ভাই বা বোনদের পারস্পরিক রেষারেষির মোকাবিলা

কল্পনা তার দুই বাচ্চার মধ্যে ঝগড়া মেটাতে গিয়ে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কল্পনার ৯ বছরের মেয়ে নেহা সবসময়ে তার ৩ বছর বয়সের ছোট ভাই-এর সঙ্গে ঝগড়া করত। এমনকী, বাবা-মায়ের চোখের আড়ালে সে তার ভাইকে মারধরও করত। বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে বলে অভিভাবকদের হুমকিও দিত নেহা এবং কাজেও সে তা করে দেখাবে বলে দাবি করত। কারণ তার মনে হত যে  ভাইয়ের জন্মের পর থেকে বাবা-মা তার সঙ্গে ভালো আচরণ করে না, তাকে ভালোবাসে না। তাই ভাইয়ের প্রতি নেহার মনে চরম আক্রোশ ও ক্রোধ জন্মেছিল। ফলে তার আচরণ এবং শৃঙ্খলাবোধের সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। নেহা স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের কথা শুনত না এবং বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া-মারামারি করত।

এসব দেখে কল্পনা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিল এবং বাচ্চাদের উপর অসম্ভব রেগে যেতে শুরু করেছিল। প্রতি রাতে কল্পনা ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করত যে পরের দিন সকালে যেন ভাই-বোনের মধ্যে মিলমিশ হয়ে যায় এবং সে যেন তার দিনটা সম্পূর্ণ  শান্তিতে কাটাতে পারে।

ভাই বা বোনদের পারস্পরিক শত্রুতার মধ্যে কতগুলো নেতিবাচক মনোভাব লুকিয়ে থাকে, যেমন- ক্রোধ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা। এর ফলে ভাই বা বোনদের মধ্যে বড়দের মনোযোগ আকর্ষণ এবং নিজেদের শক্তি জাহির করার জন্য ঝগড়া-মারামারি, তর্ক এবং প্রতিযোগিতা করতে দেখা যায়। যদিও প্রত্যেক পরিবারের ক্ষেত্রে এসবের পরিমাণ বা গভীরতা আলাদা-আলাদা হয়। কিন্তু ঘটনাটা বহুল প্রচলিত এবং তার মোকাবিলা করাও মোটেই সহজ কাজ নয়। সন্তানদের এই  ঝগড়া-মারামারি বন্ধ করার জন্য বাড়িতে অভিভাবকদের কী করণীয়, তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে (হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন) কথা বলেছিলেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদ ডঃ মনজিত সিধু।

বড় সন্তানকে প্রস্তুত করা- ছোট সন্তানের জন্মের আগে থেকে তার জন্মের কথা বড় সন্তানকে বলা জরুরি। তাদের একথাও জানাতে হবে যে যখন তার ছোট ভাই বা বোন জন্মাবে তখন পরিস্থিতি খানিকটা বদলে যেতে পারে। কারণ তখন বাবা-মাকে ভাই বা বোনের প্রতি বেশি যত্নশীল হতে হবে, তার প্রতি অতিরিক্ত নজর দিতে  হবে। কিন্তু এজন্য বড় সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দেওয়া সময় কিছুটা কমে গেলেও বাবা-মা চেষ্টা করবে সেই না-দেওয়া সময় পুষিয়ে দিতে। ছোট সন্তান জন্মানোর আগে বড় সন্তান যাতে তার ভাই বা বোনের প্রতি যত্নশীল হয় সেকথাও তাকে বোঝানো দরকার। তাই ছোট সন্তানের জন্মের আগে তার জামাকাপড় ও খেলনাপাতি কেনার বিষয়ে বড় সন্তানের সঙ্গে আলোচনা ও তার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে বড় সন্তানের মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে এবং আগত ভাই বা  বোনের প্রতি সুখকর অনুভূতি জন্মায়।

ভাই, বোনদের মধ্যে সংবেদনশীলতা গড়ে তোলা- ছোট সন্তানের জন্মের পরে তার যত্ন বা দেখভালের জন্য বাবা-মায়ের উচিত বড় সন্তানকে যতদূর সম্ভব সেই কাজে যুক্ত করা। তবে তাদের কাঁধে অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। কারণ যত্নের ক্ষেত্রে যদি কোনও ভুলভ্রান্তি হয় তাহলে তাদের মনে অপরাধ বোধ  জাগতে পারে। এমনকী, তারা এ-ও ভাবতে পারে যে বাবা-মা হয়তো তাঁদের সাহায্যকারী হিসেবে তাকে ব্যবহার করছে। ভাই-বোনদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য কয়েকটি সম্ভাব্য উপায় হল-

