We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

যৌন এবং অন্যান্য সব হিংসাই মানুষের ক্ষমতার দ্বারা চালিত

সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষিত সমাজে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে যৌন হেনস্থাকারীদের নামের অসংগঠিত তালিকা তৈরি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় ছাত্রসমাজ সেটাকে বেনামীভাবে প্রকাশিত করায়। আমার সামাজিক বৃত্তের মধ্যে থাকা অনেক পুরুষ, যেমন- অধ্যাপক, আইনজীবী, পেশাদার এবং বাবারাও যৌন হেনস্থার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, যে তাঁদের মান-সম্মান অটুট থাকবে কি না এবং তারা এখন ছাত্রী এবং মহিলা কর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক আদান-প্রদানের সময়ে খুব সতর্ক হয়ে উঠেছে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে সতর্কতা সংক্রান্ত যে নতুন ধরনের কথা আমি বললাম, তা আমাকেও সুবিধা ও শক্তির মধ্যেকার একটা মৌলিক পার্থক্য, যেগুলোর পিছনে আমি প্রায়শই ধাওয়া করে থাকি, সে সম্পর্কেও সজাগ হতে বাধ্য করেছে। এক্ষেত্রে মহিলারা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে অত্যন্ত অল্পবয়স থেকেই সদাসর্তক দৃষ্টি  দিয়েছে এবং তার প্রতি যত্নশীলও হয়েছে। এধরনের সতর্কতা তাদের বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথেই হোক বা তাদের পোশাক-আশাকের ধরনের উপর অথবা বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে তাদের পারস্পরিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।   আমার পুরুষ বন্ধু, সহকর্মীদের মধ্যে এধরনের সতর্কতাজনিত নতুন অভিজ্ঞতা  তখনই হচ্ছে যখন কোনও মহিলার সঙ্গে তাদের কথপোকথন চলছে। তবে পুরুষরা যখন তাদের বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তখন তাদের মধ্যে কোনওরকম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সতর্কতা ও যত্নশীলতার বোধ তেমনভাবে উপলব্ধ হয় না, যা প্রথাগতভাবে একজন মহিলার মধ্যে হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন পুরুষকে কখনোই তার অভিভাবক, শিক্ষক বা বড়দের কাছ থেকে বেশি করে সতর্ক থাকার কথা শুনতে হয় না। বিশেষ করে যখন তাদের কাঁধে শক্তিশালী নেতৃত্বদানের মতো দায়িত্ব এসে পড়ে বা এমন কোনও বিশেষ অবস্থানে তারা থাকে যার প্রভাব সমাজে ক্ষতিকারক এবং ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, তখনও তাদের মধ্যে সজাগ থাকার মনোভাব তেমন দেখা যায় না। এটাই হল সুবিধা ও শক্তির একপ্রকার স্থায়ী ধারণা, যেখানে কারা সুবিধা ভোগ করছে তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় না এবং সুবিধার বৈশিষ্ট্যগুলোও আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।  এমনকী, শুধুমাত্র সমাজের নিয়ন্ত্রণকারী শ্রেণির অংশ হওয়ার জন্য কিছু মানুষের হাতে বিশেষ সুবিধা কুক্ষিগত হয়। সেক্ষেত্রে কখনোই বিচার করা হয় না যে সেই সুবিধার ফল ভোগ করার প্রয়োজন তাদের আদৌ রয়েছে না নেই।

একজন মানুষের নিজের সুবিধা এবং শক্তির প্রসার ও কীভাবে তার প্রভাব একজন কম সুবিধাভোগী, শক্তিশালী মানুষের উপর পড়ে তা বোঝাতে গিয়ে সুবিধা ও শক্তিকে ইচ্ছাধীন, প্রতিরোধহীন আত্ম-প্রতিফলনকারী, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সচেতনতা  হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় যৌন হিংসা ও হেনস্থার সমস্যাটিকে এই চিন্তানভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করার প্রবণতা গড়ে উঠেছে। মনস্তত্ত্ববিদ, মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞ, আক্রান্ত মানুষের আইনজীবী এবং শিক্ষাবিদদের কাছেও হিংসার বিষয়টা এভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেসব হিংসা সংক্রান্ত পরিস্থিতি মানসিক স্বাস্থ্যের আওতায় পড়ে সেখানে গবেষণা করে দেখা গিয়েছে যে নির্যাতন এবং হিংসা পুরোপুরি শক্তি বা ক্ষমতা-নির্ভর চলমান  একপ্রকার ঘটনা। আর এধরনের নির্যাতন বা হিংসার হুমকি স্বামী-স্ত্রী, অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ কর্মী, অধ্যাপক-ছাত্রছাত্রী, পূর্ণবয়স্ক-শিশু প্রভৃতি সম্পর্কের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

ক্ষমতা প্রদর্শনের মনোভাবই সাধারণত নির্যাতনমূলক আচরণের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, সেই সঙ্গে হিংসা বা হেনস্থা, যা বারবার ঘটতে থাকে তার  প্রাথমিক কারণ বলেও চিহ্নিত হয়। ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের মাপকাঠিতে নির্যাতন  প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্ষমতা-নির্ভর হিংসার মানসিকতাই প্রাধান্য পাচ্ছে।  ক্ষমতানির্ভর ব্যক্তিগত হিংসার মধ্যে রয়েছে গার্হস্থ্য এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেকার হিংসা, সদম্ভ মনোভাব, মানসিক নির্যাতন, যৌন হেনস্থা, বয়স্ক নির্যাতন, যৌনধর্মী পাচারকার্য, হিংসার শিকার হওয়া মানুষটিকে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং উদ্ধত ও লাগামহীন আচরণ প্রভৃতি। ড্রাগের প্রতি আসক্তি এবং মদ্যপান মানুষকে হিংসামূলক আচরণ করতে বাধ্য করে থাকে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে ধর্ষণের প্রাথমিক লক্ষ্য যৌনতা নয়, কিন্তু সেখানে যৌনতাকে বিচ্ছিন্নতাজনিত যন্ত্রণা বা বেদনা, প্রাধান্য বিস্তারকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী বিষয় এবং শাসানি বা হুমকির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ঝুঁকির দিক বা বিষয়

