বুলিমিয়ার সাথে আমার লড়াই

মানসিক আবেগের চাপ, নিজের দেহ নিয়ে আক্ষেপ, এবং ফলে নিজের খাদ্যবিকার নিয়ে এক তরুণীর অভিজ্ঞতা

দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন আমি প্রথম ধরতে পারি আমার সমস্যাটা। কিন্তু এটা শুরু হয় তিন বছর আগে, যখন আমি বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হই। তাঁর আগে অবধি জীবনটা ভালই কাটছিল। আমি নেহাতই এক শিশু ছিলাম। আমি মোটা ছিলাম কিন্তু তাই নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপ ছিল না। পড়াশুনায় ভাল ছিলাম এবং সেটাই আমার লক্ষ্য ছিল।

কিন্তু হস্টেলে ভর্তি হবার পর সব পাল্টে গেল। আমার অস্বস্তি করত। ঘর থেকে দূরে নিজেকে একা লাগত। এর পরের তিনটি বছর আমার জন্যে যুদ্ধের সামিল হয়ে উঠল। সব কিছু যেন হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল এবং আমি নিজের মনকে সামলাতে পারছিলাম না। পরীক্ষায় খারাপ নম্বর পেতে লাগলাম। এতে মানসিক চাপ আরও বেড়ে গেল।

মানসিক চাপ এবং মনে নানান আশা নিয়ে দশম শ্রেণিতে উঠলাম। সেই বছরই আমার বোর্ডের পরীক্ষা ছিল। দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ধীরে ধীরে মন মেজাজ বিগড়াতে লাগল এবং আমি জিনিসপত্র ছুড়ে ভাঙতাম। পুরো সময়টাতে, আমি নিজের পরিণতি দেখতে পারছিলাম না। কপাল ভাল, আমার এক শিক্ষকের নজরে এই লক্ষণগুলি পড়ে, এবং তিনি এগিয়ে আসেন। পরের কয়েক মাস আমি বাড়ি থেকে স্কুলে যেতাম। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শুধরাতে লাগল এবং আমি পরীক্ষায় আবার ভাল ফল করা শুরু করলাম। কিন্তু ছুটির পরে আমার নিজের দেহ নিয়ে আক্ষেপের সমস্যাটি সামনে এল।

হস্টেলে আমার নিজের উপরে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তাই এবার ঘরে বসে আমি অলস মস্তিষ্কে নিজের জীবনের রাশ আবার নিজের হাতে ফিরে পেতে চাইছিলাম। ঘরে বসে বসে আমি আরও মোটা হয়ে গিয়েছিলাম, তাই এবার নিজের দেহের দিকে আমি নজর দিলাম। আমার হাতে অনেক কিছুই নেই, কিন্তু আমার দেহ, আমার ওজন, আমার ব্যক্তিত্ব – এইসব তো আমার হাতেই! আমি মা বাবার কাছে জিমে বা সাঁতারে ভর্তি করে দেওয়ার জন্য বায়না শুরু করলাম। কিন্তু প্রত্যেকবারই আমায় অজানা কোনও কারণে তাঁরা না বলে দিলেন। তাঁরা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছিলেন না, কি করেই বা বুঝবেন?

ইতিমধ্যেই, আমি খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলাম। ফলে যখন খেতাম, বেশি খেতাম। মিষ্টির প্রতি আমার দুর্বলতা আর খাবার কমানোর চেষ্টার মাঝে আমি পিষে যাচ্ছিলাম। এতে আমার অপরাধবোধ আরও বাড়ছিল – একদিন না খেয়ে যা ক্যালরি ঝরাতাম, অন্যদিন দ্বিগুণ খেয়ে তা পুষিয়ে যেত। আমি নিজের দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ পেতে চাইছিলাম; কিন্তু খাবার দেখলে আর মাথার ঠিক থাকত না, ফলে আবার যেই কে সেই। এরকমই চলত হয়ত, কিন্তু একদিন আমি আর পারলাম না – জোর করে বমি করলাম। দারুণ লাগল!

এতদিন পর, হাতে লাগাম পেলাম। যা ভাল লাগত খেতাম, তাও শরীরে লাগত না। প্রথমবারের পর আমি কিছুদিন ঠিক ছিলাম। যদিও, এই গোগ্রাসে খাওয়া আর হড়হড়িয়ে বমি করা আমার অভ্যাসে দাঁড়াল। আমি অনেক স্কুল পাল্টালাম, যেটা স্বভাবতই আমার পক্ষে মুশকিলের ছিল। কাজেই, আমার অভ্যাস জারি থাকল। এটা ঠিক কিনা আমি জানতাম না। বয়েই গেছিল আমার জানতে! একটু যে লজ্জা লাগত না তা নয়, কিন্তু দিনের শেষে, খাবার আমায় তৃপ্তি দিত, আর বমি ক্ষমতার রাশ। 

আমার বাবা মা চিন্তিত ও অসহায় বোধ করছিলেন। তাঁরা দুজনেই চাকরি করতেন, এবং আমার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। আমি তাঁদেরকে সব খুলে জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হয়ে উঠল না।  আমার জেদ চেপে যাচ্ছিল। তাঁরা ভাবলেন যে আমি অবাধ্য। লজ্জায় বন্ধুদের সাথে মিশতাম না – একলা হয়ে গেছিলাম। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন আমার বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ এল। আমিও ধীরে ধীরে আমার উপসর্গগুলির সম্পর্কে জানতে লাগলাম। যখন আমি বুলিমিয়া (নার্ভোসা) সম্পর্কে পড়লাম, আমি মাকে গিয়ে সব জানালাম। বলাই বাহুল্য, তাঁরা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। রোজ এই নিয়ে তর্ক হতে লাগল – আমি জানতাম আমার সাহায্যের প্রয়োজন, কিন্তু ছোট ছিলাম বলে নিজের পক্ষে তা নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমার মা বাবা বিষয়টিকে আমলই দিচ্ছিলেন না।

অনেক কান্নাকাটি চেঁচামেচির পর তাঁরা আমার কথা মানলেন। তাঁরা আমায় কিছু স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন যারা আদৌ আমার চিকিৎসা করার মত যোগ্য ছিলেন না। অন্তত আমার তো তাই মনে হত। ফলে আমি তাঁদের কাছে মন খুলে সব কথা বলতে পারছিলাম না। আমি ব্যাঙ্গালোরের নিমহ্যান্সে যেতে চাইছিলাম। আমি খুব ছোটবেলায় সেখানে গিয়েছিলাম, এক চিকিৎসাধীন আত্মীয়কে দেখতে। তাই আমি জানতাম যে এই রকম জটিল মনোরোগের চিকিৎসা করার মত সুযোগ সুবিধা সেখানে রয়েছে। সেখানেই প্রথম আমার বুলিমিয়ার চিকিৎসা শুরু হল। তিন মাসের অধ্যাবসায় জানা গেল যে আমার মনের অবদমিত ভাবাবেগই এই সমস্যার কারণ।

আমার চিকিৎসায় ওষুধপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন রকম থেরাপি চলতে লাগল। তার দরুনই আমার বাবা-মা প্রথম আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলেন। কিছুদিন পর, আমি আগের চেয়ে সুস্থ বোধ করছিলাম, এবং বমি করা বন্ধ করে দিলাম। মনে আশা জাগছিল, কিন্তু এ তো সবে লড়াইয়ের সূত্রপাত!

লোকে মনে করে যে খাদ্যবিকার মানেই মনোবিদ্যার সাহায্য নেওয়া আর সেরে যাওয়া। এটা সত্যি না – সেরে উঠতে অনেক সময় লাগে, লড়াই লাগে, মনের জোর লাগে , বিশেষ করে যদি চিকিৎসা করাতে যাওয়ার আগে আমার মতন অনেকদিন বুলিমিয়াতে ভুগে থাকেন। বুলিমিয়া আমার সমস্যা ছিল না। পরিস্থিতির সাথে না মানিয়ে নিতে পারাই ছিল আমার সমস্যা – বুলিমিয়া তো তারই পরিণাম। থেরাপি চলাকালীন আমি অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর আগে আমি জানতাম না যে বোর্ডিং-এ পাঠানো ও আর বাড়ি থেকে পড়াশুনোর চাপেই আমার এই হাল।

সেরে ওঠার উপায় একটাই, পরিস্থিতি অনুসারে বাঁচতে শেখা। চার বছর হয়ে গেল আমার চিকিৎসার। এই চার বছরে আমি যোগ ব্যায়ামের সাহায্যে নিজের শরীর ও মন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। কখনও কখনও যে সে আমার মেজাজ বিগড়ায় না তা নয়, কিন্তু সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানই হল আসল। প্রত্যেক বারই আমার লড়াই একটু হলেও কঠিন হয়, কিন্তু আমি ঘুরে দাঁড়াই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি পেয়েছি যে অবিলম্বে চিকিৎসা প্রয়োজন। এখন আমি অনেক সুস্থ, কিন্তু আরও ক’টা দিন আগে যদি আমি সাহায্য পেতাম! 

Was this helpful for you?