ওষুধ: ভ্রান্ত ধারণা এবং বাস্তব ঘটনা

শারীরিক অসুস্থতার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের কাজ বা ফলাফলের সঙ্গে আমাদের অধিকাংশ মানুষেরই পরিচয় রয়েছে। কিন্তু মানসিক অসুখের জন্য যে  ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয় বা প্রয়োগ করা হয় সেগুলো আমাদের উপরে কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে আমরা সবসময়ে সচেতন থাকি না। মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর বিষয়ে জানার জন্য এমন কয়েকটি সাধারণ উপায় রয়েছে যার মধ্যে ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা এবং তা তাদের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন করবে কিনা, সেই বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রবন্ধে মনের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের বিষয়ে মানুষের কতগুলো ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

ভ্রান্ত ধারণা: একবার ওষুধ খাওয়া শুরু করলে সারা জীবন ধরেই সেই ওষুধ আমায় খেতে হবে বা তার উপর আমার আসক্তি জন্মাবে।

বাস্তব ঘটনা: বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার চিকিৎসায় নানারকম ওষুধ ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানসিক অসুখের জন্য যে ওষুধগুলো ডাক্তাররা একজন রুগিকে দেন সেগুলোর অধিকাংশের উপরেই মানুষের আসক্তি জন্মায় না। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আপনাকে যে কোনও ওষুধ দেওয়ার আগে আপনার অসুস্থতার ইতিহাস এবং অসুখের লক্ষণগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল থাকেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ওষুধ দেন এবং ওষুধ খেয়ে আপনার কতটা উন্নতি হল  তা জেনে-বুঝে তিনি আস্তে আস্তে ওষুধ খাওয়ার মাত্রা কমিয়ে আনেন।

ভ্রান্ত ধারণা: ওষুধ খাওয়া মাত্রই বা ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আগের থেকে সুস্থ বোধ করব। ওষুধগুলো আসলে 'হ্যাপি পিলস্‌' (আনন্দ-বড়ি)।

বাস্তব ঘটনা: যখন আমরা কোনও একটি ওষুধ খাই তখন সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সেই ওষুধের সুফল পেতে চাই। মনোরোগের ওষুধ খাওয়া মাত্রই যে আপনি একদম সুস্থ হয়ে যাবেন তা কিন্তু নয়। তবে ওষুধ আপনাকে আপনার মনের মধ্যে জমাট বাঁধা অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলোর মোকাবিলা করতে অনেকাংশেই সাহায্য করবে। আবার কখনও অন্যান্য ওষুধের মতো মনোরোগের ওষুধগুলোর সঠিক কাজ শুরু হতে কিছুটা সময় লাগে। ডাক্তার আপনার জন্য কোনও ওষুধের যে নির্দিষ্ট মাত্রা ঠিক করে দেন তা খেয়ে আপনার একরকম অনুভূতি হয়; আবার ওষুধের মাত্রার বদল ঘটলে আপনার অন্যরকম অনুভূতি হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ  হল মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা এবং নির্দিষ্ট ওষুধটি আপনার উপরে কী প্রভাব ফেলছে তা তাঁকে জানানো।

ভ্রান্ত ধারণা: যদি শুরুতে কোনও একটা ওষুধ ঠিকঠাক কাজ না করে তখন অন্য ওষুধও কাজ করবে না।

বাস্তব ঘটনা: আপনার ওষুধের সঠিক কাজ শুরু হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। এরপর প্রয়োজন মতো আপনার অবস্থার উন্নতির জন্য ওষুধের মাত্রা বাড়ানো বা কমানো যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কোনও একটা নির্দিষ্ট ওষুধ ঠিকঠাক কাজ না করলে ডাক্তার সেই ওষুধ বদলে দিয়ে রুগির জন্য অন্য আরেকটি ওষুধও ধার্য করতে পারেন। যেমন শারীরিক অসুস্থতার জন্য যখন একটা অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে ঠিকঠাক কাজ না করে তখন ডাক্তার চেষ্টা করেন অন্য আরেকটি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে, যা একজন রুগির পক্ষে অনেক বেশি কার্যকরী হয়।

