মহিলা পরিচর্যাকারীদের উপর থেকে চাপ কমাতে আপনিও সাহায্য করতে পারেন

আমি আমার আগের প্রবন্ধে লিখেছিলাম যে পরিচর্যার ভার মহিলাদের উপর সামঞ্জস্যহীনভাবে বেশি। আমাদের কেয়ারার্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড নামক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ  থেকে করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে পরিচর্যাকারীদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ মহিলা এবং এই সংখ্যা বেড়ে ৯৩ শতাংশ হয়ে যায় অক্ষম শিশুদের পরিচর্যার ক্ষেত্রে।   

মহিলাদের উপর থেকে পরিচর্যার ভার কমানোর ক্ষেত্রে সামগ্রিক ভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন প্রয়োজন যে পরিচর্যা একটি মেয়েলি কাজ। অর্থাৎ, পরিচর্যার দায়িত্ব মহিলাদের - সমাজে এই মনোভাবের বদল জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে এমন প্রচার ও নীতি চালু করা প্রয়োজন যার মধ্য দিয়ে পরিচর্যার কাজকে ঘিরে পুরুষদের মধ্যে যে কলঙ্কের বোধ জেগে ওঠে তা দূর করা সম্ভব হয়। পরিচর্যার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পুরুষদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। তবে শুধু যে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই মহিলাদের উপর থেকে পরিচর্যাজনিত দায়িত্বের বোঝা কমানো যাবে তা নয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে বা আপনাদের এমন কয়েকটি বিষয় এখন থেকে মেনে চলতে হবে যা একজন মহিলা পরিচর্যাকারীর পক্ষে সাহায্যদায়ক হবে-

মহিলা পরিচর্যাকারীদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে: একজন পরিচর্যাকারীকে মন-প্রাণ দিয়ে পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে গিয়ে তারা নিজেদের চিন্তাভাবনা এবং সমস্যাগুলোকে তেমনভাবে গুরুত্বই দিতে পারে না। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক পরিচর্যাকারী নিজেদের মানসিক উদ্বেগ বা চাপের কথা নির্ভরযোগ্য একজন মানুষের কাছে বলে স্বস্তি পেতে চায়। পরিচর্যাকারীরা এটা আশা করে না যে ওই ব্যক্তি তাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। তারা শুধু নিজেদের সমস্যা বা চিন্তার কথা তাকে বলে মানসিকভাবে একটু হালকা হতে চায়। এবং এজন্যই তারা তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকে। এই অবস্থায় আপনাদের উচিত পরিচর্যাকারীদের পাশে থেকে তাদের কথা শোনা এবং তারা কী অবস্থায় রয়েছে তা উপলব্ধি করা। যদি তাদের ভূমিকা নিয়ে কোনও চিন্তার বিষয় থাকে তাহলে কীভাবে তা সমাধান করা সম্ভব তা খুঁজে বের করাও জরুরি।

পরিচর্যাকারীদের বিশ্রাম দিতে হবে: সম্ভব হলে পরিচর্যার দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিন। অনেক পরিচর্যাকারী সারাদিন পরিচর্যার কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে নিজেদের বিশ্রামের জন্য সামান্য সময়ও পায় না। যেসব পরিচর্যাকারীর নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য কোনও সময় থাকে না, তাদের জীবনে মানসিক চাপ জন্মানোর ঝুঁকি খুবই বেশি থাকে। এই অবস্থায় আপনি কি সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা পরিচর্যাকারীর ভূমিকা পালন করার জন্য এগিয়ে আসতে পারবেন না, যার ফলে প্রাথমিক পরিচর্যাকারী একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাবে? অথবা আপনি কি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে পারবেন না?   

পরিচর্যাকারীদের স্বাস্থ্যজনিত প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সজাগ থাকুন: পরিচর্যাকারীরা  এমন সব মানসিক ও দৈহিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে যা তাদের পরিচর্যার দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকতেও পারে আবার না-ও পারে। একটা বিষয় প্রায়শই দেখা যায়, পরিচর্যাকারীরা একা একজন অসুস্থ মানুষকে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের সমস্যাকে একেবারে অবহেলা করে। এই অবস্থায় আপনি বা আপনারা পরিচর্যাকারীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে পারেন এবং তারা যাতে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে নিজেদের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করে সে বিষয়ে তাদের উৎসাহ দিতে পারেন। যদি পরিচর্যাকারীদের নিজেদের শরীর-স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ থাকে তাহলে তারা যাদের পরিচর্যা করছে, তাদের সুস্থতার উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।   

পরিচর্যাকারীরা যাতে নিজেদের পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারে এবং সামাজিক কাজকর্মে অংশ নিতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে: এর ফলে তারা সমাজে নিজেদের একা বা বিচ্ছিন্ন বলে ভাববে না। নানারকম পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে পরিচর্যাকারীদের বোঝাতে ও জানাতে হবে যে তারা নিজেদের পরিবার এবং সামাজিক কাজকর্মে অংশ নিতে পারে। যেমন- পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো এমন জায়গায় করতে হবে যাতে পরিচর্যাকারীদের নিজেদের এবং সে যাকে পরিচর্যা করছে তাদের দু'জনের পক্ষেই সেই জায়গাটি যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক হয়। এক্ষেত্রে কি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাটা পরিচর্যাকারীর বাড়িতে করা যায়, যার ফলে পরিচর্যাকারী সহজেই সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারে? আবার অন্যদিকে, পরবর্তীকালে যদি কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান থাকে, তাহলে কি পরিবারের অন্য সদস্যরা পরিচর্যাকারীর দায়িত্ব পালন করে প্রাথমিক পরিচর্যাকারীকে সেই  সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য সুযোগ করে দিতে পারবে না?

এই পরামর্শগুলোর মধ্যে যেকোনও একটা মেনে চললে তা পরিচর্যাকারী ও রুগির  জীবনে ইতিবাচক পার্থক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং মহিলা পরিচর্যাকারীদের উপর থেকে সামঞ্জস্যহীনভাবে পরিচর্যার বোঝা কমাতেও সাহায্য করবে। তাই আমি সবাইকে এই পরামর্শগুলো মেনে চলার চেষ্টা করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছি।

প্রবন্ধটি লিখেছেন কেয়ারার্স ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা এবং কার্যনির্বাহী ডিরেক্টর ড: অনিল পাটিল এবং সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক কর্মী রুথ পাটিল। এই সংস্থাটি পারিবারিক স্তরে অবৈতনিক পরিচর্যাকারীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি নথিবদ্ধ হয় ব্রিটেনে। উন্নয়নশীল দেশের পরিচর্যাকারীদের স্বার্থ দেখাই এই সংস্থার প্রধান কাজ। আরও তথ্য জানার জন্য আপনি Carers Worldwide লগ অন করতে পারেন। তাছাড়া এই ঠিকানায় যোগাযোগ করা যাবে- columns@whiteswanfoundation.org