আমি খুব বদমেজাজি এবং খিটখিটে হয়ে যাচ্ছি- এর জন্য কি হরমোনের প্রভাব দায়ী?

ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন, খিটখিটে ভাব, বদমেজাজ বা খামখেয়ালিপনা- মহিলাদের মধ্যে এই ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে মূলত হরমোন বা পিএমএস-এর প্রভাব দায়ী। আমরা জানি যে আমাদের আচরণের উপর হরমোনের প্রভাব রয়েছে এবং হরমোনের জন্যই আমরা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কিন্তু হরমোনের প্রভাবের সঙ্গে আমাদের আচরণের যোগসূত্র ঠিক কী? হরমোনের সঙ্গে আমাদের মানসিক সুস্থতা বা আবেগপ্রবণতার সম্পর্কই বা কী?

হরমোন বলতে কী বোঝায়?

হরমোন হল একধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা আমাদের মস্তিষ্ক থেকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বার্তা পাঠাতে সাহায্য করে। এর সাহায্যে বিভিন্ন অঙ্গের কাজ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তাদের সুস্থতা বজায় থাকে। হরমোন হল এমন এক বস্তু যা মানুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোষগুলোকে ঠিকঠাক কাজ করতে সাহায্য করে। হরমোন মানবদেহের মৌলিক কার্যকলাপ, যেমন- খাওয়াদাওয়া, ঘুম প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেমন- যৌন আকাঙ্ক্ষা, প্রজনন ক্ষমতার ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। এর সঙ্গে হরমোন আমাদের অনুভূতি এবং মেজাজ-মর্জিও নিয়ন্ত্রণ করে।

মানুষের শরীরে হরমোন কোথায় উৎপন্ন হয়?

মানুষের এন্ডোক্রিন গ্রন্থি হরমোন উৎপন্ন করে। বিভিন্ন গ্রন্থি নিয়ে এন্ডোক্রিন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। প্রত্যেকটি গ্রন্থির আলাদা-আলাদা কাজ রয়েছে। যেমন- পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে যে হরমোন নিঃসৃত হয় তা আমাদের সার্বিক বিকাশে সাহায্য করে; প্যানক্রিয়াস গ্রন্থিতে যে ইনসুলিন হরমোন উৎপন্ন হয় তা আমাদের রক্তে সুগারের পরিমাপ নিয়ন্ত্রণ করে; মহিলাদের ক্ষেত্রে ওভারি এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টিস নামক গ্রন্থি থেকে মানুষের যৌন হরমোন নিঃসৃত হয়। প্রত্যেক গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হরমোন রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

হরমোন কীভাবে মানুষের আবেগ বা অনুভূতির উপর প্রভাব ফেলে?

মহিলাদের দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন হরমোন রয়েছে, যা তাদের সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা এবং ঋতুচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই হরমোন দুটো হল- ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন। এছাড়াও আরও অনেক হরমোন রয়েছে যার সাহায্য আমাদের দেহের বিভিন্ন রাসায়নিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয়। যখন এক বা একাধিক হরমোন মানুষের শরীরে বেশি সময় ধরে কাজ করে (যেমন- মানুষের প্রজনন হরমোন মানুষের শরীরে একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করে), তখন মস্তিষ্ক সেই ক্ষতিপূরণ করে আরও কয়েকটি হরমোন উৎপন্ন করে। যেমন- সেরোটোনিন এবং এন্ডোরফিন, যা আমাদের অনুভূতি বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে।

মানুষের জীবদ্দশায় এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা মানসিক চাপ বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন- বয়ঃসন্ধির সময়ে প্রিয়জনের প্রত্যাশা এবং নিজের যৌনতা সম্পর্কে মানুষের মনে নানা সন্দেহ জাগে; মাতৃত্বের সময়ে মহিলাদের মনে নিজের সন্তানের বিষয়ে চিন্তাভাবনা জাগে এবং নিজের কাজ ও দায়িত্বের প্রতি ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মানুষ অতিরিক্ত ওয়াকিবহাল হয়ে ওঠে। হরমোনের পরিবর্তন এবং মানসিক চাপ মানুষের আবেগ-অনুভূতির উপর কুপ্রভাব ফেলে, মানুষ তার নিজের অনুভূতির উপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এমনকী, এসব ঘটনার ফলে মানসিক অসুস্থতাও দেখা যায়।

কিশোর-কিশোরীরা কেন অভিমানী, মেজাজি এবং হঠকারী হয়?

