পুরুষরা কি শারীরিক ভাবমূর্তি নিয়ে সমস্যায় ভোগেন?

শারীরিক ভাবমূর্তি নিয়ে সমস্যা দিনে দিনে কিশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় হওয়ার সাথে সাথে যত তারা স্বাবলম্বী হয়ে ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে এগোয়, ততই তারা বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হয়। তারা অনন্য হতে চায়, আবার স্বীকৃতিও চায়। এই বয়সেই শারীরিক ভাবমূর্তি তাদের আত্মবিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায়।

আশ্চর্যজনকভাবে, পুরুষরা মনে করেন যে তাদের বিশেষ ধাঁচের শরীর প্রয়োজন, কারণ মহিলারা ভীষণ খুঁতখুঁতে হন। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডেটিং অ্যাপগুলিতে ছবির প্রাধান্যই এর মূল কারণ। কিন্তু এই সংক্রান্ত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে মহিলাদের তুলনায় পুরুষরাই এই যুক্তিতে বেশি বিশ্বাস করেন।

প্রসঙ্গত, পুরুষদের প্রসাধন বিপণন গত ১০ বছরে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। দেশের প্রথম সারির বনিকসভা অ্যাসোচ্যাম-এর করা একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে পুরুষদের প্রসাধন বিপণন গত ৫ বছরে ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্র্যান্ড বয়েজ অ্যাডভার্টাইজিং-এর প্রাক্তন মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েট আদিত্য গৌর বলছেন, “পুরুষদের এই চাহিদা মেটানো ছিল প্রসাধন ব্যবসায়ীদের জন্যে এক বিশাল সুযোগ। পুরুষেরা মহিলাদের জন্যে তৈরি প্রসাধন ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ বাজার এবং চাহিদা দুটোই মজুত ছিল। সেইখান থেকেই প্রসাধন কোম্পানিগুলো পুরুষদের ব্যবহারোপযোগী উপকরণ নিয়ে হাজির হয়।”

বর্তমানে এইরকম পুরুষদের জন্য বিভিন্ন সামগ্রী যেমন ফেস ওয়াশ, ফেস ক্রিম, মুচট্যাশ ওয়াক্স, বিয়ার্ড জেল ইত্যাদি পাওয়া যায়। এক কথায় পুরুষদের সৌন্দর্য্যকে এখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনেকেই মনে করেন যে শরীরী ভাবমূর্তি নিয়ে সমস্যা এবং খাদ্যাভ্যাস বিকার শুধুমাত্র মহিলাদের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পুরুষদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা ধরা না পড়ার সম্ভাবনা মহিলাদের তুলনায় চারগুণ বেশি, অর্থাৎ পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত মনোবিদ পারস শর্মার মতে, “আগে পুরুষদের উপর মহিলাদের মতন রোগা বা বিশেষ কোনও শরীরী গঠনের অধিকারী হওয়ার কোনও সামাজিক দায় ছিল না। স্বভাবতই খাদ্যাভ্যাস বিকার বা শরীরী ভাবমূর্তি নিয়ে অধিকাংশ সমীক্ষা মহিলাদের উপরে করা হয়েছে। সেই সমস্ত সমীক্ষার মাপকাঠিও মহিলাদের মাথায় রেখেই ভাবা হয়েছে। কিন্তু আজকাল মিডিয়া ও ফিটনেস নিয়ে রমরমার যুগে মহিলাদের মতই পুরুষদের উপরেও এই সামাজিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্ষেত্রে অবশ্য পুরুষরা এক পরস্পরবিরোধী মানসিকতা পোষণ করেন। একদিকে যেমন পুরুষত্বর অহঙ্কারে তাঁরা দেখতে চান যে তাঁরা নিজেদের চেহারা নিয়ে চিন্তিত নন, তেমনই অপর দিকে মিডিয়ার কল্যাণে তাঁরা বিশেষ ধাঁচের শরীরী গঠন বজায় রাখারও চেষ্টা করেন।”

যদিও আমাদের মনে রাখতে হবে যে মহিলাদের মধ্যে রোগা হওয়ার মানসিকতাটা গোটা বিশ্বেই লক্ষ্য করা যায়। অপরদিকে পুরুষরা মহিলাদের মতন খালি ওজন কমানো নিয়ে মাথা ঘামান না, তাঁরা চান সরু কোমর আর টানটান লম্বা পায়ের সাথে সুগঠিত, ছিপছিপে, স্বাস্থ্যবান চেহারা।

নিমহ্যান্স-এর ডাঃ প্রভা চন্দ্র একটি সমীক্ষায় লক্ষ্য করেন যে সেই বছরে খাদ্যাভ্যাস বিকার বা ইটিং ডিসর্ডারের ৭৫টা কেসের মধ্যে মাত্র দুটো পুরুষদের। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই দুটো কেসই আবার ইটিং ডিসর্ডার নট আদারওয়াইজ স্পেসিফায়েড (ই.ডি.এন.ও.এস) -এর অন্তর্গত। তার মানে পুরুষরা মহিলাদের মতোই শারীরিক ভাবমূর্তি নিয়ে সমস্যা বা খাদ্যাভ্যাস বিকারে ভুগলেও, মহিলাদের মতন চিকিৎসা করাতে যান না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অ্যালায়েন্স অফ ইটিং ডিসর্ডার অ্যাওয়েরনেস-এর মতে, ২.৪ থেকে ৩.৫ মিলিয়ন পুরুষ বিভিন্ন রকমের খাদ্যাভ্যাস বিকারে ভুগছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০% অ্যানোরেক্সিয়াতে মারা যান। অর্থাৎ এই সমস্যাটি খুবই গুরুতর যার অবিলম্বে সমাধান প্রয়োজন।

ঠিক যেই রকম বহু পুরুষই মানসিক অবসাদ এবং দুশ্চিন্তা নিয়ে সচেতন হয়েছেন, তেমনই তাঁদের শারীরিক ভাবমূর্তি নিয়ে সমস্যা বা খাদ্যাভ্যাস বিকার নিয়েও সচেতন হওয়া উচিৎ। সুস্থ্য জীবনের লক্ষ্যে তাঁদের থেকে এইটুকু আশা করে যায়।

তথ্যসূত্র:

স্ট্রদার ই, লেমবার্গ আর, স্ট্যানফোর্ড এস সি এবং টার্বারভিল ডি। “ইটিং ডিসর্ডার ইন মেন: আন্ডারডায়াগনসড, আনট্রিটেড অ্যান্ড মিসআন্ডারস্টুড।” ইটিং ডিসর্ডারস। অক্টোবর ২০১২; ২০(৫);৩৪৬-৩৫৫।

প্রস্তাবিত