স্বজন গোষ্ঠীর দ্বারা করা পরিচর্যার মাধ্যমে মানসিক রোগী তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারেন

রোগীকে নিজের পরিবেশে সেরে উঠতে সাহায্য করলে তিনি দ্রুত আরোগ্যলাভ করবেন এবং তাঁকে কোনও কুণ্ঠার সম্মুখীন হতে হবে না

কর্ণাটকের পাভগাড় তালুকের, মঙ্গলাভড় গ্রামের একটি ছোট্ট ঘরে ৩২-বছর-বয়সী হনুমান্থরায় অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছেন, আর তাঁকে ঘিরে রয়েছেন তাঁর প্রতিবেশিরা। শৈশবে হনুমান্থরায়ের বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা আর সাইকোসিস ধরা পড়ে। তাঁর মা লক্ষমাম্মা হল তাঁর একমাত্র পরিচর্যাকারী। লক্ষমাম্মার বয়স ৮০, এবং তিনিও অত্যন্ত ক্লান্ত। তিনি বললেন, “ওর দিকে সবসময় নজর রাখা খুব ক্লান্তিকর কাজ। ও হঠাৎ করে আশেপাশের লোকজনের উপর খুব রেগে যায়। আমি মারা গেলে ওর যত্ন কে নেবে?” লক্ষমাম্মা মঙ্গলাভড় গ্রামের প্রতিবন্ধকতা স্বনির্ভর সঙ্ঘের একজন সদস্য।  এই সঙ্ঘটি পাভগাড়ের নরেন্দ্র ফাউন্ডেশন এবং বেসিক নিড্‌স ইন্ডিয়া (বিএনআই) নামে ব্যাঙ্গালোরের একটি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তৈরি এনজিও দ্বারা নির্মিত। এই সংস্থাগুলি একসঙ্গে কমিউনিটি বা স্বজন গোষ্ঠীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মঙ্গলাভড়ের মতো গ্রামে গ্রামে মানসিক অসুস্থদের সেবা করে থাকে।

লক্ষমাম্মা যেদিন বাড়ির বাইরে যান, তিনি সঙ্ঘের অন্য সদস্যদেরকে তাঁর ছেলের যত্ন নিতে বলেন। “পরিচর্যাকারী হিসাবে ওঁনারও একা এবং ক্লান্ত লাগতে পারে। তাই আমরা ওঁনাকেও একটু বিরতি নিতে বলি আর অন্য কিছু করতে বলি। আমরা সকলে মিলে এক এক করে মানসিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যা করি,” বললেন ওই দলেরই একজন সদস্য, সতীশ। যদি তাঁর ছোটখাটো কোনও কাজ, যেমন দোকানেও যাওয়ার হয়, তাহলে সে তাঁর প্রতিবেশির কাছ থেকে সাহায্য চায়। বছরের পর বছর উন্নয়নমূলক কর্মীদের সচেতনতা অনুষ্ঠান ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিকিৎসা ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করার পর এই গ্রামের বাসিন্দারা একে অপরের সাহায্য করতে শিখেছেন। এর ফলে লক্ষমাম্মার মতো পরিচর্যাকারীদের খুব সুবিধা পেয়েছেন।

স্বজন গোষ্ঠীর দ্বারা মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা কেন প্রয়োজন

মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা শুধু ওষুধেই শেষ হয় না। আরোগ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল স্বজন গোষ্ঠীর পরিচর্যাকারীকে সাহায্য করা।  ওষুধের চিকিৎসার পরেও, একজন মানসিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পুনর্বাসনে প্রয়োজন হয় নিজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার, নিজের ও নিজের পরিবারকে সাহায্য করার এবং স্বজন গোষ্ঠীর কাজে অংশগ্রহণ করার। কোনও স্বজন গোষ্ঠী মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের মূল লক্ষ্যই হল এই চিকিৎসাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের অন্তর্গত করে অন্য সকল মানুষের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। বিএনআই এর মতো সংস্থাগুলি অন্যান্য সংস্থাদের সঙ্গে একজোট হয়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরিসেবা সব জায়গায় পৌঁছে দেবার চেষ্টা করে। স্বজন গোষ্ঠীর সদস্যরা তাঁদের সমাজে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন, নাটক, নাচ, গান ইত্যাদি আয়োজনও করা হয়।

স্বজন গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচর্যা বলতে কি বোঝায়?

এরোদ জেলার, থালভাড়ি অঞ্চলের রাস্থায় একদিন, শান্তারাম নামে একজন মনোরোগী ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। এক এনজিও’র প্রতিনিধি তাঁকে একটি চিকিৎসা ক্যাম্পে নিয়ে যান। পরিচর্যাকারীর অভাবে সেখানকার স্থানীয় থানার পুলিশই তাঁর যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নেন। একজন পুলিশ তিন মাস ধরে রোজ শান্তারামকে ওষুধ খাওয়ান। শান্তারাম সেরে ওঠেন এবং তার মনে পড়ে যায় তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন। সেই পুলিশই তাঁকে তাঁর গ্রামে পৌঁছে দেন।

(এটি একটি সত্যিকারের ঘটনা। গোপনীয়তা বজায় রাখতে নাম বদলানো হয়েছে)

