কীভাবে আমি আমার সঙ্গীকে নিজের অবসাদের কথা বলব?

ভারতে প্রতি ছ'জন মানুষের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। এই অবসাদের জন্য মানুষের পারস্পরিক সুসম্পর্ক নষ্ট হয় এবং তার ফলে মানুষের মনে এমন গভীর প্রভাব পড়ে তা থেকে অবসাদের সমস্যা আরও প্রবল আকার ধারণ করে। মজবুত ও স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের সাহায্যে অবসাদের লক্ষণগুলোর  মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, অবসাদের ফলে মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের পরিপূর্ণতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না ও পারস্পরিক সহযোগিতারও অভাব দেখা যায়। একজন ব্যক্তির সঙ্গী বা ভবিষ্যতের সঙ্গী হিসেবে অবসাদের বিষয়ে আপনার/আপনাদের মনে নীচের প্রশ্নগুলি জাগতে পারে:

প্রশ্ন- আমি যে মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছি তা কীভাবে আমার সঙ্গীকে জানাব?

উত্তর- সঙ্গীকে নিজের মানসিক অবসাদের কথা জানানো একটু কঠিন কাজ বলে মনে হলেও, নিজে সৎ থাকার জন্য তা সরাসরি তাকে জানিয়ে দেওয়াই ভালো। যখন আপনি বা আপনারা বুঝবেন যে আপনাদের মনে একটা অস্বস্তিকর অনুভূতির বোধ জাগছে এবং তা দূর করার জন্য অন্যের সাহায্য প্রয়োজন তখন সঙ্গীকে সেকথা জানানো জরুরি বা যখন বুঝবেন যে আপনি একটা অসুবিধা বোধ করছেন এবং সেকারণে সঙ্গীর সাহায্য আপনার দরকার, তখন আপনি সরাসরি সঙ্গীর কাছে নিজের অবসাদের কথা খুলে বলুন। অবসাদের ফলে মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেগুলো আপনাদের সঙ্গীর চোখে ধরা পড়তেই পারে। তাই পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে চলেছে সে বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত  করার জন্য অবশ্যই খোলাখুলি আলোচনা করা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে সঙ্গীর সামনে বসুন এবং কীভাবে তার কাছে থেকে আপনি সাহায্য পেতে পারেন তা নিয়ে কথাবার্তা বলুন। সঙ্গীর সঙ্গে বারবার নানারকম কথাবার্তার মধ্য দিয়ে আপনারা এমনসব তথ্য পেতে পারেন যা অবসাদ দূর করার ক্ষেত্রে আপনাদের দু'জনকেই সাহায্য করতে পারে।

প্রশ্ন- আমার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবসাদের সমস্যা রয়েছে এবং তাই আমি সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ভয় পাচ্ছি। এখন আমার কী করা উচিত?

উত্তর-অনেক মানুষের মনেই সম্পর্কের টানাপোড়েনজনিত নানারকম ভয় থাকে। এমনকী যদি তাদের অবসাদের সমস্যা না-ও থাকে তবুও তাদের মনে সেই ভয় চেপে বসে। এক্ষেত্রে গুরুতপূর্ণ হল স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ার সম্ভাবনাকে বুঝতে পারা ও তা নিশ্চিত করা। যদি দেখা যায় যে মানুষ তাদের পারস্পরিক চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা, আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলোকে মূল্য দিচ্ছে, সম্মান করছে তাহলে মানসিক অবসাদ কিন্তু তাদের মধ্যে কোনও বিভেদ ডেকে আনতে পারবে না। এরপরেও কিন্তু আপনার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ও তার মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অনেক বাধা আসতেই পারে। কিন্তু তার জন্য আপনার সঙ্গীর সঙ্গে গড়ে ওঠা  সুসম্পর্ক ভেঙে যাবে, তা নয়। যদিও পারস্পরিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আপনারা দু'জনেই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন এবং অবসাদের সমস্যাটিও গভীর হয়ে দেখা দিতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে আত্ম-সচেতনতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার সাহায্যে স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠা অবশ্যই সম্ভব।

প্রশ্ন- একে অপরের সঙ্গে মনোমালিন্য না করে কীভাবে আমি আমাদের মধ্যেকার  সুসম্পর্ক বজায় রাখব?

