আমার পিসিওএস রয়েছে এবং আমি খুব মেজাজি হয়ে পড়েছি। এই বিষয়ে কি আমার কিছু করার আছে?

মহিলাদের যখন সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা জন্মায় তখন তাদের মধ্যে প্রায়শই  পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) নামে একপ্রকার হরমোন ঘটিত সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যার বহুমুখী চরিত্র রয়েছে। এই সমস্যায় আক্রান্ত সব মহিলার ক্ষেত্রেই যে এই অসুখের সমস্ত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়, তা নয়।

পিসিওএস সমস্যার শারীরিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋতুচক্রের অনিয়মতা, হিরসুটিজম (শরীরে প্রচুর পরিমাণে লোমের আধিক্য),স্থূলতা, ব্রণ এবং অ্যালোপেশিয়া বা কেশলুপ্তি বা টাক পড়ে যাওয়ার সমস্যা। কিন্তু পিসিওএসে আক্রান্ত মহিলাদের ক্ষেত্রে যে সমস্যাটিকে প্রায়শই সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং গুরুত্ব দেওয়া হয় না তা হল মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা।

পিসিওএস এবং মেজাজ-মর্জিগত সমস্যা

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে পিসিওএস-এর সমস্যায় আক্রান্ত মহিলাদের ক্ষেত্রে উদ্বেগ এবং অবসাদের মতো মানসিক অসুস্থতা প্রায়শই নির্ধারণ করা হয় না। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেহেতু দেহ ও মন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত সেহেতু একটির বদল ঘটলে অপরটির উপর তার কুপ্রভাব পড়তে বাধ্য। যেমন- শরীরে হরমোনের তারতম্যের জন্য মহিলাদের ক্ষেত্রে পিসিওএস নামক যে সমস্যা দেখা দেয় তার ফলে তাদের মধ্যে মেজাজ-মর্জির ঘন ঘন পরিবর্তন ও মানসিক স্থিতিশীলতার অভাব দেখা যায়। এই লক্ষণটি আবার অবসাদের মতো সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রকাশ পায়।

জৈবিক বা দৈহিক ফলাফল ছাড়াও পিসিওএস-এর নানারকম মানসিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। তাই এই সমস্যার মোকাবিলার বিষয়টি মহিলাদের ক্ষেত্রে এক বৃহত্তর আকার ধারণ করে।

বিভিন্ন মহিলার ক্ষেত্রে পিসিওএস-এর চিকিৎসা ভিন্নধর্মী হয়ে থাকে। এই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল সমস্যার লক্ষণগুলো দূর করা বা নিয়ন্ত্রণ করা। সমস্যার লক্ষণ এবং তাদের ভয়াবহতার উপর নির্ভর করে বিভিন্নরকমের চিকিৎসার ব্যবস্থা  করা হয়। এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণের পিছনে থাকে অসুখ সম্পর্কে মানুষকে যথাযথ শিক্ষিত করে তোলা এবং তাকে সহায়তা করার মানসিকতা। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর  জীবনযাত্রার উপরেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিকিৎসা ছাড়াও জীবনযাত্রার ধরনের ও মানের উন্নতি ঘটিয়ে, যেমন- নিয়মিত শরীরচর্চা ও পরিমিত পুষ্টিকর খাবারদাবার খেয়ে পিসিওএস-এর মতো সমস্যার চরম সমাধান করা যায়। এই সমস্যার চিকিৎসায় জীবনযাত্রার মানের ও ধরনের উন্নতি একেবারে প্রথম সারিতে স্থান পায়। কারণ পিসিওএস নামক রোগের লক্ষণগুলো দূর করার জন্য দৈহিক ওজন কমানো এবং ওজন বৃদ্ধি প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সেই সঙ্গে এই ব্যবস্থা অবলম্বন করলে জীবনযাত্রার মানেরও উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

