মনোরুগিদের পরিবারকেও সহ্য করতে হয় কলঙ্কের বোঝা

মানসিক অসুখকে ঘিরে যে কলঙ্ক বা বদনামের ধারণ গড়ে ওঠে তাতে কি শুধু রুগিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়? দেখা গিয়েছে যে, মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে শুধু রুগি নয়, তার পরিবারের লোকেদের উপরেও নেমে এসেছে কলঙ্কের ছায়া।

কলঙ্কের চাপের কারণে পরিচর্যাকারীদের জীবনে সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা

কানাডার সমাজতত্ত্ববিদ আরভিং গফম্যান-এর মতে কলঙ্ক হল এমন এক ধারণা, বৈশিষ্ট্য বা আচরণ যা নির্দিষ্টভাবে সমাজে মানুষকে খুব হীন বা ছোট করে দেয়। গফম্যানের তত্ত্ব অনুসারে কলঙ্ক একজন মানুষকে মনের দিক থেকে অন্যান্যদের কাছে স্বাভাবিকতার বদলে অযাচিত বা অবাঞ্ছিত, প্রত্যাখ্যাত করে তোলে। যাঁরা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় ভোগেন তাঁদের কাছে কলঙ্ক শব্দটা খুব অপরিচিত নয়। এমনকী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাক্তন ডাইরেক্টর ডঃ নর্ম্যান সার্টোরিয়াস-এর মতে, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠিক মতো চিকিৎসা না হওয়ার পিছনে অন্যতম বড় কারণ হল কলঙ্ক বা বদনামের ভয়। কিন্তু মানসিক অসুখকে ঘিরে যে কলঙ্ক বা বদনামের ধারণ গড়ে ওঠে তাতে কি শুধু রুগিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়? এ বিষয়ে তেমন গবেষণা না হলেও যেটুকু হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে যে, মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে শুধু রুগি নয়, তার পরিবারের লোকেদের উপরেও নেমে এসেছে কলঙ্কের খাঁড়া। অর্থাৎ রুগির পরিবারের উপরেও কালিমালেপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মনস্তত্ত্ব বিষয়ে প্রকাশিত একটা ব্রিটিশ পত্রিকায় মার্গারেট ওস্টম্যান এবং লার্স জেলিন দেখিয়েছেন যে, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের পরিচর্যাকারী এবং আত্মীয়স্বজনরাও কলঙ্কের মোকাবিলা করে। এই পরিস্থিতিতে মূলত একজন মানুষের উপর আরোপ করা বদনামের ভাগীদার হয় অন্য কয়েকজন মানুষ। অর্থাৎ, মানসিক রুগির উপর যে বদনামের কালো ছায়া নেমে আসে তার ফল ভোগ করতে হয় রুগির পরিবারের লোকেদেরও।

যাদের মানসিক অসুস্থতা অনেকদিন ধরে স্থায়ী হয়, সেই সব রুগির পরিচর্যাকারীদের ক্ষেত্রে বদনাম এড়ানো খুবই কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। নিমহ্যান্সের মনোরোগ সংক্রান্ত পুনর্বাসন বিভাগের অধ্যাপক ডঃ টি শিবকুমার এই বিষয়ে বলেছেন, ''সাধারণ ধারণা হল, স্বল্পমেয়াদি মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে পরিচর্যাকারীরা রুগির প্রতিবেশি বা আত্মীয়স্বজনের কাছে অসুখের কথা নামমাত্র বলে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল ও ঘোরালো হয়। অন্যদিকে, নিমহ্যান্সের মনোরোগ সংক্রান্ত সামাজিক কাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ডঃ আরতি জগন্নাথন-এর মতে, ''মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি এবং তার পরিবারের উপর যে ধরনের সামাজিক বদনামের বোঝা চাপানো হয়, তা সবাই জানে। আর এই বিষয়টার মোকাবিলারও প্রয়োজন রয়েছে। নানা কারণে অনেকসময় পরিচর্যাকারীরা বিশ্বাস করে বা তাদের মনে ধারণা জন্মায় যে, এই ধরনের কলঙ্কের ভাগীদার হওয়াটাই তাদের ভবিতব্য। প্রশ্ন হল, এই ধরনের কলঙ্ক বা কলঙ্কের ধারণা যখন একজন পরিচর্যাকারীর জীবনধারার মানের পরিবর্তন ঘটায় এবং আত্মীয়স্বজনের প্রতি তাদের দায়দায়িত্ব পালনের উপর প্রভাব ফেলে, তখন তারা কীভাবে সেই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে।''

আরোপিত কলঙ্ক বা চাপানো বদনাম বলতে কী বোঝায়?