উত্তর- অবসাদগ্রস্ত হওয়ার কারণে আপনি হয়তো সবসময়ে আপনার আবেগ-অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। সেজন্য সঙ্গীর সঙ্গে এমনভাবে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে যাতে তাকে আপনি খোলাখুলি বলতে পারেন যে আপনার ঠিক কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আপনি এভাবে বলতে পারেন- ''আমি তোমার উপরে রাগ করিনি, শুধু আজ আমি একটু বিষণ্ণ বোধ করছি'', ''এখন আমার মেজাজ ভালো নেই এবং মেজাজ ভালো করতে আমার একটু সময় দরকার, তখন আমি তোমার কাছে আসব'', ''এই মুহূর্তে একটু বিষণ্ণ লাগছে কিন্তু তা বলার মতো কিছু নয়''- আপনার সঙ্গী যাতে আপনাকে একটু সময় দেয় তা দেখতে হবে। কিন্তু এর জন্য পরস্পরকে দোষ দিলে চলবে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে  ভালো হয় যদি আপনি আপনার প্রয়োজনীয়তার কথা আপনার সঙ্গীকে বলতে পারেন; তবে সঙ্গী যে আপনার সব সমস্যা বুঝতে পারবে তা কিন্তু আপনি আশা করবেন না। এই পরিস্থিতিটা আপনার সঙ্গীর পক্ষেও মেনে নেওয়া খুব কঠিন এবং এই পরিস্থিতিতে এই বিষয়টি নিয়ে আপনাদের দু'জনের মধ্যে বারবার কথা বলার  প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজে থেকে নিজের অবসাদকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু আপনার সঙ্গী যদি দেখেন যে আপনার নেওয়া কোনও ব্যবস্থাই কার্যকরী ফল দিচ্ছে না তাহলে তার মধ্যে হতাশা দেখা দিতে পারে। তখন আপনার উচিত তার সঙ্গে কথা বলে তার হতাশা দূর করা এবং আপনার চেষ্টা যে একসময়ে সফল হবে সেবিষয়ে তাকে বোঝানো।

প্রশ্ন- আমার অবসাদের জন্য আমি আমার সঙ্গীর সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করে দিতে চাই। এক্ষেত্রে আমার কী করা উচিত?

উত্তর-এই ধরনের সিদ্ধান্ত সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে পারস্পরিক মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। অবসাদের ফলেই  সম্পর্কের মধ্যে হতাশা দেখা দিতে পারে। তাই এইসময়ে আপনার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীও দেখা দিতে পারে। তাই অবসাদ চলাকালীন মধ্যবর্তী  পর্যায়ে এইধরনের সিদ্ধান্ত জিইয়ে রাখা ভালো নয়। পরে যখন আপনার অবস্থার উন্নতি হবে তখন পারস্পরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি মনে হয় যে দু'জনের মধ্যে সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না তাহলে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করতে হবে যে এই পরিস্থিতি থেকে বেরনোর জন্য সে কী ভাবছে? সে কী করতে চাইছে? এমন হতে পারে যে আপনার সঙ্গী হয়তো বুঝতে পারবে যে এই পরিস্থিতি নিতান্তই সাময়িক এবং সময় দিলে এই খারাপ পরিস্থিতি কেটে যাবে ও ভাল সময় আসবে। কারণ সময়ের  আপেক্ষিকতার বিচারেই এই পরিস্থিতিকে বিচার করা ভালো।

এই প্রসঙ্গে ডঃ রত্না আইস্যাক বলেছেন, ''অবসাদ বা অন্য যে কোনও সমস্যা আপনাকে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলার থেকে বিরত করতে পারে না। একটা স্বাস্থ্যকর ও শক্তিশালী সম্পর্কই পারে অবসাদের মতো সমস্যাকে অতিক্রম করতে।'' এই কথাটি আপনাকে ও আপনার সঙ্গী দু'জনকেই মনে রাখতে হবে। তাহলে একে অপরের প্রতি দয়ালু হয়ে তারা অবসাদের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে এবং সেই সঙ্গে দু'জনের মধ্যে একটা সুস্থ-সবল সম্পর্কও গড়ে উঠবে।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডঃ রত্না আইস্যাকের কাছ থেকে মূল্যবান তথ্য নেওয়া হয়েছে।