত এই ভাবনা  দূর করার কোনও প্রতিকার আমার জানা ছিল না। আসলে আমার মনে হত যে সেই অপরাধটা এমন ছিল যা আমি ঘটতে দিয়েছি, আমিও সেই অপরাধের অংশ হয়েছি, আবার যদি আমি চাইতাম তাহলে সেই অপরাধ দমন বা বন্ধ করাও যেত।

কিন্তু রাহি ফাউন্ডেশনের চিকিৎসা আমার মনের সেই অপরাধ বোধ ও লজ্জা দূর করতে সক্ষম হয় এবং আমার সঙ্গে যে এই যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য কাজটা করেছিল সেই যে আসল অপরাধী সেকথা আমায় বোঝাতে সাহায্য করেছিল।

থেরাপি আমায় এটাও বুঝিয়েছিল যে একটা আট বছরের বাচ্চার পক্ষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বা ভালো-মন্দ বিচার করার কোনও ক্ষমতাই থাকে না এবং তার জীবনে কী ঘটনা ঘটছে সে সম্পর্কেও ওই বাচ্চার কোনও স্পষ্ট ধারণা থাকে না। ছোটবেলায় আমায় যে যৌন নির্যাতন করেছিল সে ছিল আমার খুবই পরিচিত লোক, তাকে আমি বিশ্বাস করতাম, তাই তার কুকর্মটিকে বাধা দেওয়ার বা না বলার মতো কোনও শক্তিই আমার সেদিন ছিল না, এমনকী যদি শক্তি থাকতও তা-ও আমি তাকে না বলতে পারতাম না- এই বিষয়টাও আমায় উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল রাহি ফাউন্ডেশনের থেরাপি। এই চিকিৎসাই যৌন নিগ্রহ সংক্রান্ত আমার মনের অপরাধবোধ ও লজ্জা দূর করতে সক্ষম হয় এবং আমার সঙ্গে যে এই জঘন্য কাজটা করেছিল সেই যে আসল অপরাধী সেকথা উপলব্ধি করতে আমায় সঠিক রাস্তা দেখিয়েছিল।

ছেলেবেলায় ঘটা যৌন নির্যাতনের ফলে আমার চুপ হয়ে যাওয়া, এবং তারপর  থেকে শুরু করে সমস্যাটিকে নিয়ে অনেক কাটাছেঁড়া করা পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে আমার জীবনটা তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল, এইসময়ে প্রবল মানসিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি  হয়েছিলাম আমি। আমার জীবনে অনেক মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক থাকলেও ছোটবেলা থেকেই আবেগ-অনুভূতির দিক থেকে আমি ভিতরে ভিতরে একদম ক্ষয়ে গিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে থেরাপির মাধ্যমেই আমি আমার মনের অপরাধবোধ দূর করার প্রক্রিয়া শিখেছিলাম, নির্যাতনের প্রভাবগুলোকে উপলব্ধি বা বুঝতে শিখেছিলাম। এর ফলে আমার জীবনের সমগ্র ধ্যানধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছিল। আমার রেগে যাওয়ার সমস্যাটার আর প্রায় কোনও অস্তিত্বই ছিল না; আমি ক্রমশ আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিলাম।

এখন যখন আমি আমার শৈশবে ঘটা নির্যাতনের ঘটনাটিকে ফিরে দেখি তখন তাকে আমার একপ্রকার দুর্ভাগ্যজনিত ঘটনা বলেই মনে হয়। কিন্তু আমায় আজ  এই ভাবনাটি আর আহত, রক্তাক্ত করতে পারে না। সেই শক্তি আজ আর তার  নেই। যৌন নির্যাতন আমার জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল ঠিকই, কিন্তু এখন আমার জীবনের মূল ছন্দটা আমি আবার ফিরে পেয়েছি। অর্থাৎ জীবনটা ঠিক কোন দিশা মেনে এগিয়ে যাবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি এখন আমার হাতের মুঠোর মধ্যেই রয়েছে। নিজের মনের অপরাধবোধ এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কাছে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একদিন দুর্বল বা নষ্ট হয়ে গেলেও, পরবর্তীকালে আমি সেরা সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। আর সেই সিদ্ধান্তটি হল নীরবতা ভেঙে নিজের সমস্যা সমাধানের মুখোমুখি হওয়া। এটা শুধু আমায় সমস্যা সমাধানের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠতেই সাহায্য করেনি, সেই সঙ্গে আমার মানসিক, অনুভূতিগত ও দৈহিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতেও সহায়তা করেছিল।

প্রবন্ধটি লিখেছেন রিনা ডি'সুজা নামক একজন অ্যাক্টিভিস্ট (সক্রিয় কর্মী)। ইনি মানবাধিকার, পরিবেশগত এবং বন্যপ্রাণীদের অধিকার সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। সম্প্রতি রিনা রাহি ফাউন্ডেশনের (RAHI Foundation) সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হল  ইনসেসট্‌ (অতি নিকট আত্মীয়ের মধ্যে যৌন সঙ্গম) এবং  শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ করা।