বয়ঃসন্ধির সময়ে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসৃত হয়। এই সময়ে এই হরমোনের তারতম্যের ফলে মেয়েরা খুব বিষণ্ণ ও অধীর হয়ে পড়ে। বয়ঃসন্ধির সময়ে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটতে থাকে; অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে হঠকারিতা নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তি থাকে না। তাই বয়ঃসন্ধিকালে ঘটা হরমোনের পরিবর্তন ও তারতম্যের ফলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়।

বয়ঃসন্ধির সময়ে হরমোনের তারতম্য ও অন্যান্য কারণ অল্পবয়সি মেয়েদের মনের চাপ ক্রমশ বাড়াতে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে-

  • ঋতুচক্র সম্পর্কে মানসিক জটিলতা
  • ঋতুচক্রের অনিয়মঃ অল্পবয়সি মেয়েদের মধ্যে মাসিকের পরিমাণ কম হওয়ার জন্য তাদের মানসিক চাপ বাড়ে
  • স্তনের বিকাশ, শরীরে লোমের আধিক্য, দেহের সম্ভাব্য ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, ব্রণ প্রভৃতি কারণে শারীরিক ভাবমূর্তিজনিত সমস্যা দেখা দেয়
  • যৌনতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিপরীত বা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে; এই কারণে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ দেখা যায় বা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে তাদের মেয়েদের মধ্যে কোনও প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নানারকম বাধার সৃষ্টি হয়।

মাসিক শুরু হওয়ার আগে আমি কেন বদমেজাজি হয়ে উঠি? এটা কি পিএমএস-এর জন্য হয়?

বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে মেনোপজ পর্যন্ত মহিলাদের ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট কতগুলো হরমোন। প্রতিটি মাসিকের সময়ে তিনটি হরমোন, যেমন- ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন এবং টেস্টোস্টেরন-এর একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে তারতম্য লক্ষ করা যায়। প্রথম দু'সপ্তাহে ইস্ট্রোজেনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে শারীরিক শক্তি ও মেজাজের উন্নতি হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহে টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়ার ফলে মেজাজ ভালো থাকে ও কামশক্তি বা যৌনতাড়না সক্রিয় হয়। তৃতীয় সপ্তাহে প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেড়ে যায় (ইস্ট্রোজেন কমে যায়)। ফলে আলস্য দেখা যায়। কিছু মহিলার মধ্যে এইসময়ে বিষণ্ণ ভাব দেখা দেয়। চতুর্থ সপ্তাহে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে গায়ে ব্যথা, খিটখিটে ভাব এবং মেজাজের বদল ঘটে। অর্থাৎ, প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে মহিলারা উদ্যমী হয়ে ওঠে।

প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (পিএমএস) হল সেই লক্ষণ যা একজন মহিলার মাসিকের সময়ে দেখা যায়। অনেক মহিলা ক্লান্ত বোধ করে, খিটেখিটে বা অধৈর্য হয়ে ওঠে। তারা কোনওরকম মানসিক চাপ সহ্য করতে পারে না। কিন্তু একবার মাসিক শুরু হলে এই অস্বস্তিগুলো আস্তে আস্তে চলে যায়। তবে অধিকাংশ মহিলার মধ্যে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিশ্রাম, ভালো খাওয়াদাওয়া মহিলাদের পিএমএস নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

খুব কম সংখ্যক মহিলার মধ্যে প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (পিএমডিডি) দেখা যায়। একজন পিএমডিডি-তে আক্রান্ত মহিলার মধ্যে তার মাসিক শুরু হওয়ার আগে নীচের অবসাদজনিত লক্ষণগুলো দেখা যায়-

  • খুব বেশী অস্বস্তি বোধ করা
  • খুব বিষণ্ণ বা অধীর হয়ে ওঠা, কথাবার্তা বলতে ভালো লাগে না
  • নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত না করতে পারা বা এর ফলে মুষড়ে পড়া
  • গায়ে খুব ব্যথা হওয়া
  • কিছু মহিলার মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা জেগে ওঠে

পিএমডিডি-তে অত্যন্ত অল্প সংখ্যক মহিলা আক্রান্ত হয়। যদি কোনও মহিলা মনে করে যে প্রি-মেনস্ট্রুয়াল বিপর্যয়ের মোকাবিলা করবে তাহলে সে তার নিজের পছন্দমতো কাজ করতে পারে, যেমন- বাইরে কাজে যাওয়া, মিটিং-এ যোগ দেওয়া, নির্দিষ্ট কোনও কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা প্রভৃতি। নিজের শারীরিক অবস্থান নিয়ে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তিনি কয়েকমাস ধরে একজন মহিলার মেজাজ কেমন যাচ্ছে সে বিষয়ে লক্ষ রাখার সুপারিশ করতে পারেন এবং ঋতুচক্রের সময়ে প্রতিদিন তার মেজাজ কেমন যাচ্ছে সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে পারেন। এর ফলে মাসিকের সঙ্গে মহিলাদের মেজাজ-মর্জির পরিবর্তনের যোগসূত্র ধরতে পারা যায় এবং সেই সমস্যার সমাধানে সাহায্যও করা যায়।

বাচ্চা হওয়ার সময়ে কেন কিছু মহিলা বেশ চনমনে থাকে আবার কয়েকজন খুব মেজাজি হয়ে ওঠে?

