পরীক্ষার চাপঃ মা বাবারা কি করে সামলাবেন?

পরীক্ষার সময় বাচ্চাদের ওপর চাপ কমাতে অভিভাবকদেরও নিজেদের তৈরি করা উচিৎ।

পরীক্ষার চাপ ছাত্রছাত্রী এবং তাদের মা-বাবা উভয়ই অনুভব করেন। সামান্য প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকা ভালো, কিন্তু বাড়াবাড়ি করলেই সেটা মানসিক চাপে পরিণত হয়। মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে এই মানসিক চাপের ফলে শুধু ছাত্রদের পড়াশুনার অবনতিই ঘটে না, তাদের ভবিষ্যৎও নষ্ট হয়ে যায়।

মা বাবারা ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার সময় কি ভাবে সাহায্য করতে পারেন যাতে তাদের ওপর চাপ না সৃষ্টি হয়? এটা জানার জন্যেই হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের প্রিয়াঙ্কা মন্ত্রিপ্রাগাডা, নিমহ্যান্সের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যক্ষ ডাঃ এম মঞ্জুলার সঙ্গে কথা বলেছেন। আসুন পড়ি উনি কি বলেছেনঃ

আমি আমার বাচ্চাকে পরীক্ষা চলাকালীন কি ভাবে সাহায্য করতে পারি?
অভিভাবকদের এই সময় বাচ্চার পাশে দাঁড়ানো উচিৎ কারন বাচ্চারা পরীক্ষার চাপ অধিকাংশ সময় সামলাতে পারেনা। সেইজন্য আপনারা নিম্নলিখিত উপায়গুলো কাজে লাগাতে পারেনঃ

  • বাচ্চাকে একটা সময়তালিকা বানিয়ে দিতে পারেন।
  • পুরানো পড়া মনে রাখতে সাহায্য করুন।
  • পুষ্টিকর খাবার খেতে দিন।
  • বাচ্চা ঠিক মতো ঘুমোচ্ছে কি না সেদিকে নজর দিন।
  • তাকে বুঝতে দিন যে আপনি তার পাশে আছেন।

আমার বাচ্চা পরীক্ষার চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে কিনা সেটা আমি কি করে বুঝবো?
অভিভাবক হিসেবে বোঝা উচিৎ যে বাচ্চারা কখন চিন্তিত এবং ভীত। অনেক সময় ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে নিজের সমস্যা সম্পর্কে জানায়। বিভিন্ন রকম দুশ্চিন্তা যেমন, যথেষ্ট প্রস্ততি না থাকা, ভমিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা, মনঃসংযোগ না করতে পারা, পড়া মনে রাখতে না পারা ইত্যাদিতে তারা ভোগে। কেউ কেউ খুব বেশী ঘুমায় আর কেউ কেউ খুবই কম। আবার কারও হয়ত পরীক্ষার ঠিক আগেই পেট খারাপ হয়। কেউ কেউ এই অতিরিক্ত চাপ না নিতে পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। এইগুলি সবই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। তাই এই সময় অভিভাবকদের উচিৎ সারাক্ষন বাচ্চার পাশে থেকে তার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা। সব সময় বাচ্চার শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া উচিৎ, শুধু নম্বরের উপর না।

আমার বাচ্চা যদি রাত্রিবেলায় পড়তে চায় তাহলে আমার কি করা উচিৎ?
প্রতিটা শিশু আলাদা। কাজেই তার পড়ার সময়টা তাকেই নির্ধারন করতে দিন। মনে রাখবেন যে কৈশোরে বাচ্চারা বেশী ঘুমোতে পছন্দ করে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমি বাচ্চাকে কি করে একটি সময়তালিকা তৈরি করে দেব?
একটা বাচ্চার কতটা সাহায্য লাগবে সেটা তার ওপরেই নির্ভর করে। নীচে কিছু উপায় দেওয়া হলঃ

