দ্য ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে অভিভাবকরা কী ব্যবস্থা নিতে পারে

যদি দেখা যায় যে আপনার সন্তান ব্লু হোয়েল গেমের সমস্যার শিকার হয়েছে তাহলে  সেক্ষেত্রে আপনি বা আপনারা কীভাবে তার মোকাবিলা করবেন?

যদি আপনার পরিচিত কোনও ব্যক্তি ব্লু হোয়েল বা নীল তিমি নামক খেলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তাহলে সেক্ষেত্রে আপনার করণীয় কী হবে?

১. তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতে হবে ওই খেলার সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তাদের কীরকম অনুভূতি হত

২. যদি আপনি তাদের আচরণে কোনও পরিবর্তন লক্ষ করেন তাহলে সেই নির্দিষ্ট আচরণ সম্পর্কে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে

৩. যখন কেউ ব্লু হোয়েল খেলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে একমাত্র তখনই তাকে সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। কারণ একটা সাধারণ প্রবাদ রয়েছে যে কাউকে একথা জিজ্ঞাসা করা মানে তার মাথায় সেই চিন্তাটা ঢুকিয়ে; সত্যিটা হল এর মধ্য দিয়ে তারা কীভাবে দিন কাটাচ্ছে সেই বিষয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ
করে দেওয়া হয়।

৪. তাদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা জরুরি এবং তাদের কাছ থেকে জানা উচিত যে তারা এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

৫. তাদের কোনও হেল্পলাইনের সাহায্য বা মনোবিদের সঙ্গে পরামর্শের সুপারিশ
করা প্রয়োজন।

গত কয়েকদিন ধরে আমাদের দেশের কিশোর-কিশোরী বা যুবক-যুবতীদের মধ্যে ব্লু হোয়েল গেম খেলা নিয়ে আমরা সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে অনেক খবরাখবর জানতে  পেরেছি। কেন একজন মানুষের মধ্যে এই খেলায় অংশ নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে তা বোঝার জন্য আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সেই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী ছেলে-মেয়েদের অভিভাবকদের এই বিষয়ে কী করণীয় তাও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছিলাম-

ব্লু হোয়েল গেম বা নীল তিমি গেম খেলার বিষয়ে আমরা কী জানি?

ব্লু হোয়েল খেলার সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু শুনেছি। এই খেলাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকজনের মারা যাওয়ার খবর সামনে আসার জন্য আমরা এই বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছি। এই মুহূর্তে এই বিষয়ের অনেক তথ্য আমাদের জানা নেই এবং এই খেলার বিরুদ্ধে আতঙ্কগ্রস্ত বা চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া সতর্কবার্তাও আমরা পাইনি। এই গেমের উৎপত্তি হয়েছে ইউরোপে। সেখানে বসবাসকারী মানুষের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যেই এই গেমের রমরমা দেখা গিয়েছে ও এই খেলার অংশগ্রহণকারীদের আচরণ বিশ্লেষণ করার পর্যাপ্ত ক্ষমতাও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

ব্লু হোয়েলের মতো একটা বিপজ্জনক গেমের প্রতি বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিদের আকর্ষণ কেন বেড়ে চলেছে?

এই গেম নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একপ্রকার পর্যায়ক্রমিক সাফল্যের নেশা গড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে এই খেলায় জেতার জন্য মরীয়া চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। সেই  সঙ্গে একটা ধাপে জিতে তার পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় অংশ নেওয়ার জন্য অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ক্রমশ উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে এবং পুরস্কারের লোভে অ্যাড্রিনালিন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বাড়ছে ও বাহ্যিক মূল্যায়নের প্রবণতাও গড়ে উঠছে।

কারা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে?

প্রিয়জনের চাপের মুখে পড়ে এমন অনেক বাচ্চা রয়েছে যারা এই খেলায় অংশ নিতে চাইছে না সেরকম কোনও বাচ্চা বা কিশোর-কিশোরী, যাদের মধ্যে অনলাইন গেম খেলার তেমন জ্ঞান-বুদ্ধি নেই, বিশেষ করে অনলাইন গেমের নিরাপত্তার বিষয়ে যাদের কোনও ধারণা নেই, সেই তারাই মূলত ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। যারা এই গেমে অংশ নিচ্ছে তারা হয় একাকিত্বে ভুগছে বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, মানসিকভাবে কোনও সমস্যার শিকার হয়েছে এবং যাদের মধ্যে অন্যের  দ্বারা শারীরিক নিগ্রহের ঝুঁকি রয়েছে তারাই মূলত এই বিপজ্জনক খেলায় মেতে উঠছে। এর জন্য কিছু অল্পবয়সি ছেলে-মেয়ে তাদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য নিজের বৃত্তের লোকজনের সমর্থনও আশা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে অনলাইনের নিরাপত্তার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব বাচ্চাদের এই অনৈতিক, অযৌক্তিক চাওয়াকে আরও বেশি করে প্রশ্রয় জোগাচ্ছে।

কীভাবে অনলাইনের মাধ্যমে কাউকে বিশ্বাস করার বিষয়টা একজন কিশোর বা কিশোরীর পক্ষে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে?