বাচ্চা হওয়ার সময়ে একজন মহিলার শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন উৎপাদনের পরিমাণ খুব বেড়ে যায়। এই সময়ে একজন মহিলার জীবনে অত্যন্ত বেশি পরিমাণে হরমোনের বদল ঘটে যা তার জীবনের অন্য কোনও সময়ে ঘটে না। ইস্ট্রোজেনের সাহায্য জরায়ু এবং প্ল্যাসেন্টা সুস্থ ভ্রূণকে জন্ম দেয় এবং আগত শিশুর সুস্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত করে। সন্তানসম্ভবা সময়ের একেবারে শেষ পর্যায়ে  ইস্ট্রোজেন মায়েদের শরীরে দুগ্ধনালির বিকাশ ঘটায়। একজন মেয়ের শরীরে সন্তানসম্ভবা হওয়ার সময়ে যত বেশি পরিমাণ ইস্ট্রোজেন উৎপন্ন হয় তত পরিমাণ ইস্ট্রোজেন যখন সে সন্তানসম্ভবা নয় তখন হয় না। এর ফলে বাচ্চা হওয়ার সময়ে মহিলাদের মধ্যে বমি-বমি ভাব থাকে।

প্রোজেস্টেরনের মাত্রাও এইসময়ে বৃদ্ধি পায়। এই হরমোনের প্রভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও পেশি শিথিল হয়ে পড়ে ও জরায়ুর বিস্তার ঘটিয়ে বাচ্চাকে ধরে রাখতে এবং তার বিকাশে সাহায্য করে।

অন্যান্য হরমোনের প্রভাবও দেখা যায়। যেমন- প্রোল্যাক্টিন মহিলাকে তার বাচ্চাকে স্তনপান করাতে ও অক্সিটোসিন প্রসব বেদনা নিস্তেজ করতে সাহায্য করে।

এইসময়ে অধিকাংশ হরমোনই রক্ষাকবচের কাজ করে। এই হরমোনগুলো মা ও বাচ্চার সুস্থতাকে সুনিশ্চিত করে। কিন্তু বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে মহিলাদের মধ্যে অনুভূতিগত বিপর্যয় দেখা যায়-

  • শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে
  • শারীরিক ভাবমূর্তিগত সমস্যা দেখা দেয়
  • প্রসব বেদনার ভয় থাকে
  • কাছের মানুষ বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কজনিত সমস্যা হয়
  • কেরিয়ার এবং মাতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার করা নিয়ে চিন্তা থাকে
  • টাকাপয়সা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা
  • পুত্র সন্তানের জন্ম দেওয়া নিয়ে পরিবারের সদস্যদের চাপ

হরমোনের পরিবর্তনের ফলে মহিলারা খিটখিটে বা মেজাজি হয়ে ওঠে। এই ঘটনা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। ঘুমের সমস্যার জন্য মহিলাদের মধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

নতুন মায়েরা কেন সবসময়ে ক্লান্ত বোধ করে ও অনিদ্রায় ভোগে?

সন্তানসম্ভবা অবস্থার শেষ পর্যায়ে শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের পরিমাণ খুব বেশি থাকে। বাচ্চার জন্মের পর এই হরমোনের মাত্রা খুব কমে যায়। এই সময়ে হরমোন উৎপাদন বাড়তে শুরু করে (অক্সিটোসিন, মা এবং বাচ্চার মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করে) এবং মাকে বাচ্চার যত্ন নিতে উদ্বুদ্ধ করে। এইসময়ে একজন মহিলাও মাতৃত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য লড়াই করে; ও পর্যাপ্ত ঘুম এবং খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা দেখা দেয়। এই সময়টা একজন মায়ের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিছু মহিলার মধ্যে প্রসব পরবর্তী অবসাদের জন্ম হয়।

এই সময়ে কয়েকটি নির্দিষ্ট মানসিক চাপের জন্ম হয়:

  • বাচ্চার ঠিকঠাক দেখভালের ক্ষেত্রে মায়ের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়
  • একজন মায়ের জন্ম দেওয়া বাচ্চার লিঙ্গ, আকার-আয়তন গায়ের রং প্রভৃতি নিয়ে পরিবারের লোকদের সমালোচনা শুরু হয়
  • বিশেষত ছোট পরিবারগুলোতে বাচ্চার দেখভালের বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সাহায্যের অভাব
  • মানসিক সাহায্যের অভাব
  • একজন নতুন মা যখন ক্লান্ত বোধ করে বা বিষণ্ণ থাকে তখনও তার মধ্যে মাতৃত্বের চাপ ও আনন্দ মিলেমিশে যায়

তিনি খুবই মেজাজি হয়ে উঠছেন। এটা কি মেনোপজের জন্য হচ্ছে….

