We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

ক্যানসার কি আমার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

কোনও মানুষের শরীরে ক্যানসার নামক রোগটি চিহ্নিত হওয়ার পর তার মনে নানারকম তীব্র অনুভূতি জাগে, যেমন- সে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে, অবিশ্বাস করতে শুরু করে, রাগ জন্মায়, ক্লান্ত ও বিষণ্ণ বোধ করে; এই অসুখ একজন মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

অধিকাংশ ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের মনে যে প্রবল মনোবেদনা বা গভীর দুঃখের  বোধ জাগে তার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে-

প্রবল মনোবেদনার কয়েকটি পর্যায়

অস্বীকার বা মানতে না চাওয়া- এই পর্যায়ে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি মানতে অস্বীকার করে। এইসময় তার মনে হয় যে এমন ঘটনা কখনোই তার জীবনে ঘটতে পারে না।

রাগ- এই সময়ে মানুষ নিজের বা তার চারপাশে থাকা মানুষজনের উপরে খুব রাগ প্রকাশ করে। যেমন- ''আমি জীবনে কখনো সিগারেট খাইনি, তবু কীভাবে আমার ক্যানসার হল!''

দরাদরি- এই পর্বে মানুষ ভগবানের সঙ্গে একপ্রকার চুক্তি করতে চেষ্টা করে অথবা অলীক শক্তির কাছে পৌঁছানোর জন্য নানারকম পদক্ষেপ করে। যেমন- ''যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমার কিছু ধরা নাও পড়ে তাহলেও এই জীবনে আমি সিগারেট  খাওয়া ছেড়ে দেব।''

অবসাদ- মানুষ শেষমেশ পরিস্থিতিটিকে মেনে নিতে শুরু করে, কিন্তু তার মনে খুব বিষণ্ণতা বোধ হয়, যেমন-''আমি ছেড়ে দিয়েছি। এর থেকে আর বেশি কিছুই আমার করার নেই।''

গ্রহণযোগ্যতা- এই পর্যায়ে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিতে শুরু করে এবং ভালোভাবে বুঝতে পারে যে তার জীবনে এই অসুস্থতার একটা বড় প্রভাব পড়তে চলেছে। এইসময়ে একজন মানুষের মনে হয়, ''হ্যাঁ, সত্যিই এই ঘটনাটা আমার জীবনে ঘটেছে।''

যদি কারোর ক্যানসার চিহ্নিত হয় তাহলে তার নানারকম অনুভূতি জেগে ওঠে। যেমন- রোগের নাম শুনে একজন মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়তে পারে, অবিশ্বাস করতে পারে এবং এরকম আরও অনেক চিন্তাভাবনা মাথায় আসতে পারে। সেই সঙ্গে চলে কিছু প্রশ্নের উত্তর বা রোগের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা। এই প্রসঙ্গে মনোবিদ হিবা সিদ্দিকি বলেছেন, ''অনেক রুগিই প্রাথমিকভাবে এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যে কেন আমার এই রোগ হল? এত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরেও   কীভাবে আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটল? এর পিছনে কী আমার কর্মফল দায়ী? এটা  কি আমার অদৃষ্টের লিখন? আমার কপালে কি এর চেয়েও খারাপ কিছু রয়েছে? আমি কি রোগের হাত থেকে মুক্তি পাব? নাকি আমি মরে যাব?

ক্যানসার নামক অসুখ চিহ্নিত হওয়ার পর মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। এর বাহ্যিক লক্ষণের কারণগুলো হল বিষণ্ণ ভাব, হতাশা এবং ক্লান্তি বোধ করা। কারোর মধ্যে আবার শারীরিক বা মানসিকভাবে রোগের চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা শুরু হয়।

এর প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবার এবং তার সম্পর্কগুলোর উপরে পড়ে। রোগ নির্ণয়ের উপর নির্ভর করে একজন মানুষকে তার জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে রয়েছে মানুষের কাজ ও তার
পারিবারিক দায়দায়িত্বগুলো।

ক্যানসার মানুষের আত্মনির্ভরতা এবং আত্মপরিচয়ের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। আর তার ফলে মানুষের শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে যে প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বগুলো পালন করার কথা থাকে এবং নিজের চিকিৎসার নির্ঘণ্ট তৈরি করা হয়, তা-ও প্রভাবিত হয়। শরীরের বাহ্যিক পরিবর্তনের জন্য নিজের সম্পর্কে মানুষের ভরসাও তলানিতে পৌঁছায়।

কেন মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার প্রয়োজন হয়?