ভ্রান্ত ধারণা: মনোরোগের জন্য ব্যবহৃত ওষুধের অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে।

বাস্তব ঘটনা: আপনি যে কারণেই ওষুধ খান না কেন, যে কোনও ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। যে কোনও ওষুধ, যার মধ্যে নানারকম পদার্থ সক্রিয় থাকে তার সঙ্গে আপনার শরীরকে অভ্যস্ত করা প্রয়োজন। এর জন্য সময় লাগে। একজন মানুষের শরীরে একটা ওষুধের প্রতিক্রিয়া নানাভাবে ঘটে থাকে, যেমন- তার বমি বমি ভাব জাগে, ঝিমঝিম করে এবং ক্লান্ত লাগে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রায়শই ওষুধজনিত প্রতিক্রিয়ার মাত্রা কমতে থাকে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে  নিশ্চিত হওয়ার জন্য বা সেগুলো কী হতে পারে তা জানার জন্য আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।

ভ্রান্ত ধারণা: ওষুধ আমার ব্যক্তিত্ব বা স্বরূপের পরিবর্তন ঘটাবে।

বাস্তব ঘটনা: ওষুধ আপনার ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন করতে পারে না। ওষুধ অতীতে অসুস্থতার কারণে হওয়া আপনার অস্বস্তিকর বোধগুলো যাতে বারবার দেখা না দেয় তা কমাতে সাহায্য করে।

ভ্রান্ত ধারণা: মনোরোগের ওষুধ খাওয়ার মানে হল আমি গুরুতর অসুস্থ এবং আমি কোনওদিন আর সুস্থ হব না।

বাস্তব ঘটনা:এমন কিছু মানসিক সমস্যা রয়েছে যা নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার কারণে হয়। ওষুধের সাহায্যে এই ভারসাম্য ফেরে। যদি আপনার রোগের লক্ষণগুলো খুব গুরুতর হয় তাহলে ওষুধের সাহায্যে আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম করতে সক্ষম হবেন। ওষুধ এবং থেরাপির সাহায্যে একসময়ে আপনি আপনার অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন, অসুখের লক্ষণগুলোর উপশম হবে এবং অসুখের সম্ভাব্য ঝুঁকি বা বিপদগুলোকে আপনি চিনতে পারবেন।

ভ্রান্ত ধারণা: যখনই সুস্থ বোধ করব তখনই আমি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে পারব।

বাস্তব ঘটনা: অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের মতোই মনোরোগের ওষুধ খাওয়ারও একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বা কোর্স রয়েছে। তাই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করার আগে গুরুত্বপূর্ণ হল একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা। আপনি যদি আচমকা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন তাহলে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে আপনার শরীর সহজভাবে মানিয়ে নিতে পারবে না এবং এর ফলে অসুখটিও আবার দেখা দিতে পারে।

ভ্রান্ত ধারণা: যদি আমি মনোরোগের ওষুধ খাই তাহলে আর আমার টক থেরাপির কোনও প্রয়োজন পড়বে না।

বাস্তব ঘটনা: মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার চিকিৎসায় ওষুধ এবং টক থেরাপির আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার পিছনে জৈবিক ও পরিবেশগত- এই দুটি উপাদানের মিলিত কারণ রয়েছে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় জৈবিক ক্ষেত্রটির জটিলতা দূর করার জন্য ওষুধের ব্যবহার করা হয়।  অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষেত্রটির জন্য টক থেরাপির সাহায্য নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আপনি আপনার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে তাঁর সুপারিশ মতো নিজের অসুস্থতার জন্য ওষুধ এবং থেরাপির সাহায্য নিতে পারেন।

এখানে আপনারা আমাদের মনোরোগের ওষুধের ভিডিওটিও দেখতে পারেন।

এই তালিকাটি তৈরি করতে ব্যাঙ্গালোরের নিমহানস্‌-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ সন্তোষ লোগানথানের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।