  • ভাই বা বোন যখন শিক্ষ- ছোট ভাই বা বোনকে শিক্ষা দেওয়ার কাজে বাবা-মায়েদের প্রয়োজন তাদের বড় সন্তানকে উৎসাহ দেওয়া। এই কৌশল নিলে ক্ষতির বদলে লাভই বেশি হবে। এর ফলে বড় দাদা বা দিদি তার ছোট ভাই বা বোনকে নানারকম খেলা, এমনকী বর্ণমালা বা সুন্দর ছড়াও
    শেখাতে পারে।
  • সহকর্মী হিসেবে ভাই বা বোনের যোগাযোগ- প্রতিদিন বাচ্চাদের এমন কাজ করতে দিতে হবে যা তারা মিলেমিশে করতে পারে। এর ফলে তাদের মধ্যে দলগতভাবে কাজ করার বোধ গড়ে উঠবে এবং কীভাবে মিলেমিশে তাড়াতাড়ি কাজ করা যায় তা-ও তারা শিখতে পারবে।
  • হাসি-খুশি মানুষ হিসেবে ভাই বা বোনের ভূমিকা- ছোট ভাই বা বোনকে আনন্দ দেওয়ার জন্য বড় দাদা বা দিদিকে হাসি-খুশির পরিবেশ গড়ে
    তুলতে হবে।

প্রতিটি সন্তানকে তার নির্দিষ্ট জায়গা দিতে হবে- যতদূর সম্ভব পারা যায় প্রতিটি ভাই-বোনকে তাদের নিজস্ব জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বাড়িতে দু'জন সন্তানের জন্য যদি আলাদা-আলাদা ঘর না-ও থাকে তাহলে একটা ঘরেই এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা তাদের নিজের ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলোর একক মালিক হতে পারে। অন্যের জিনিসে হাত দিতে গেলে যে ন্যূনতম  নিয়মকানুন মানা দরকার সে বিষয়ে তাদের শিক্ষা দেওয়া জরুরি, যেমন- অন্যের জিনিস নেওয়ার আগে তাকে জিজ্ঞাসা করা বা অপরের খেলনা নিয়ে খেলার পর তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা প্রভৃতি। এর মধ্য দিয়ে তারা শিখতে পারবে যে কীভাবে অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো যায়। এই পরিস্থিতিতে তারা একে অপরের কতখানি ঘনিষ্ঠ, তা বড় কথা নয়।

প্রত্যেক বাচ্চার সঙ্গে কিছুটা সময় একা কাটাতে হবে- বাবা-মায়েদের চেষ্টা করতে হবে তাদের প্রত্যেকটি বাচ্চার সঙ্গে কিছুটা সময় একা কাটানো। এর ফলে দৈনন্দিন কাজের সময়ের থেকে তাদের অতিরিক্ত কিছুটা সময় ব্যয় করতে হবে। কিন্তু এর ফলে বাবা-মায়ের কোনও সন্তানই নিজেকে অবহেলিত বলে মনে করবে না এবং নিজেদের প্রতি বাবা-মায়ের পূর্ণ মনোযোগও তারা আদায় করতে পারবে।

কম মনোযোগ দেওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণ- ছোট সন্তানের জন্মের ঠিক পরে-পরেই বড় সন্তানরা বাবা বা দাদু-দিদাদের সান্নিধ্যই বেশি পেয়ে থাকে। ফলে তাদের নিজেদের অবহেলিত বলে মনে হয় না। তবু কখনও তাদের মনে হতে পারে যে মায়েরা তাদের প্রতি ঠিকমতো নজর দিচ্ছে না বা সময় দিতে পারছে না। এক্ষেত্রে বাবা বা দাদু-দিদাদেরই ক্ষতিপূরণ করতে হবে।

