আত্মহত্যা বিষয়ক সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ

আত্মহত্যার চিন্তা কি খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়?

আত্মহত্যার চিন্তা করা অদ্ভুত বা বিরল বিষয় নয়। অধিকাংশ মানুষের জীবনে যখন  মানসিক বা অনুভূতিগত দিক থেকে নানা সমস্যা গভীর হয়ে দেখা দেয় তখন মানুষ ক্লান্ত, অবসন্ন ও শোচনীয় অবস্থার মুখোমুখি হয় এবং এসবের হাত থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে চায়। এসময়ে একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা থাকুক বা না-থাকুক, তার মনে নিজের জীবনের সবকিছু শেষ করে দেওয়ার চিন্তা খুব দ্রুত দানা বাঁধে। যখন এই চিন্তা একজন মানুষের মনে বারবার ঘুরে-ফিরে আসে, চিন্তা প্রবল হয়ে ওঠে এবং তার প্রভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনে পড়ে তখনই তা আমাদের  কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কাদের মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দেয়?

যে কোনও বয়স, ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য, রুচি-শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থানের মানুষের মনে আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে এমন কয়েকটি বিষয় থাকে যা একজন মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। বিষয়গুলো হল- মানসিক অসুস্থতা, মনের একাকিত্ব এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপের প্রভাব। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি এবং এই বয়সি পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে আত্মহত্যা করার ঝুঁকি প্রবল থাকে। তবে অন্যান্য বয়সের মানুষও যে আত্মহত্যা করে না তা নয়।

মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরাই কি আত্মহত্যা করে?

যেসব মানুষ আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে তাদের সবার মধ্যেই যে  মানসিক অসুস্থতা থাকে তা নয়। অথবা সব মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের মধ্যেই যে আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকে তা-ও নয়। বিভিন্ন জৈবিক, মানসিক এবং সামাজিক কারণের ফলে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যা করার ঝুঁকি জন্মায়। আত্মহত্যা একপ্রকার  জটিল ঘটনা, যা বহু উপাদান বা কারণ মিলিত হওয়ার ফলে ঘটে। এসব কারণের মধ্যে মানসিক অসুস্থতা থাকতেও পারে আবার না-ও থাকতে পারে। যদি কেউ গভীর মানসিক যন্ত্রণা বা বেদনার জন্য আত্মহত্যা করে তার মানে এটা নয় যে সেই ব্যক্তি মানসিকভাবে অসুস্থ।

আত্মহত্যার পদক্ষেপ কি মানুষের দুর্বলতা বা সমস্যার মোকাবিলা করতে অক্ষম হওয়ার চিহ্ন?

একটা প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যে আত্মহত্যা একজন মানুষের  দুর্বলতার পরিচয় বা জীবনের নানারকম বাধার মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তার সাহসের অভাব। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাছে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া আর অন্য কোনও সহজ উপায় থাকে না। আত্মহত্যার পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে, যেমন- জৈবিক, মানসিক এবং সামাজিক। আত্মহত্যার চিন্তা  সাধারণভাবে মানুষের মনের চরম দুর্দশার লক্ষণ এবং এজন্য একজন ব্যক্তির চরিত্র যতই শক্তিশালী বা কঠিন হোক না কেন এসময়ে সে দিশাহারা হয়ে পড়ে।

কিন্তু কেন তারা অন্যদের কাছ থেকে সাহায্য নেয় না?

যে ব্যক্তির মনে আত্মহত্যা করার চিন্তা জেগে ওঠে তার পিছনে থাকে তাদের একাকিত্ব, অসহায়তা এবং হতাশা। আর এসব সমস্যার কারণেই তারা অন্যদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে চায় না। তাদের সম্পর্কে অন্যরা কী মতামত দেবে সে বিষয় নিয়েও তাদের মনে ভয় থাকে। তারা তাদের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রায়শই এমন আচরণ করে যা থেকে সহজে মনে হয় না যে তারা অন্যদের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য আকুল হয়ে পড়েছে, যেমন- নিজের পছন্দের বা শখের কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া, দৈনন্দিন কাজকর্ম, পরিবার বা বন্ধুদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা, হঠাৎ করে নেশার বস্তুর প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠা বা তাদের পরিচিত মানুষের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে ঘোরানো-প্যাঁচানো কথাবার্তা বলে। কিছু আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি তাদের খুব কাছের মানুষের থেকেও সাহায্য নিতে চায় না, কারণ তারা দুশ্চিন্তা করে ওই কাছের মানুষটি তাদের সম্পর্কে কী ভাববে বা তাদের মনে ভয় থাকে যে যার কাছে তারা সাহায্যের জন্য যাবে সে হয়তো বুঝবেই না যে তারা কী অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। আমাদের সমাজে আত্মহত্যা এবং মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে যে ভুল ধারণা এবং কলঙ্কের বোধ রয়েছে তার ফলেই আত্মহত্যাকারী অন্যদের বা তার কাছের মানুষের থেকে কোনওরকম সাহায্য নিতে চায় না।

একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের মধ্যে আত্মত্যার ঝুঁকি থাকে কি?