আমাদের চারপাশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যেসব হিংসার বাতাবরণ তৈরি হয় সেখানে কতগুলো চিহ্নিত ঝুঁকির দিক রয়েছে, যার রূপ খুবই ভয়ংকর হয়ে থাকে। এই ঝুঁকির উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক ও ব্যক্তিগত স্তরে লিঙ্গ বৈষম্য। এই সামাজিক লিঙ্গ বৈষম্যের দরুণ সমাজে নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ের মধ্যে হিংসার জন্ম হয়। এর ফলে সামাজিক বিকাশ বন্ধ হয়ে যায়, পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, হিংসা দমনের জন্য কৌশলের অভাব এবং আর্থ-সামাজিক চাপ বৃদ্ধি পায়। অধিকাংশ সমস্যা যদি তাড়াতাড়ি চিহ্নিত করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে সৃষ্টি হওয়া হিংসা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

ক্ষমতা-নির্ভর বা শক্তি-নির্ভর হিংসা- এই শব্দবন্ধটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এহেন হিংসা শুধু মহিলা এবং মেয়েদের উপরেই সংঘটিত হয়ে থাকে। এছাড়া  নির্যাতনের সম্পূর্ন রূপ সম্পর্কে বুঝতে গেলে আমাদের আরও কয়েকটি নির্যাতনের বিষয়ে ওয়াকিবহাল হওয়া জরুরি। যেমন- প্রথা-বহির্ভূত এবং বিজাতীয় নয় এমন যৌন সম্পর্কজনিত নির্যাতন, এমনকী অল্পবয়সি ছেলে, পুরুষ, রূপান্তরকামী এবং ব্যক্তিগতভাবে চিহ্নিত উভলিঙ্গ প্রকৃতির যৌন নির্যাতন প্রভৃতি। ক্ষমতা-নির্ভর  ব্যক্তিগত হিংসা পারস্পরিক সম্পর্কের বাইরে, যেমন- অপরিচিত মানুষের দ্বারাও ঘটতে পারে। এক্ষেত্রেও একজন মানুষের উপর আরেকজন মানুষের ক্ষমতার আস্ফালন দেখা যায়।

ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজ বা আইএসটিএসএস-এর মত অনুযায়ী, নির্যাতনের প্রভাবে মানুষের মধ্যে সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই বা মোকাবিলা করার শক্তি ভেঙে পড়ে, মানসিক চাপের মোকাবিলার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয় এবং অনুভূতিগত, মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক ক্ষেত্রেও নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হিসেবে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে নিরাপত্তা বোধ এবং অন্যকে বিশ্বাস করার শক্তি হারিয়ে যায়। সেই সঙ্গে মানুষের কার্যক্ষমতা, আত্মনির্ভরতা এবং উৎপাদনশীলতা বা সৃষ্টিশীলতাও বাধাপ্রাপ্ত হয়। প্রায়শই আক্রান্ত  মানুষের মধ্যে সম্পর্কজনিত পরিপূর্ণতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যায়, চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ এবং পিটিএসডি বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, যেগুলো মূলত মানসিক, শারীরিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার অঙ্গ, তা দেখা দেয়। অর্থনৈতিকভাবেও এই সমস্যাগুলোর সমাধান যথেষ্ঠ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। এছাড়াও ক্ষমতা-নির্ভর ব্যক্তিগত হিংসার কুপ্রভাব পারিবারিক কাঠামোয় আঘাত করে। অথচ এই পরিবারগুলোকেই মানুষের সামাজিক ও গোষ্ঠীব্যবস্থার  অন্যতম প্রধান অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দৈনন্দিন জীবনে ঘটে চলা ক্ষমতা-নির্ভর এসব হিংসা একটা মাত্রায় গিয়ে আমাদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং আমরা অনবরত এই হিংসা  কার্যকরীভাবে রোধ করতে ও হ্রাস করতে দিশাহারা বোধ করি। সমাজ বা গোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষের উচিত এই সমস্যাকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি সচেতন ও সজাগ হওয়া, যারা হিংসার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন  থাকা এবং ক্ষমতা-নির্ভর হিংসার মহামারী রূপ সম্পর্কে ও তার প্রতিকারের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের ও অন্যান্যদের শিক্ষিত করে তোলাও একান্ত জরুরি বিষয়।

প্রবন্ধটি লিখেছেন পিএইচডি ডিগ্রিধারী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দিব্যা খান্না। বর্তমানে ইনি ব্যাঙ্গালোরে চিকিৎসাকার্যে অনুশীলনরত। কিছুদিন আগে ডাক্তার খান্না ব্যাঙ্গালোর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাসভিল্লি-র ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে হিংসার শিকার হওয়া পূর্ণবয়স্ক মানুষকে নিয়ে কাজ করেছেন।          

 

            



প্রস্তাবিত