অধিকাংশ মহিলার চল্লিশ বছরের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে মেনোপজ শুরু হয়। মেনোপজের সময়ে শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমতে থাকে ও ওভারি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইস্ট্রোজেন মানুষের স্মৃতিশক্তির উপর প্রভাব ফেলে। মেনোপজের সময়ে মহিলাদের শরীরে যে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে তার ফলে তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে ভাব, ঘন ঘন মেজাজ-মর্জির বদল, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং মনোসংযোগের সমস্যা দেখা দেয়।

মেনোপজ হচ্ছে এমন একটা সময় যখন মহিলাদের মধ্যে অনেকরকম চাপের সৃষ্টি হয়। একজন মহিলার জীবনে যখন মেনোপজ পর্ব চলে তখন তার জীবনপ্রবাহে বিভিন্ন বদল ঘটে থাকে। যেমন- অভিভাবক বা স্বামীকে হারানো; কাজ বা অন্যান্য কারণে সন্তানদের বাড়ি ছেড়ে দূরে থাকা প্রভৃতি। সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা হারানো (এমনকী তার নিজের সন্তান থাকা সত্ত্বেও) এই সময়ে মহিলাদের মধ্যে বিপর্যয় ডেকে আনে। মহিলাদের মধ্যে গুরুতর হরমোনের তারতম্যের জন্য গুরুতর মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগের জন্ম হয়।

অন্যান্য আরও কিছু হরমোন কি রয়েছে যে বিষয়ে আমার জানা দরকার?

থাইরয়েড

এই হরমোনের প্রভাবে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ সুষ্ঠুভাবে হয় এবং দেহের খাদ্য শক্তিতে পরিণত হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির কম সক্রিয়তা শরীরের কার্যকলাপকে প্রয়োজনের তুলনায় হ্রাস করে; এজন্য মানুষের মধ্যে কুঁড়েমি, আলস্য, বিষণ্ণ ভাব দেখা যায়। যাদের শরীরে থাইরয়েডের মাত্রা কম থাকে (হাইপোথাইরয়েডিজম) তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও অবসাদ ভীষণভাবে দেখা দেয়।

থাইরয়েড গ্রন্থি যখন অতিমাত্রায় সক্রিয় হয় তখন মানুষ নার্ভাস, খিটখিটে এবং অধীর হয়ে পড়ে। এছাড়া হৃদস্পন্দনের হার বেড়ে যায় এবং অত্যন্ত সহজে শরীরের ওজন কমে যায়। এই ধরনের মানুষের মধ্যে গুরুতর মানসিক উদ্বেগের সমস্যা দেখা যায়।

কর্টিসল

এই হরমোনকে স্ট্রেস হরমোন হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এই হরমোনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী রয়েছে। যেমন- খাদ্য পরিপাক ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে  রাখতে সাহায্য করে। বাচ্চা হওয়ার সময়ে ভ্রূণের বিকাশে সহায়তা করে। শরীরে এই হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে দেহের ওজন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়। মানসিক দিক থেকে এটি উদ্বেগ ও অবসাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। যাদের ক্ষেত্রে কর্টিসলের মাত্রা কম থাকে তাদের ঘন ঘন মেজাজ-মর্জির পরিবর্তন ঘটে।

অক্সিটোসিন

এই হরমোনটি ভালোবাসা বা আদুরে হরমোন নামে পরিচিত। প্রসব বেদনা কমানো এবং ল্যাক্টেশনের বিকাশ ছাড়া, অক্সিটোসিন মা ও শিশুর বন্ধনে সাহায্য করে। যৌন তাড়না এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে এই হরমোন কাজ করে। শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা কম হলে অবসাদের লক্ষণ দেখা যায়।

এই প্রবন্ধটি লিখতে সাহায্য করেছেন ব্যাঙ্গালোরের ফর্টিস লা ফেম-এর সিনিয়র ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অরুণা মুরলিধর এবং ব্যাঙ্গালোরের পেরিনাটাল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অশ্লেষা বাগাদিয়া।

সূত্র

http://www.hotzehwc.com/2015/05/6-ways-hormones-affect-your-mental-health/

http://www.news-medical.net/health/what-are-Hormones.aspx

http://www.webmd.com/menopause/features/your-brain-on-menopause#2

http://hormonehoroscope.com/the-female-hormone-cycle/