মেজাজ-মর্জিগত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ, যেমন- যারা অবসাদগ্রস্ত হয় তারা  জৈবিকভাবে অন্যদের তুলনায় বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে সামাজিক উপাদানও যুক্ত থাকে। যদি একজন মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয় তাহলে তার পরিবারের মানুষজনকে খুবই স্নেহ-ভালোবাসাপ্রবণ এবং সাহায্যকারী হওয়া জরুরি।  এছাড়া তার কর্মক্ষেত্র বা গোষ্ঠীতে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং তাকে সহায়তা করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এর ফলে তারা তাদের মানসিক দুর্দশার সময়ে অন্যদের কাছ থেকে যথাযথ সাহায্য পাবে ও দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে পারবে। তাই মানসিক অসুস্থতাকে (বা না-থাকুক) আত্মহত্যার জন্য একমাত্র উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

যদি কেউ নিজের ক্ষতি করতে চায় তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে তার মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি রয়েছে?

যখন কোনও মানুষ আত্মহত্যার চিন্তা করে তখন সে নিজের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। কিন্তু যেসব মানুষ নিজেকে কষ্ট দিতে চায় বা নিজের ক্ষতি করতে চায় তাদের সবার মধ্যেই যে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে, তা নয়।  ডিএসএম-৫-এর নতুন বৈশিষ্ট্য হিসেবে সারা পৃথিবীতে এখন ননসুইসাইডাল সেলফ্‌ ইনজুরি ডিসঅর্ডার (এনএসএসআই) নামে একপ্রকার মানসিক সমস্যার কথা জানা গিয়েছে। এই সমস্যায় নিজের ক্ষতি করা বা সবকিছু শেষ করে দেওয়ার বদলে সমস্যার মোকাবিলা বা মনের ক্ষোভ প্রকাশের একটা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে মানুষ একমাস বা একবছর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করে না। অর্থাৎ নিজের ক্ষতি করাকে আত্মহত্যার একটা বিপজ্জনক কারণ হিসেবে বলা চলে এবং এই বিষয়টিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

ইংরেজিতে “কেউ আত্মহত্যা করেছে” – এটা বোঝানোর জন্য বলা হয় যে “সুইসাইড কমিট” করেছে। এই ক্ষেত্রে কমিট কথাটি কি উপযুক্ত?

ইংরেজিতে 'কমিট' শব্দটি আইনবিরুদ্ধ কোনও কাজ বা প্রচলিত ভাবধারা অথবা  নৈতিকতার বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই শব্দটি যখন আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় (অনেকসময় অসাবধানতাবশত) তখন তা বিদ্যমান কলঙ্কের ভয়ে দোষারোপ করা এবং ভুল বোঝাবুঝিজনিত একটা ঘটনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কলঙ্কে বোধই মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয় এবং তাকে অন্যদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছু হঠতে বাধ্য করে। যদি আত্মহত্যার অর্থকে ভুল বা অনৈতিক হিসেবে প্রকাশ না করা হয় তাহলে তা মানুষের মনের  কলঙ্কের বোধকে কমাতে সাহায্য করবে। 'তাদের জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা' এবং 'নিজের জীবন নিয়ে নেওয়া' বা 'আত্মহত্যা করে মারা যাওয়া'- এই কথাগুলো আত্মহত্যার ঘটনাকে অনেক বেশি সহানুভূতি সহকারে বর্ণনা করে। 

এই প্রবন্ধটি লিখতে সাহায্য করেছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডঃ দিব্যা কান্নান; ফর্টিস হেলথকেয়ারের কনসালট্যান্ট ক্লিনিক্যাল  সাইকোলজিস্ট প্রধান কামনা ছিব্বর; দ্য অল্টারনেটিভ স্টোরির  কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট পারাস শর্মা; এবং দি টকিং ক্যাম্পাস-এর সাইকোথেরাপিস্ট সেহেরাজাদি সঞ্চিতা সিওভান।