পিসিওএস-এর মোকাবিলায় শরীরচর্চা এবং ডায়েট বা পরিমিত পুষ্টিকর আহার খুবই কার্যকরী একটি উপায়। নিদেনপক্ষে ৫ থেকে ১০ শতাংশ দৈহিক ওজন কমাতে পারলে তা মানুষের মেটাবলিক, জননতন্ত্র বা রিপ্রোডাক্টিভ এবং মানসিক সমস্যার লক্ষণগুলোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

এছাড়াও প্রয়োজন খাবারদাবারের উপর নিয়ন্ত্রণ, শরীরচর্চা, যা শরীরের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর দ্বারা মানুষ তার শরীরের অবস্থিত গ্লুকোজ পরিপাক করতে সক্ষম হয়, ইনসুলিন হরমোন ক্ষরণের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং হাইপারঅ্যান্ড্রোজেনিজম কমায়। আমাদের জীবনযাত্রায় শরীরচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে অ্যারোবিক ও যোগব্যায়ামের মতো শারীরিক কসরত দুটোই ফলদায়ক হয়।

পরিবারের সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ

পিসিওএস-এর ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যার চাইতে অবসাদ, উদ্বেগ, নেতিবাচক দৈহিক ভাবমূর্তিজনিত সমস্যা এবং আত্মনির্ভরতার অভাব অনেক বেশি মানুষকে  বিপর্যস্ত করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে পিসিওএস-এর আলোচনায় দেখা গিয়েছে যে এই সমস্যার সঙ্গে জৈব-মন-সামাজিক এই তিন ক্ষেত্রেরই যোগ রয়েছে। তাই সমস্যা  সমাধানের ক্ষেত্রে মানসিক ও সামাজিক লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত জরুরি।

  • অধিকাংশ মহিলা প্রায়শই পিসিওএস-এর লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবনাচিন্তা করে না। কয়েকজনের ক্ষেত্রে আবার এই বিষয়টি নিয়ে কলঙ্কের বোধ জাগে। তারা মনে করে যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের জন্য তাদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়। সেজন্য একজন মহিলা এবং  তার সহযোগীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা খুবই জরুরি বা এই বিষয়টি নিয়ে একজন কাউন্সেলরের সঙ্গে কথাবার্তা বলাও ফলদায়ক হয়।
  • পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবের সাহায্য এই সমস্যা প্রতিকারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পিসিওএসে আক্রান্ত মহিলারা প্রায়শই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই তারা যদি নিজেদের অনুভূতি বা ভালো না-লাগার বোধগুলো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ভাগ করে নেয় বা নিজেদের  জনন ক্ষমতা নিয়ে কাছের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাহলে এই সমস্যা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে সমস্যার মোকাবিলা করাও আক্রান্তদের পক্ষে সহজ হবে।
  • পিসিওএস-এর সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয় সম্পর্কে তাঁদের সংবেদনশীল হওয়া জরুরি। শুধুমাত্র রুগিকে নয়, তার পরিবারকেও এই  সমস্যার বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলা দরকার। সেই সঙ্গে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায় চলাকালীন তাদের সাহায্য করা প্রয়োজন।
  • সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে পিসিওএস-এর সমস্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কাউন্সেলর বা মনোবিদের মতো মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন।
  • আত্ম-সুরক্ষা এই সমস্যা সমাধানের একটি কার্যকরী উপায়। এছাড়া জীবনযাত্রার ধরনে উন্নতি ঘটিয়ে মানুষ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে প্রায় সমস্ত দেশ, এমনকী ভারতেও পিসিওএস-এর সমস্যায় আক্রান্ত মহিলাদের সাহায্যের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সেখানে একটি সহযোগী গোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে পারস্পরিকভাবে মহিলারা তাদের সমস্যা আলাপ-আলোচনা করতে পারে এবং এই সমস্যা সমাধান করার জন্য তারা একে অপরকে উৎসাহিতও করতে পারে।

সূত্র:

  1. Williams, Sheffeld and Knibb, 2015
  2. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1069067/
  3. https://www.womenshealth.gov/files/assets/docs/fact-sheets/polycystic-ovary-syndrome.pdf