বয়ঃসন্ধিকালে একজন মানুষের মধ্যে বড় হওয়ার সব লক্ষণ ফুটে উঠলেও তাদের  মধ্যে চিন্তাভাবনার সূক্ষ্মতা এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা সেভাবে গড়ে ওঠে না। তাছাড়া এই সময়ে একজন ছেলে বা মেয়ের মধ্যে বৌদ্ধিক সব লক্ষণ কম-বেশি বিকাশলাভ করলেও, ২৫ বছরের আগে মানুষের মস্তিষ্কের প্রিফন্টাল অংশ, যার দ্বারা মানুষের মধ্যে সূক্ষ্ম ভাবনাচিন্তা করার ক্ষমতা বা অনুভূতিগত স্থিতিস্থাপকতা  গড়ে ওঠে, তার যথাযথ বিকাশ সম্ভব হয় না। এই বিষয়টা অনেকটা যান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণহীন শক্তিশালী একটা গাড়ির সঙ্গে তুলনীয়। যখন বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েরা মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকে না বা একাকিত্বে ভোগে তখন তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর ফলাফল অনুধাবন করার ক্ষমতাও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে না। তাদের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যকর না অস্বাস্থ্যকর, সেই বিষয়ে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা তাদের জন্মায় না। তখন তাদের মধ্যে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার ঝোঁক বা লোভ জন্মায় বা আত্মমর্যাদা বজায় রাখার জন্য তখন তারা নিজেদের কৃতিত্বগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

এই সমস্যার সমাধান করার জন্য বাচ্চাদের কোন ধরনের আচরণের প্রতি অভিভাবকদের লক্ষ রাখতে হবে?

  • যদি কারোর ছেলে বা মেয়ে পরিবারের সদস্য বা বন্ধুবান্ধবের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে নিজের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে থাকে (এর সঙ্গে কিন্তু লাজুক বা অর্ন্তমুখী কিশোর বা কিশোরীদের পার্থক্য রয়েছে। এই ধরনের অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের অবধারিতভাবে সেই সব বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা খুব কম থাকে যাদের সঙ্গে তারা হাসিঠাট্টা করে সময় কাটাতে পারে। পরিবর্তে এরা একা থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে)
  • যদি অভিভাবকরা দেখেন যে তার সন্তান বিষণ্ণ হয়ে রয়েছে, অকারণে চিৎকার চেঁচামেচি করছে বা আগে তারা যে কাজ করে আনন্দ পেত এখন আর তাতে কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না
  • যদি বাচ্চারা নিজেদের প্রায়শই ঘরবন্দি করে ফেলে এবং অনলাইনে তারা কী করছে তা জানাতে অভিভাবকদের সামনে ইতস্তত করে বা ইন্টারনেটে তারা যা পড়ছে বা কাজ করছে তা করা নিয়ে তাদের অনমনীয় বা জেদি মনোভাব দেখানো
  • কোনও সঙ্গত কারণ ছাড়াই যদি বাচ্চারা নিজেদের ক্ষতি করে, বারবার
    নিজেদের আঘাত করে

যদি উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনও এক বা একাধিক লক্ষণ সন্তানদের মধ্যে ফুটে ওঠে তাহলে অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তখন অবিলম্বে সমস্যার সমাধানের জন্য একজন মানসিক স্বাস্থ্যের  বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।

কীভাবে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিরাপদে রাখতে পারবে? ফোন বা  ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই কি সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে?

প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেই সবসময়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাহলে সন্তানদের অনলাইনে কাজকর্ম করা বন্ধ করার পরিবর্তে সমস্যা সমাধানের জন্য অভিভাবকরা আর কী করতে পারেন। ব্লু হোয়েল গেমের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের অসময়ে কাজ করতে হয়, যেমন- মধ্য রাতে ছেলে-মেয়েরা এই গেম খেলে। তাই সন্তানরা যখন অনলাইনে কাজ করবে তখন তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করেও তারা কী করছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকার চেষ্টা করতে হবে। অথবা বাচ্চাদের উপর যে খেয়াল রাখা হচ্ছে সে  সম্পর্কে তাদের মনে বোধ জাগানো দরকার। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের কড়া হুঁশিয়ারি প্রয়োজন। সন্তানদের সঙ্গে অনলাইনের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তারিত কথাবার্তাও  বলতে হবে।

অভিভাবক হিসেবে একজনের উচিত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল নিয়ে তাদের সন্তানদের সঙ্গে কথা বলা। যখন তারা বাড়িতে থাকবে, খাওয়াদাওয়া করবে বা শুয়ে বিশ্রাম করবে তখন ফোন বা অন্যান্য বৈদ্যুতিন যন্ত্র নিজের থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন। ফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মকানুন গড়ে তুলতে হবে। কখন প্রযুক্তি ব্যবহার যুক্তিযুক্ত সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা গড়ে তুলতে হবে; অভিভাবক হিসেবে আপনি আপনার সন্তানকে রাতেরবেলায় ফোন ও ইন্টারনেট বন্ধ রাখার নির্দেশ দিতে পারেন এবং তাদেরও সেই কথামতো ব্যক্তিগত জীবনযাপনের অধিকার রক্ষার জন্য ফোনের সুইচ বন্ধ রাখাই দরকার। সেই সঙ্গে অভিভাবকদের নিশ্চিত হবে যে তাদের সন্তানরা যেন সকাল না হওয়া পর্যন্ত ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার না করে।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য শিশু ও বয়ঃসন্ধিজনিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ  ডাক্তার ভূষণ শুক্লা এবং মনোবিদ সোনালী গুপ্তার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।    

 

  

    

   

প্রস্তাবিত