স্বজন গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচর্যা বলতে আমরা বুঝি, যেখানে স্বজন গোষ্ঠীর সদস্যরা মিলে একটি রোগাক্রান্ত ব্যক্তির যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নেয়। পরিচর্যার সময় তাঁদের ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে সুরক্ষিত এবং আনন্দে রাখার ব্যাবস্থা অবধি সব করা হয়। স্বজন গোষ্ঠীর পরিচর্যাকারীদের মধ্যে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এবং পরিবারের সদস্যরা যে কেউই স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে যোগদান করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য মূলত পরিচর্যাকারীকে তাঁর কাজ থেকে একটু বিশ্রাম দেওয়া। তাঁরা যেন সবসময় মনে রাখেন যে একজন মনোবিদের পরামর্শ নিয়ে রোগীর সঠিক ভাবে চিকিৎসা করা উচিৎ। আর এটাও মনে রাখা দরকার যে একজনের চিকিৎসা পদ্ধতি অন্য জনের চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে আলাদা হতে পারে।

শহরাঞ্চলে স্বজন গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচর্যা ব্যাবস্থা কি সফল হবে?

শহরে পরিচর্যাকারীরা একজোট হয়ে সাহায্য দল খুলতে পারেন যাতে তাঁরা পরিচর্যা এবং আলোচনার মাধ্যমে একে অপরকে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু এটি এখনও সর্বত্র উপলব্ধ নয়। নিমহ্যান্সের মানসিক-সমাজসেবামূলক-কাজ বিভাগের সহ-অধ্যাপক ডাঃ এন জনার্দনের মতে, “স্বজন গোষ্ঠী গড়ে তোলার ঝোঁকটি গ্রামাঞ্চলেই বেশি দেখা যায়, যেখানকার লোকজন নিজেরাই এগিয়ে আসেন স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করতে। শহরে তা দেখা যায় না, কারণ শহরে লোকে প্রধানত আসেন কাজ করতে এবং তাঁরা তাতেই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু শহরেও যদি এরকম স্বজন গোষ্ঠী থাকতো, তবে খুব ভাল হত।”

বিশেষজ্ঞদের মতে মানসিক স্বাস্থ্যর কাজে মানুষকে অংশগ্রহণ করাতে হলে, তাঁদেরকে আগে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

পরিচর্যাকারী ও মানসিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তির সুবিধা

স্কিৎজোফ্রেনিয়া, বা বাইপোলার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির যত্ন নেওয়া একজন পরিচর্যাকারী পক্ষে খুব কষ্টকর হতে পারে। তাঁদের সবসময়ই রোগীর পাশে থাকতে হয় বলে তাঁরা অন্য কোনও জায়গায় বা অন্য কোনও কাজে যুক্ত হতে পারেন না। কিন্তু পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীদের সাহায্য নিলে এই কাজ বেশ সহজ হয়ে যায়। এর ফলে লক্ষমাম্মার মতো পরিচর্যাকারীরা অন্য জায়গায় কাজ করার সুযোগ ও সময় পান। এবং পরিবারের অর্থনৈতিক দিক থেকেও সাহায্য মেলে। ভাল সাহায্যের লোক থাকলে গ্রামাঞ্চলে প্রতিবেশীরা রোগীর দেখাশুনো করতে পারে। এর ফলে পরিচর্যাকারী বা রোগী কাউকেই একাকীত্বে ভুগতে হয় না।

একজন স্বজন গোষ্ঠীর সদস্য কি ভাবে সাহায্য করতে পারেন?

  • যদি একজন রোগী তাঁর রোগ থেকে সেরে ওঠেন, তাহলে আপনি তাঁকে তাঁর দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি খুঁজতে সাহায্য করতে পারেন।
  • একজন রোগীর চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর পরিচর্যাকারীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেতে সাহায্য করুন।
  • সরকারের কাছ থেকে তাঁদের জন্য প্রতিবন্ধিকতার সার্টিফিকেট আদায় করতে সাহায্য করুন।
  • পরিচর্যাকারীরা একাকীত্বে ভুগতে পারেন। তাঁদেরকে নিজের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে উৎসাহ দিন।

স্বজন গোষ্ঠীর সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা

যাদের নিজেদের বাড়িতে মানসিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তি রয়েছেন এমন মানুষের সঙ্গে কাজ করে ডিপ্রেশন বা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মতো নানান সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। সচেতনতা বাড়ানোর অনুষ্ঠান বা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে মানসিক অসুস্থতা ঘিরে সমাজে যে কুণ্ঠা রয়েছে, তাও দূর করা যেতে পারে। কোনও সম্প্রদায়ের মানুষজনের মধ্যে, মানসিক সুস্থতা বিষয়ক নাটক বা দেওয়াল লিখনের সাহায্যে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। ডাঃ এন জনার্দন বলছিলেন যে, “এই রকম তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে মানুষের মনে যে কুণ্ঠা রয়েছে তা মুছে ফেলা সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, “যারা মানসিক অসুস্থতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ রূপে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তারাও স্বজন গোষ্ঠীর সদস্যদের উপর একটি ভাল প্রভাব ফেলবেন।”

সূত্র:

-ইনক্লুশন অফ পিপ্‌ল উইথ মেন্টাল ইলনেস ইন স্বজন গোষ্ঠী বেসড্‌ রিহ্যাবিলাইটেশন: নিড অফ্‌ দ্য ডে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ্‌ সাইকোসোশ্যাল রিহ্যাবিলাইটেশন। ষোড়শ সংখ্যা (১) ১১৭-১২৪