ক্যানসার ধরা পড়ার পরে মানুষের মধ্যে যে মানসিক চাপ ও চিন্তার জন্ম হয় তা তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। রোগ ধরা পড়ার পরে কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও মানুষের মধ্যে যে বিহ্বলতা এবং দুঃখবোধ হয় তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে থাকে নিজের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে মানসিক উদ্বিগ্নতা। তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে নিজের শরীরের প্রতি সবসময়ে নজর রাখা প্রয়োজন আর প্রয়োজনমতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ক্যানসার আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগ হওয়ার ঝুঁকি সাধারণভাবে অনেক বেশি থাকে। এবং এই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা তাদের দৈহিক স্বাস্থ্য ও স্থিতিস্থাপকতার উপরও পড়ে। তাই যদি কারোর ক্যানসার ধরা পড়ে তাহলে তার উচিত নিজের সুরক্ষার পরিকল্পনায় মানসিক স্বাস্থ্যকে অর্ন্তভুক্ত করা এবং সমস্যার মোকাবিলা করা।

কীভাবে সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব

আমাদের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে; যদি কারোর ক্যানসার ধরা পড়ে তাহলে এই দুই স্বাস্থ্যের যত্ন কীভাবে নেওয়া হবে সে বিষয়ে নীচে কয়েকটি উপায়ের কথা আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু এই পন্থাগুলো খুবই বিস্তৃত তাই এই পরামর্শগুলো মানুষ তার দৈহিক স্বাস্থ্য ও তার ডাক্তারের নির্দেশের সঙ্গে মিলিয়েমিশিয়ে বিবেচনা করতে পারে।

১. নিজের অসুস্থতা ও চিকিৎসা সম্পর্কে ডাক্তারের কাছে সমস্ত প্রশ্ন ও তার উত্তর ভালো করে জেনে নেওয়া একান্ত দরকার। যথাযথ তথ্য মানুষের অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

২. নিজের জীবনযাপনের অদল-বদল সম্পর্কে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়াও দরকার। ধূমপান ও অ্যালকোহল বা মদ খাওয়া এড়িয়ে চলা জরুরি। কারণ এগুলো অসুস্থতা, মানসিক চাপ ও উদ্বেগকে বাড়িয়ে দেয়।

৩. নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। এমনকী হালকা হাঁটাহাঁটিও প্রয়োজন।

৪. যতটা সম্ভব ঘুমের ধরনকে যথাযথ করা জরুরি। একটা পুরো রাত ভালোভাবে ঘুমালে তা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে। নিজের অনুভূতিগুলোকে লাগাম দিয়ে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৫. দৈনন্দিন কাজ ও নিজের পছন্দের কাজকর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে।  যে কাজ করতে ভালো লাগে সেই কাজই মন দিয়ে করা দরকার।

৬. নিজের চারপাশে থাকা সহযোগী মানুষজনকে চিহ্নিত করতে হবে। যেমন- পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশি প্রভৃতি। এরা বাস্তবিক ও মানসিক সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসে।

৭. নিজের পছন্দ অনুযায়ী নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে হবে। যেমন- কারও সঙ্গে কথা বলে, জার্নাল পড়ে বা শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে নিজের অনুভূতি অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।

৮. যদি সম্ভব হয় তাহলে স্থানীয় সহযোগী দলে যোগ দেওয়া প্রয়োজন।

এছাড়াও একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলাটা অত্যন্ত জরুরি। মানসিক সাহায্য নিজের চিকিৎসা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার জন্য খুবই কার্যকরী একটি বিষয়। যখন একজন প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া যায় তখন তা খুবই বাস্তবসম্মত হয়। এর ফলে নিজের বিপর্যয়টিকে ভালোভাবে চিহ্নিত করা যায় ও মানসিক চাপ কমানো সম্ভবপর হয়। সেই সঙ্গে এর সাহায্যে যে কোনওরকম শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকাও যায়।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য কাউন্সেলিংরত সাইকোলজিস্ট এবং সাইকো-অঙ্কোলজিস্ট হিবা কুরেশির সাহায্য নেওয়া হয়েছে।