  • আপনি জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন যে বাচ্চার পড়া কতটা এগিয়েছে।
  • সময়তালিকা বানাতে সাহায্য করুন এবং তা পালন করতে উৎসাহ দিন।
  • চেষ্টা করুন কঠিন জিনিস খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে।
  • পড়াশুনার মাঝখানে একটু বিরতি নিতে উৎসাহ দিন।

আমার কী কী জিনিস নিয়ে মাথা ঘামানো উচিৎ নয়?
অনেকেই উচ্চ শ্রেণীতে উঠে, পড়াশুনো সম্পর্কে দায়িত্বশীল হয়ে যায়। তাদেরকে নিজের মত করে পড়তে দিন। তাদেরকে পরীক্ষার গুরুত্ব নিজে থেকে উপলব্ধি করতে দিন। সারাক্ষণ তাদের পেছনে ঘুর ঘুর করলে তারা কিছু বেশী শিখে যায় না। অনেক সময় আমি দেখেছি বাবা-মায়েরা সারাক্ষণ ছেলেমেয়েদের নিয়ে বসে থাকেন। এসব না করে বাবা মায়ের উচিৎ তাকে বলা যে যেকোনো দুশ্চিন্তা সমাধানের জন্য সে ওনাদের কাছে আসতে পারে।

আমি কি আমার বাচ্চাকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে, টিভি দেখতে বা বাইরে খেলতে যেতে দিতে পারি?
হ্যাঁ নিশ্চয়ই, কিছুক্ষণের জন্যে একটু ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে বা খেলা করলে কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু সে যদি সারাক্ষনই সেইসব নিয়ে বসে থাকে, সেই ক্ষেত্রে আপনি বলতেই পারেন। বরঞ্চ আপনি তাকে একটু হেঁটে আসতে বা গান শুনতে বলতে পারেন। এর ফলে সে তরতাজা বোধ করবে। তাকে নিজের দায়িত্ব বুঝতে দিন।

আমি নিজেকে পরীক্ষার সময় কি করে চাপমুক্ত করবো?
প্রথমে আপনাকে বুঝতে হবে যে প্রতিটা বাচ্চা একে অপরের চেয়ে আলাদা। আপনার এটাও বুঝতে হবে যে সামান্য কিছু নম্বরের চেয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কাটানো অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। লেখাপড়া জীবনের সামান্য একটা অংশমাত্র। তাই সে যা করতে ভালবাসে বা যাতে তার প্রতিভা আছে সেই বিষয়ে উৎসাহ দিন। এতে তার জীবন অনেক বেশি আনন্দময় হয়ে উঠবে।

আমি আমার বাচ্চার সাথে তার সাফল্য বা ব্যার্থতা নিয়ে কিভাবে কথা বলব?
প্রথমে আপনি সাফল্য বা ব্যার্থতা নিয়ে নিজে কি মনে করেন তা বুঝিয়ে দিন। যদি আপনার মনে হয় যে ৯০% আপনার কাছে খুব ভালো নম্বর তাহলে সে সেটাই বিশ্বাস করবে। তাই যদি সে ৮৫% পায়, তাদের মনে হবে সে তার মা বাবাকে খুশি করতে পারেনি। অভিভাবক হিসেবে আপনার সব সময় চেষ্টা হওয়া উচিৎ যাতে আপনার সন্তান একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠে।

তাদের কে নিজের প্রতি সততা বজায় রেখে চলতে, নিজের ওপর ভরসা করতে বেশি করে শেখানো উচিৎ। আর এগুলো নিয়েই আলোচনা করা উচিৎ। আপনার খেয়াল রাখা উচিৎ যে আপনার কথায় যেন সব সময় সাফল্যই প্রাধান্য না পায়। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন যে বেশীরভাগ সময় আপনার বাচ্চার সাথে কী নিয়ে কথা হয়? যদি আপনার মনে হয় বেঠিক কিছু নিয়ে কথা হয় তাহলে আলোচনার বিষয় বদলে ফেলুন।