গর্ভাবস্থা এবং মাতৃত্বকালীন সময়ে অবসাদ-বিরোধী ওষুধ ব্যবহার করা উচিৎ কী না

মেয়েদের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার বাসনা বা সন্তানসম্ভবাকালীন সময়ে এবং সন্তানের জন্মের পরবর্তী পর্যায়ে অবসাদ-বিরোধী ওষুধের ব্যবহার নিয়ে নানারকম ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এখানে গর্ভাবস্থাকালীন এবং মাতৃত্বকালীন সময়ে অবসাদ-বিরোধী ওষুধের ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে কিছু প্রশ্ন-উত্তর আলোচনা করা হয়েছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য- এটা সবসময়ে পরামর্শ দেওয়া হয় যে গর্ভধারনের আগে, সময়ে  এবং পরে ওষুধ ব্যবহার সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন মানুষের উচিত স্ত্রীরোগ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সেই বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে নেওয়া

আমার প্রজনন ব্যবস্থায় অবসাদ-বিরোধী ওষুধ কি প্রভাব ফেলতে পারে? যখন আমি গর্ভবতী হওয়ার চেষ্টা করছি তখন এই জাতীয় ওষুধ কি ব্যবহার করা যেতে পারে?

 কোনও মহিলা যখন গর্ভধারনের চেষ্টা করে এবং ওই একইসময়ে যদি তার কোনও মানসিক অসুখের চিকিৎসা চলে তাহলে তার উচিত একজন স্ত্রীরোগ এবং একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিছু অবসাদ-বিরোধী ওষুধ রয়েছে যেগুলো মহিলাদের যৌনতাড়না বা ডিম্বানু উৎপাদনে বাধার সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি যে গর্ভধারনের ক্ষেত্রে এইধরনের ওষুধ একা কোনও সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে না। সেক্ষেত্রে আরও অনেক বিষয় যুক্ত থাকে, যেমন- একজন মহিলার দৈহিক স্বাস্থ্য, বাহ্যিক কিছু বিষয় এবং যে কোনওরকম মানসিক উদ্বেগ,যা মূলত অসুস্থতার জন্যই হয়ে থাকে। তাই একজন মহিলার গর্ভধারনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ওষুধই যে একমাত্র নির্দেশক, তা বলা চলে না।

অবসাদ-বিরোধী ওষুধ কি আমার সন্তানের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে?

মানুষের দৈহিক স্বাস্থ্যের উপর এইজাতীয় ওষুধের অবশ্যই প্রভাব রয়েছে। তবে মানুষে-মানুষে এই প্রভাবের তারতম্য ঘটে। যদি কোনও মহিলা সন্তানধারনের পরিকল্পনা করেন তাহলে তাকে এটাই সুপারিশ করা হয় যে গর্ভধারনের আগে কাউন্সেলিং করানোর জন্য। এর ফলে তার অসুস্থতার গভীরতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়। এই মূল্যায়নের উপর নির্ভর করে তার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মায়ের যদি কোনও অসুস্থতা না থাকে তাহলে সেই মা যে সন্তানের জন্ম দিচ্ছে, সেই শিশুদের প্রতি একহাজার জনের মধ্যে পাঁচটি শিশুর জন্মগত সমস্যা দেখা  দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে যেসব মহিলারা অবসাদ-বিরোধী ওষুধ ব্যবহার করে তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিটা কিছুটা বেশি, অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রতি হাজারজনের মধ্যে ৭জন শিশুর মধ্যে জন্মগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিছু মহিলা যখন গর্ভধারনের পরিকল্পনা শুরু করে তখন ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ অনাগত শিশুর উপর ওই ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা চিন্তায় থাকে। অনেকে আবার বিয়ের আগেই সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়। এই দুই ক্ষেত্রেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ এর ফলে অসুখ আবার ফিরে আসতে পারে।

অবসাদ-বিরোধী ওষুধ ব্যবহারকালীন সময়ে আমি বাচ্চাকে স্তনপান করাতে পারব কি?

মানসিক অসুস্থতার কারণে যেসব মহিলারা ওষুধ খান তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাচ্চা জন্মানোর পর স্তনপান করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। কারণ মায়ের মানসিক সুস্থতা এবং মা-শিশুর আত্মিক যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য স্তনপানের অবদান অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে মায়ের উচিত তার ডাক্তারের সঙ্গে ওষুধের মাত্রা ও তার ব্যবহারের সময়সীমা নিয়ে পরামর্শ করা।

অবসাদ দূর করার ওষুধ ব্যবহারের বদলে আমি কি শরীরচর্চা করতে পারি?

মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটা কখনোই সুপারিশযোগ্য নয় যে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে শারীরিক কসরত বা শরীরচর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া। শরীরচর্চা চিকিৎসার সহযোগী একটা পন্থা হতে পারে মাত্র। এবিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্ত্রীরোগ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা একান্ত জরুরি।

আমি অবসাদ-বিরোধী ওষুধও খাচ্ছি এবং আমার মেজাজ-মর্জিরও ঘন ঘন বদল ঘটছে। কীভাবে আমি বুঝব যে এই মেজাজ-মর্জিগত বদলের পিছনে আমার মানসিক অসুস্থতা বা গর্ভবস্থাকালীন হরমোনের পরিবর্তনই দায়ী?

হরমোনজনিত কারণে মেজাজ-মর্জির যে বদল হয় তা মাঝে মাঝে ঘটে এবং মানসিক অসুস্থতার কারণে যে মেজাজ পরিবর্তন হয় তার থেকে হরমোনজনিত কারণে হওয়া মর্জির বদলের গভীরতা অনেক কম। যদি কোনও মহিলার মধ্যে গভীর বিষণ্ণতা দেখা দেয়, বা তার মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা জাগে অথবা নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছে প্রবল হয় তাহলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি। মহিলারা যাতে মানসিক চাপের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিদিন মহিলার স্বামী ও পরিবারের লোকদের সজাগ থাকতে হবে। আর যে মুহূর্তে তার সাহায্যের দরকার পড়বে সেই মুহূর্তে তার দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

অবসাদ-বিরোধী ওষুধের ক্ষেত্রে আমি আমার ডাক্তারকে কী ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারি?

প্রথমত, আমি জিজ্ঞাসা করতে পারি যে আমার অসুস্থতা আমার অনাগত বাচ্চার উপর প্রভাব ফেলতে পারে কিনা?

দ্বিতীয়ত, ওষুধের প্রভাব আমার গর্ভধারনের উপর এবং আমার স্তনদানের সক্ষমতার উপর পড়তে পারে কিনা?

তৃতীয়ত, গর্ভধারনের সময়ে আমায় কী ধরনের অতিরিক্ত সাবধানতা নেওয়া উচিত?

সাধারণভাবে একজন সন্তানসম্ভবা মহিলার উচিত একইসঙ্গে একজন স্ত্রীরোগ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া। কারণ যে ডাক্তাররা চিকিৎসা করছেন তাঁদের জানা দরকার যে রুগি কী ধরনের ওষুধপত্র খায়। আর এই জানার মধ্য দিয়েই তাঁরা রুগির বর্তমান শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করতে সক্ষম হন। এসএসআরআইএস (SSRIs)-এর মতো ওষুধ গর্ভধারনের শেষ পর্যায়ে ব্যবহার করলে সদ্যোজাত সন্তানের পালমোনারি হাইপারটেনশনের মতো শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া গর্ভবতী মহিলার শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি পুরোপুরি সচেতন থাকা তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষেও একান্ত জরুরি একটা বিষয়।

সেইসব মানুষকে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব যারা বলে ''আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম তাহলে আমি এসব ওষুধ খেতাম না''?

একজন মহিলা যখন মা হতে যায় তখন তার পরিবারের সদস্যরা তাকে নানাভাবে বিভিন্নরকম উপদেশ, পরামর্শ দিতে চায়। যে কোনও অবসাদ-বিরোধী ওষুধই যে গর্ভস্থ শিশুর পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে, সেই ধারণাটা আক্ষরিক অর্থে ভুল। এসএসআরআইএস (SSRIs)-এর মতো অবসাদ-বিরোধী ওষুধ যে বাচার স্বাস্থ্যের  উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে, তার উদাহরণ নিতান্তই অল্প। কিন্তু বাচ্চার মায়ের অবসাদের যদি যথাযথ চিকিৎসা না হয় তাহলে পরবর্তীকালে এডিএইচডি এবং বিকাশগত অব্যবস্থা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত অবসাদ-বিরোধী ওষুধ খাওয়া বা না-খাওয়া নির্ভর করে একজন মহিলার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর। তার ডাক্তার শুধু তাকে সঠিক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন এবং সেই ওষুধের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করতে পারেন। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত  নেওয়ার অধিকারী হল একজন হবু মা।

এই প্রশ্ন-উত্তরগুলো লিখতে সাহায্য করেছেন ব্যাঙ্গালোরের রঙ্গাডোর মেমোরিয়াল হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা তথা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লতা ভেঙ্কটরাম এবং ব্যাঙ্গালোরের ফর্টিস লা ফেম্মে-র মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অশ্লেষা বাগাডিয়া

অবসাদ-বিরোধী ওষুধ এবং গর্ভাবস্থা নিয়ে যদি আপনার বা আপনাদের মনে কোনও প্রশ্ন থাকে তাহলে সাবজেক্ট বা বিষয়ের জায়গায় 'অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্টস্‌ অ্যান্ড প্রেগন্যান্সি' লিখে এই ঠিকানায় পাঠাতে  পারেন- connect@whiteswanfoundation.org         

Was this helpful for you?