সন্তানদের মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করা এড়াতে হবে- বাবা-মায়ের প্রতিটি সন্তানই অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয় এবং নিজস্ব গতি, ছন্দের সাহায্যে তারা জীবনের   পথে এগিয়ে যায়। প্রত্যেক বাচ্চার আলাদা লক্ষ্য, উদ্দেশ্য থাকে এবং তার সঙ্গে তাদের নিজের প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা যুক্ত থাকে। এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে এমন কিছু মন্তব্য করা উচিত নয় যাতে বাচ্চাদের মধ্যে তুলনা টানা হয়, যেমন- ''যখন রোহিত তোমার মতো বয়সের ছেলে ছিল তখন সে নিজেই নিজের জুতোর ফিতে বাঁধতে পারত''। এর ফলে বাচ্চারা নিজেদের অসমর্থ বলে ভাবে এবং তাদের আত্মবিশ্বাসের উপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। কখনোই সন্তানদের মধ্যে একজনের পক্ষ নিয়ে বাবা-মায়ের কথাবার্তা বলা উচিত নয়।

সন্তানদের রাগ, ক্রোধ লুকিয়ে রাখা বা চাপা দেওয়া ঠিক নয়- বাচ্চাদের যে রাগ  এবং ক্রোধ রয়েছে, তা স্বীকার করতে হবে এবং সে বিষয়ে কথাবার্তাও বলতে হবে। এর ফলে বাবা-মা একটা ধারণা করতে পারবে যে কেন বাচ্চাদের মনে নেতিবাচক অনুভূতি দেখা দিচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে এইধরনের অনুভূতি থেকে জন্ম নেওয়া মারমুখীনতা এবং বিদ্বেষের মনোভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

অপরাধের জন্ম হতে পারে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা জরুরি- অনুভূতি এবং কাজ যে সমার্থক নয়, সে বিষয়ে বাচ্চাদের শিক্ষা দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে মনে মনে রাগ হলেও তা কাজে করে দেখানো ঠিক নয়। যেসব ক্ষেত্রে বাচ্চাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটার ঝুঁকি থাকে সেসব ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দ্রুত হস্তক্ষেপ  করতে হয়। তা না হলে বড় দাদা-দিদিদের দ্বারা শুধু যে ছোট ভাই-বোনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে তা নয়, সেই সঙ্গে দাদা-দিদিদের মনেও অপরাধ বোধের জন্ম হতে পারে। এই অপরাধ বোধ মানুষের মনে খুব খারাপ প্রভাব ফেলে।

বাচ্চাদের নিজেদের ঝামেলা নিজেদেরকেই মেটাতে দেওয়া ভালো- যতদূর সম্ভব বাচ্চাদের নিজেদের মধ্যেকার ঝামেলা নিজেদেরকেই মেটাতে দেওয়া ভালো। যদি একজন অপরজনের থেকে বেশি শক্তিশালী হয় তাহলে সেই যে জিতবে সেটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে অসম শক্তির প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্য অভিভাবকদের মধ্যস্থতা করার দরকার হতে পারে।

বাচ্চাদের মধ্যে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা গড়ে তোলা- শৃঙ্খলা বাচ্চাদের ব্যক্তিগত বিষয় হওয়া জরুরি এবং তা যদি কোনও ভাই বা বোনের সামনে দেখানো হয় তাহলে তারা অস্বস্তিতে পড়তে পারে এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবতে পারে। অপরদিকে অন্য ভাই বা বোনের কাছে এটা মজার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যথাযথ আচরণকে অগ্রাহ্য করা যাবে না- বাচ্চাদের সঠিক আচরণ বা ব্যবহারের প্রশংসা করা ও স্বীকৃতি জানানো জরুরি। এর ফলে বাচ্চাদের মধ্যে ভালো আচরণ করার ঝোঁক বেড়ে যায় এবং তারা বারবার ওই আচরণই করতে চায়।

পারিবারিক পরিকল্পনা চালু করা- পারিবারিক পরিকল্পনা চালু করার ফল নেতিবাচক ও ইতিবাচক- দু'রকমই হতে পারে। যদি দেখা যায় যে বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে লড়াই-ঝগড়া করছে তাহলে তাদের কিছু সুযোগ-সুবিধা, যেমন- সপ্তাহের শেষে টিভি দেখা বন্ধ করে দেওয়া যায়। যখন তারা আর ঝগড়া করবে না তখন তাদের সুযোগ-সুবিধা আবার ফিরিয়ে দেওয়া যাবে।

সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা- আর্থিকভাবে পারিবারিক সচ্ছলতা অনুযায়ী বাচ্চাদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা খুব বুদ্ধি করে ও স্বচ্ছভাবে বণ্টন করা   জরুরি। এই সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে গাড়ির সামনের আসনে বসে বিকেলের জন্য টেলিভিশনের নানা অনুষ্ঠান বাছাবাছি করা। এমনকী, গাড়ির আসনের বোতাম এলিয়ে বসা প্রভৃতি।