এটা এমন একটা রীতি যেখানে একজন মানুষের উপর আরোপিত কলঙ্কের বোঝা তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যজনদের উপরও চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই বিষয়টার বাহ্যিক দিক হল- সমাজ মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিবারের উপর কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দেয়। আবার এর অভ্যন্তরীণ দিকটি হল- মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিবারের লোকেরা বিশ্বাস করে যে মনোরোগ একধরনের সামাজিক পাপ বা অভিশাপ আর এই কারণে কালিমালেপন বা বদনাম পাওয়াটা খুবই প্রত্যাশিত ঘটনা। ডঃ টি শিবকুমারের মতে, ''সহজভাবে আত্ম-কলঙ্ক বোধ বলতে বোঝায় মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে একজন মানুষের মনের প্রচলিত ভুল ধারণা।''

এছাড়াও সামাজিক বদনামের পিছনে থাকে আরও কতগুলো সুনির্দিষ্ট কারণ।

বংশগত ধারণা এবং অহেতুক অপরাধবোধে ভোগা

  • মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের পরিবারের লোকেরা মানসিক সমস্যাকে  বংশগত বলে ভেবে নিয়ে নিজেদের মনে একপ্রকার কলঙ্কের ধারণা গড়ে তোলে। এর পিছনে থাকে মানসিক রোগ সম্পর্কে পরিচর্যাকারী এবং সমাজের যথাযথ জ্ঞানের অভাব। যদি কোনও অসুখ বংশগত হয়েও থাকে, তাহলে তার প্রভাব একজন রুগির আত্মীয়দের উপর পড়তেও পারে আবার নাও পড়তে পারে। এই নিয়ে মনোরুগিদের পরিবারের ৫২৭ জন সদস্যের উপরে একটা গবেষণা করা হয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছে, যে সব সদস্য মানসিক সমস্যাকে বংশগত বলে বিশ্বাস করেছিল তাদের মধ্যে একপ্রকার মানসিক বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে। এই গবেষণার মূল বক্তব্য হল- ''যখন মানসিক অসুস্থতাকে বংশগত রোগ বলে চিহ্নিত করা হয় তখন এই ধরনের ধারণা যারা করেন তাদের মধ্যেও মানসিক অসুস্থতার প্রকোপ লক্ষ করা যায় এবং তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ধারণারও কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। আমরা বিশ্বাস করি মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এবং কলঙ্কের ধারণা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মনে অনবরত দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আর এর থেকেই তাদের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা জন্মায়।''

  • অনেক সময়ে 'মানসিক চাপ'কে মানসিক অব্যবস্থার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। পরিচর্যাকারীরা হামেশাই মনে করেন যে মানসিক চাপের থেকে মানসিক অসুখের জন্ম হয়েছে। এই ধরনের আত্ম-কলঙ্ক বোধের সমস্যা দূর করার জন্য কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা রয়েছে। এই চিকিৎসার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সামনে মানসিক সমস্যা সম্পর্কে যথাযথ তথ্য তুলে ধরা একান্ত জরুরি।

  • যখন চিকিৎসায় একজন রুগি সাড়া দেয় এবং ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে, তখন পরিচর্যাকারীরা নিজেদের এই বলে দোষারোপ করে যে তারা যদি রুগিকে তাড়াতাড়ি মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেত তাহলে রুগি অনেক আগেই সেরে উঠত। পরিচর্যাকারীরা রোগের লক্ষণগুলো তাড়াতাড়ি বুঝতে না পারার জন্য এবং সেই কারণে রুগি কষ্ট ভোগ করেছে বলে নিজেদের অক্ষমতাকে দায়ী করে। তবে এই বিষয়ে ডঃ টি শিবকুমারের বক্তব্য হল- ''কিছু রুগির ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের লক্ষণ সঠিকভাবে চোখেই পড়ে না। আর যদি পড়েও তাহলে তা চিহ্নিত করা প্রায়শই কষ্টকর।''

এইভাবে অপরাধ বোধ এবং ভুল ধারণার থেকে যে আত্ম-কলঙ্ক বোধের জন্ম হয়, তা দূর করার জন্য একজন মনোবিদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা যেতে পারে। আর এই আলোচনার মাধ্যমেই নিজের মনের ভয় এবং সন্দেহগুলো কেটে যাওয়া সম্ভব।

জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারার জন্য হতাশা

এই পরিস্থিতি ভারতের মতো দেশে খুবই বাস্তব ঘটনা। একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি এবং তার পরিবারের সদস্যরা যখন সামাজিক মাপকাঠি যেমন- পড়াশোনা, বিয়ে এবং চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, তখন তারা সমাজের মূল স্রোত থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। এর ফলে পরিচর্যাকারীদের মধ্যে হতাশা দেখা যায় এবং এর প্রভাব তাদের কাজের উপর পড়ে।

কীভাবে একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিবারের উপর নেমে আসা বদনাম তাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়

এই ধরনের কলঙ্ক বোধের প্রধান ফল হল পরিচর্যাকারীরা নিজেদের মনের ভয় থেকে চিকিৎসা করাতে দেরি করে। তারা ভাবে যে রুগি সহ গোটা পরিবারকেই মানসিক রোগগ্রস্ত বলে চিহ্নিত করা হবে। ডঃ টি শিবকুমারের মতে, ''অনেক সময়ে পরিচর্যাকারীদের আশা থাকে যে রোগ আপনাআপনি সেরে যাবে এবং একজন মনোবিদের কাছে চিকিৎসা করাতে রুগিকে তখনই আনা হয় যখন সমস্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।''

মানসিক বিপর্যয়

একজন মানসিক রুগি এবং তার পরিচর্যাকারীর মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে সামাজিক কলঙ্কের বোঝা। এই মানসিক দুর্দশার জন্ম হয় অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা এবং সমাজ, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে। পরিচর্যাকারীর এরকম মানসিক বিপর্যয়ের সমস্যা যদি সমাধান করা না হয় তাহলে তা তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ হল, পরিচর্যাকারীরা যাতে অবিলম্বে মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের সমস্যার কথা বলে ভুলধারনা দূর করার চেষ্টা করে।

সমাজ থেকে বহিষ্কৃত এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া

সমাজ থেকে রুগির বিচ্ছিন্ন হওয়া আটকাতে পারে একজন পরিচর্যাকারী অথবা সমাজ নিজে।

অনেকসময় বদনামের ভয়ে একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিবারের লোকেরা নিজেদের সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক্ষেত্রে কিছু মানুষ যেমন সমাজের সামনে বেরতে চায় না, তেমন কয়েকজন আবার সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান যেমন- বিয়ে, পুজো প্রভৃতি থেকে নিজেদের দূরে রাখে। শুধু তাই নয়, জনসমক্ষে এই বিষয় নিয়ে আলোচনাও তারা এড়িয়ে চলে। অনেকসময় যখন পরিবারের আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে একজন মনোরুগি সেরে ওঠে, তখনও সমাজ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকার সমস্যা তাদের জীবনে থেকেই যায়।

একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন ও তার প্রতি যত্নশীল হয়ে ওঠা

কলঙ্কের বোঝা যখন একজন পরিচর্যাকারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে তখন তারা ক্রমশ নিজেকে রুগির থেকে দূরে সরিয়ে নিতে শুরু করে এবং তাকে যত্ন করাও কমিয়ে দেয়। এই বিষয়ে যে পরীক্ষার কথা আগে বলা হয়েছে তাতে গবেষকরা দেখিয়েছেন, ''বদনামের কারণে একজন পরিচর্যাকারীর মানসিক দুদর্শার শেষ থাকে না। অন্যদিকে রুগির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতাও কমে যায়। এর থেকে এটাই বলা যায় যে, সমাজ আরোপিত কলঙ্কের চাপে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিবারের লোকেরা মনের দিক থেকে রুগির কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য প্রস্তুত হয়। এ সত্ত্বেও মনোরুগিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বদনামের থেকে দূরে থাকার একটা চেষ্টা দেখা যায়।''

কলঙ্ক বা বদনাম, তার পিছনে যে কারণই থাক না কেন, সঠিক জ্ঞান ও শিক্ষার দ্বারা এর মোকাবিলা করা সম্ভব। মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এবং সেই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে যে ধরনের কলঙ্ক বা বদনামের ভয় রয়েছে, তার বিরুদ্ধাচারণ করার জন্য দরকার পরিচর্যাকারী এবং মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের একযোগে রুখে দাঁড়ানো। ডঃ জগন্নাথনের মতে, ''বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিচর্যাকারীরা এমনিতেই কঠিন অর্থনৈতিক এবং মানসিক সমস্যায় জর্জরিত। সমাজে কলঙ্ক বা বদনামের ভয় কম থাকলে এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে তারা মোকাবিলা করার সাহস পাবে।''

প্রস্তাবিত