অবসাদঃ আপনার বাচ্চা কী বলছে না তা শুনুন

অবসাদের মতো মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা শুধু যে পূর্ণবয়স্কদের মধ্যেই দেখা যায় তা নয়। শিশু এবং বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের মধ্যেও মানসিক অবসাদজনিত সমস্যা জন্ম নেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর 'হেলথ ফর দ্য ওয়ার্ল্ডস অ্যাডোলেসন্টস্‌' নামক প্রতিবেদনে মানসিক অবসাদকে দশ থেকে উনিশ বছর বয়সি বাচ্চা ও বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের অসুস্থতা এবং অক্ষমতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পথেঘাটে আঘাতজনিত ও এইচআইভি বা এডস-এর মতো অসুখের শিকারজনিত আত্মহত্যার পরেই অবসাদকে আত্মহত্যার মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই সংক্রান্ত গবেষণাকে এখন স্বীকৃতি দেওয়া হলেও দু'দশক আগে পর্যন্ত বাচ্চাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া কোনও মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা ছিল সম্পূর্ণ মানুষের অজানা একটি বিষয়।

সমাজ এবং স্বাস্থ্যসুরক্ষাজনিত বিশেষজ্ঞদের কাছে শিশুদের মানসিক অবসাদ অনুধাবন করা চিরকালই ছিল একপ্রকার কঠিন বিষয়। শিশুদের মধ্যে ফুটে ওঠা  অবসাদ বিষয়ক লক্ষণ এখন স্বীকৃতি পেলেও আগে এগুলোকে শিশুদের আচরণগত সমস্যা, যা ঘটনাক্রমে দূর হয়ে যাবে বলে মনে করা হত। এবিষয়কে ঘিরে বহু মিথ চালু ছিল, যেমন- অবসাদগ্রস্ততা শিশুদের ক্ষেত্রে নিতান্তই অমূলক ঘটনা; আসল অবসাদ একমাত্র বড়দের মধ্যেই দেখা দেয় এবং শিশুদের মধ্যে দেখা দেওয়া বিষণ্ণতা খুবই সাময়িক একটা পর্যায় যা অচিরেই দূর হয়ে যাবে বলে মনে করা হত।

শৈশবকালীন অবসাদ একটা বাস্তব বিষয়

বাস্তবতার দিক থেকে অবসাদ কোনও একটা পর্যায় নয় এবং বাচ্চা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবসাদ নিজে থেকে দূর হয়েও যায় না। শৈশবকালীন অবসাদ একটা বাস্তব বিষয় এবং বাচ্চার অভিভাবক হিসেবে একজনের অধিকার রয়েছে সেই সমস্যা অনুধাবন করা ও নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।

মনোরোগের চিকিৎসা শুরু করার প্রথম বছরে আমাদের কাছে একটা দশ বছরের বাচ্চা এসেছিল, যার পড়াশোনার প্রতি কোনও আগ্রহ দেখা যাচ্ছিল না। একজন  শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সুপারিশ অনুযায়ী বাচ্চাটিকে আমাদের কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। ইন্টারভিউ চলাকালীন বেশিরভাগ সময়ে বাচ্চাটি চুপ করেছিল। এসব ক্ষেত্রে আমরা কখনও কখনও পরিকল্পনামাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করি যে বাচ্চারা নিজেদেরকে কীভাবে দেখছে। এক্ষেত্রে বাচ্চাকে তার পছন্দমতো তিনটি বিষয়ের কথা বলতে বলা হয় এবং এর সাহায্যেই আমরা বাচ্চার মনের চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণার কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করি। ওই বাচ্চাটির  সঙ্গে কথা বলে তার মনের ইচ্ছের বিষয়টা আমরা জানতে পারি। সে চেয়েছিল হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার যেন কোনও বাসের সঙ্গে ধাক্কা লাগে বা এমন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যাতে তাকে আর বাড়ি ফিরতে না হয়, স্কুলে যেতে না হয় বা দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে না হয়। ভোরবেলা বাচ্চাটি বিছানা ছেড়ে উঠতেই চাইত না; জীবনে বেঁচে থাকার কোনও উদ্দেশ্যই সে দেখতে পেত না এবং কীভাবে নিজেকে শেষ করে ফেলা যায় সেই সুযোগই খুঁজত সবসময়ে।

আমরা বাচ্চাটির অভিভাবকের সঙ্গে তার সমস্যার গুরুত্ব এবং অসুস্থতার ধরন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অভিভাবকরা কিছুতেই মানতে রাজি ছিল না যে তাদের ছেলে মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে ওষুধের দ্বারা এই সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে না। সমস্যার সমাধানের জন্য বাচ্চাকে তাদের নিজেদের গ্রামের বাড়ির মন্দিরে নিয়ে গিয়ে নানারকম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হবে। কারণ সমস্যার হাত থেকে রেহাই পেতে বহু বছর ধরে তারা এসব ধর্মীয় রীতি-নীতিই পালন করে আসছে। তারা মুখে কিছু না বললেও তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে যা কিছু হয়েছে তা তাদের ভাগ্যের দোষেই ঘটেছে।

