দৈহিক স্বাস্থ্যের সমস্যা যার লক্ষণ অবসাদের মত

ক্লান্তি, অপরাধ বোধ, অপদার্থতা, খিটখিটে ভাব, অনিদ্রা, খিদে কমে যাওয়া, দৈনন্দিন কাজকর্মের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, লাগাতার মন খারাপ বা বিমর্ষ ভাব- এসবই মানসিক অবসাদের লক্ষণ। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি এমন লক্ষণ রয়েছে যা অন্যান্য অসুস্থতার লক্ষণও হতে পারে। এক্ষেত্রে অবসাদ অসুখ না হয়ে, অসুখের লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়।

নিমহ্যান্সের মনোরোগ সংক্রান্ত পুনর্বাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার কৃষ্ণা প্রসাদের মতে “শারীরিক বা দৈহিক অসুস্থতার সঙ্গে অবসাদের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, অবসাদের চিহ্ন যেমন অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, শরীরের নানা অংশে ব্যথা, বেদনা অনুভব করা শারীরিক উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে এবং শরীরে কোন বস্তুর অভাবের কারণেও হতে পারে। আবার অনেকসময়ে বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা যেমন-হাইপোথাইরয়েডিজ্‌ম, অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা এবং ভিটামিনের অভাবের লক্ষণ অবসাদের মতই হয়।”

যদি আপনি নিজের মধ্যে অবসাদের কোনও লক্ষণ দেখতে পান তাহলে আপনার সাধারণ চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ খতিয়ে দেখতে পারেন যে অবসাদ কোনও শারীরিক সমস্যার বহিঃপ্রকাশ কিনা। গবেষণায় দেখা গিয়েছে নিম্নলিখিত শারীরিক সমস্যার লক্ষণগুলির সঙ্গে অবসাদের লক্ষণের মিল রয়েছে -

  • হাইপোথাইরয়েডিজ্‌ম (৩০-৪০ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে)- থাইরয়েড হরমোনের কম ক্ষরণের ফলে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে সেগুলো হল ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, দুর্বল স্মৃতিশক্তি, অত্যধিক ঘুমানো, ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন বা বিষণ্ণতা।
  • হাইপোগ্লাইসিমিয়া (যারা অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত, যাদের খাদ্যাভ্যাস যথাযথ নয় এবং বংশগত ঝুঁকি)- রক্তে শর্করার অভাবে ক্লান্তি, অবসন্ন ভাব, ঝিমিয়ে থাকা এবং মানসিক দ্বিধাগ্রস্ততা দেখা দেয়।
  • অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা অথবা রক্তে লৌহজাত পদার্থের অভাব (যে সব মহিলাদের অতিরিক্ত পরিমাণে ঋতুস্রাব হয় তাদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়, লৌহজাত বস্তুর আধিক্য রয়েছে এমন খাবার যারা অল্প পরিমাণে খায় অথবা যাদের পেটে কৃমির সমস্যা থাকে)- এই সমস্যার লক্ষণগুলো হল অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন হ্রাস পাওয়া, মনোযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা এবং অনিদ্রা।
  • ভিটামিন বি১২-এর অভাব (সাধারণত যারা নিরামিষ খাবার খায় তাদের মধ্যে দেখা দেয়)- ভিটামিন বি১২-এর অভাবের কারণে ক্লান্তি বোধ, শরীরে অস্বস্তি ও ব্যথা অনুভব করা, খিদে কমে যাওয়া, মেজাজ পরিবর্তন হওয়া বা বিষণ্ণতা এবং খিটখিটে ভাব দেখা যায়।
  • ফলিক অ্যাসিডের অভাব (যারা ফল এবং শাকসব্জি খায় না বা কম খায় তাদের মধ্যে ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি দেখা যায়)- এর ফলে মানুষের মধ্যে অবসন্নতা, অতিরিক্ত ঘুমানো, মেজাজ পরিবর্তন এবং খিটখিটে ভাব
    দেখা যায়।
  • ভিটামিন ডি-এর অভাব (সাধারণত বড় বয়সে দেখা দেয়, যারা সূর্যের আলোয় কম বেরয় বা যাদের খাদ্যতালিকায় দুধজাতীয় খাবার কম থাকে তাদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর অভাব চোখে পড়ে)- লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অবর্ণনীয় ক্লান্তি, শরীরে ব্যথা, বেদনা অনুভব করা এবং ঠিকমতো চিন্তাভাবনা করতে না পারা।

যখন একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অবসাদ নিয়ে পর্যালোচনা করেন তখন তিনি একজন মানুষের দৈহিক এবং মনস্তাত্ত্বিক- দুটো দিকই খতিয়ে দেখেন। সেই সঙ্গে নানারকম শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করে থাকেন, যেমন- বডি মাস ইনডেক্স, পালস, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার এবং অন্যান্য দৈহিক কার্যকলাপের দিকে তিনি নজর দেন। একজন ডাক্তার রুগিকে তার শারীরিক অসুস্থতা, যার জন্য অবসাদের লক্ষণ দেখা দিতে পারে তা খতিয়ে দেখার জন্য রক্ত পরীক্ষা করার সুপারিশ করতে পারেন। এই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নীচের বিষয়গুলো খতিয়ে
দেখা হয়-

  • হাইপোথাইরয়েডিজ্‌ম বা হাইপারথাইরয়েডিজ্‌মের জন্য রক্তে থাইরয়েড হরমোন এবং টিএসএইচ-এর মাত্রা নির্ণয় করা হয়
  • ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন এবং ভিটামিন ডি-সহ যে কোনও পুষ্টিগত বিষয়ের অভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়
  • হাইপোগ্লাইসিমিয়া এবং ডায়াবেটিসের জন্য রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ধারণ
    করা হয়

উপরে যে সব সমস্যার বিষয়ে আলোচনা করা হল তা সবই চিকিৎসাযোগ্য। রক্ত পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একজন রুগি সাধারণ চিকিৎসক অথবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। যদি দেখা যায় যে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার পরেও অবসাদের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাহলে একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ একান্ত প্রয়োজনীয়।  

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত