পরিচর্যাকারীকে আপনি কি ভাবে সাহায্য করতে পারেন

একজন পরিচর্যাকারীকে সাহায্য করতে চাওয়া মানে তাঁর কাঁধ থেকে অনেকটা ভার নামিয়ে নেওয়া।

পরিনীতা দুরারোগ্য স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন কারণ তাঁদের বিয়ের সময় এই রোগটির কথা গোপন করা হয়েছিল। পরিনীতার মা, যিনি একটি জামা কাপড়ের কারখানায় কাজ করেন, তিনিই পরিনীতার একমাত্র পরিচর্যাকারী। যদি, পরিনীতার মা পরিনীতাকে নিয়ে স্বাস্থকেন্দ্রে চিকিৎসা করাতে যান, তাহলে সেদিনের তাঁর রোজগার বন্ধ থাকেসেই ক্ষেত্রে শ্যামলা নামে তার এক বন্ধু তাঁকে সাহায্য করেন। শ্যামলা পরিণীতাকে প্রতিবন্ধী শংসাপত্র পেতে সাহায্য করার পাশাপাশি ডিভোর্সের আইনি ঝামেলাগুলিও সামলাতে সাহায্য করেন

(এটি একটি মনোবিদের কাছে শোনা সত্য ঘটনা। গোপনীয়তা বজায় রাখতে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।)

এই ঘটনাটির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কিভাবে একজন বন্ধু একজন পরিচর্যাকারীকে পরিচর্যা করার কঠিন দায়িত্ব থেকে বিশ্রাম দিতে পারেন। দুর্ভাগ্যবশত পরিনীতার মায়ের মতো সকলে সাহায্যের হাত খুঁজে পান না। তাঁরা মানসিক রুগীর শুশ্রূষা করার পাশাপাশি নিজের দৈনন্দিন কাজ, চাকরি, পড়াশুনা, ঘরের কাজও করে থাকেন। দিনের বেশির ভাগ সময়ই অন্যের যত্ন নেওয়ার পেছনে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে নিজের যত্ন নেওয়ার সময় থাকে না। এর ফলে তাঁদের উপরে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এই বাড়তি চাপের জন্য তাঁরা পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও বন্ধুবান্ধবদের সাহায্য নিতে পারেন।

পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সাহায্য

একটি যৌথ পরিবারে একজন পরিচর্যাকারী পরিবারের অন্য সকল সদস্যবৃন্দের কাছ থেকে সাহায্য পেতে পারেন। কিন্তু এখন, শহরাঞ্চলে এরকম পরিবার আর দেখা যায় না। এখন অণু পরিবারের যুগ। সেই ক্ষেত্রে একজন পরিচর্যাকারী খুব অল্প সাহায্য পান। সেইক্ষেত্রে পরিবারে অন্য একজন ব্যক্তি তাঁকে সাহায্য করতে পারেন। ধরে নিন একটি পরিবারে একজন মা, বাবা, মেয়ে রয়েছে এবং একটা ছোট ছেলে রয়েছে যে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে। তখন সেই পরিবারে মা হন তার মূল পরিচর্যাকারী। এক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যেরা কেউ তাঁকে সাহায্য নাও করতে পারেন। ফলে সময়ের সাথে সেই মায়ের পক্ষে ছেলের যত্ন নেওয়া খুব কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বাড়ির অন্য সদস্যদের তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁকে সাহায্য করতে হবে। তাঁরা সকাল বিকালের বিভিন্ন কাজ একে অপরের সঙ্গে আদান প্রদান করে নিতে পারেন।

আত্মীয় বা বন্ধু হিসাবে সাহায্য

আপনার কোনও আত্মীয় বা বন্ধু যদি একজন পরিচর্যাকারী হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তাঁকে বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করতে পারেনঃ 

  • তাঁদের চাকরি পেতে সাহায্য করুন:যাঁদের বাইপোলার রোগের মতো মানসিক অসুস্থতা রয়েছে, তাঁদের কর্মক্ষেত্রে অনেক লম্বা সময়ের জন্য বিরতি থাকতে পারে। এই সময় পরিবারের কোনও এক সদস্য এগিয়ে এসে তাকে চাকরি খুঁজতে সাহায্য করতে পারেন। এর ফলে পরিচর্যাকারীরও একটু সাহায্য হবে।
  • মানসিক অসুস্থতার প্রতি সহানুভূতি:মানসিক অসুস্থ রোগী বা তাঁর পরিচর্যাকারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হলে তাঁদের মনে হয় যে তাঁরা নিজেরাও সমাজের অন্তর্গত। এতে তাঁরা একাকীত্ব কাটিয়ে উঠতে পারেন এবং মানসিক রোগ সংক্রান্ত কুণ্ঠাগুলিও কাটিয়ে উঠতে পারেন। “অন্ধ মানুষজনের প্রতি মানুষ খুব সহানুভূতিশীল হন কারণ তাঁর প্রতিবন্ধকতা সবাই চোখে দেখতে পান। যেহেতু, অনেকেই মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে পরিষ্কার ভাবে বোঝেন না, তাই তারা বিষয়টিকে হাল্কা ভাবে নেন। ফলে অনেকেই মনোরোগীদের প্রতি কম সহানুভূতিশীল হন। কিন্তু যদি তাঁরা এই ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হন, তাহলে মনোরোগের চিকিৎসা আরও ভাল ভাবে করা যাবে,” এমনটাই মনে করেন নিমহ্যান্সের সহ-অধ্যাপক ডাঃ কৃষ্ণ প্রসাদ।
  • তাঁদের সঙ্গে হাসপাতালে যান:যদি আপনার হাতে সময় থাকে তাহলে আপনি রোগীর সঙ্গে তাঁর নিয়মিত চেক-আপ করাতে হাসপাতালে যান। তাহলে একজন পরিচর্যাকারীর উপর থেকে একটু হলেও দায়িত্ব কমবে।  
  • তাঁদের কথা শুনুনঃবিনা বিচার করেই একজন পরিচর্যাকারীর কথা শুনুন। এতে তাঁরা নিজেদের মনের কথা খুলে বলতে পারবেন।
  • অসুস্থতা বাদে অন্য বিষয়ে কথা বলুন:মানসিক অসুস্থতা একজন রোগী বা একজন পরিচর্যাকারীর জন্য খুব কষ্টকর হতে পারে। তাই এই বিষয়ে কথা বলা কমানোর চেষ্টা করুন। আর পাঁচ জন লোকের সঙ্গে যেভাবে কথা বলবেন, তাঁদের সঙ্গেও সে ভাবেই কথা বলার চেষ্টা করুন। নিমহ্যান্সের সহ অধ্যাপিকা ডঃ আরতি জগন্নাথনের কথায়, “আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে সবসময় গল্প করব, আমি তাঁদের আমার সন্তানের জন্মদিনে আসার নিমন্ত্রণ জানাবো, তাঁদের সঙ্গে কেনাকাটি করতে যাব, এই কারণে সেই ব্যক্তির এবং তাঁর পরিচর্যাকারীর চাপমুক্ত লাগবে।”

আপনি আপনার জীবন ও কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেই পারেন, তবুও আপনি যদি আপনার কোনও পরিচর্যাকারী বন্ধু বা আত্মীয়কে সাহায্য করতে পারেন, তাহলে তাঁরও চাপমুক্ত লাগবে আর আপনারও ভাল লাগবে।