এই সমস্যার বায়োলজিক্যাল ভিত্তি বা জৈবপ্রবণতা

মানসিক অবসাদের একটা বায়োলজিক্যাল (জৈবপ্রবণতা) এবং জেনেটিক (বংশ পরম্পরাগত) ভিত্তি রয়েছে। যে সব বাচ্চার পরিবারে অবসাদের ইতিহাস রয়েছে  তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। একটা বাচ্চার মধ্যে যদি জৈবপ্রবণতাজনিত ঝুঁকি এবং পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক চাপ থাকে তাহলে সে অবসাদের শিকার হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু বাচ্চাদের মধ্যে বিষণ্ণতার এক ভিন্ন রূপ প্রকাশ পায়, যেমন- বাচ্চারা খিটখিটে হয়ে পড়ে বা তাদের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এই আচরণ বাচ্চাদের বাড়ি এবং স্কুল- দু'জায়গাতেই লক্ষ করার মতো বিষয়। অবসাদের ফলে বাড়িতে একটা বাচ্চার মধ্যে তার হবি বা শখের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়, তারা তাদের বন্ধু বা পোষ্যদের সঙ্গে খেলা করতে চায় না, অভিভাবক বা ভাই-বোনদের সঙ্গেও কথাবার্তা বলতে চায় না। স্কুলেও বাচ্চারা ঠিকমতো পড়াশোনা করে না, প্রায়শই স্কুল কামাই করে বা স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলা মানার ক্ষেত্রেও তাদের সমস্যা হয়।

যখন কারোর শরীরে বা মনে আঘাত বা ক্ষতচিহ্ন দেখা দেয় তখন মানুষ এটাই ভাবে যে ঘটনাক্রমে সেই আঘাতের বোধ ফিকে ও বিবর্ণ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, অবসাদজনিত অসুখ স্পষ্টভাবে চোখে দেখা যায় না এবং অবসাদের ক্ষেত্রে এমন কোনও রাস্তা নেই যখন কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে যে সে আগের থেকে সুস্থ আছে। এধরনের মনোভাব পূর্ণবয়স্কের চিন্তাভাবনায় ঠাঁই পেলেও বাচ্চারা এই পরিস্থিতিতে পড়ে দিশাহারা বোধ করে।

প্রত্যেক বাচ্চারই কি ওষুধের প্রয়োজন হয়?

একটা প্রশ্ন প্রায়শই আমাদের মনে দেখা দেয় যে অবসাদগ্রস্ত সব বাচ্চাদের ক্ষেত্রেই অবসাদ-বিরোধী ওষুধের প্রয়োজন হয় কিনা। এককথায় এর উত্তর হল স্বভাবত  দরকার হয় না। যেসব বাচ্চাদের অবসাদ অল্প পরিমাণে হয় এবং রোগ চিহ্নিত করা যায় সেক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াই অসুখ সারানো সম্ভব হয়। এর সঙ্গে সাইকোথেরাপির কৌশল অবলম্বন করলে সমস্যার মোকাবিলা ভালোভাবে করা যায়। মধ্যম বা গুরুতর অবসাদের সমস্যায় ওষুধের প্রয়োগ জরুরি হয়ে ওঠে।

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের চারপাশে থাকা পাঁচটা বাচ্চার মধ্যে একজন অবসাদগ্রস্ত বাচ্চা বিশেষজ্ঞের সহায়তা গ্রহণ করে। আর যেসব বাচ্চাদের শৈশবে হওয়া অবসাদের সঠিক চিকিৎসা হয় না বড় হয়ে তাদেরই গুরুতর অবসাদে আক্রান্ত  হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা 'হু'-এর আশঙ্কা যে ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষের মধ্যে অন্যান্য স্বাস্থ্যের সমস্যার থেকে অবসাদে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে।  শৈশবকালীন অবসাদের বাস্তবতা এবং সেই সংক্রান্ত মিথ সম্পর্কে বাচ্চাদের অভিভাবকদের যথাযথভাবে শিক্ষিত করে তোলা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। আর এভাবেই 'হু'-এর আশঙ্কার মোকাবিলা করা সম্ভব।

অবসাদগ্রস্ত শিশুদের সঙ্গে সুদৃঢ় যোগাযোগ গড়ে তোলা সবসময়ে সহজসাধ্য হয় না। কিন্তু অভিভাবকরা যদি তাদের বাচ্চাদের আচরণের পরিবর্তন, যা অবসাদের সঙ্গে যুক্ত, তা লক্ষ করতে পারে তাহলে বাচ্চাদের সঙ্গে কথপোকথন সম্ভব হয়। আর বাচ্চারাও জানবে যে অভিভাবকরা তাদের আচরণের বদল উপলব্ধি করতে পাচ্ছে  এবং বাচ্চা কী বলতে চাইছে তা শুনতেও অভিভাবকরা ইচ্ছুক। অবসাদের সমস্যা  সমাধানের জন্য থেরাপির ব্যবস্থা করলে সুফল পাওয়া যায়। আর বাচ্চারা যদি তাদের সমস্যা তৎক্ষণাৎ খোলাখুলি না জানায় তাহলে কালক্রমে থেরাপির সাহায্যে সমস্যার গভীরতা হ্রাস করা সম্ভব হয়।

প্রবন্ধটি লিখেছেন মাইসোরের জেএসএস হাসপাতালের মনোরোগ সংক্রান্ত বিভাগের স্নাতকোত্তরের আবাসিক ডাক্তার সুহাস চন্দ্রন।  

  

 

    

            

প্রস্তাবিত