We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্নায়বিক অবক্ষয় জনিত অসুস্থতা: অ্যালঝাইমার্স, পার্কিনসন্স এবং ডিমেনশিয়া নিয়ে জীবনযাপন করা

ইদানীং অ্যালঝাইমার্স, পার্কিনসন্স এবং ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক অবক্ষয় (নিউরোডিজেনারেটিভ) জনিত অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। কিন্তু কয়েক দশক আগেও এইধরনের অসুখের প্রকোপ তেমন ছিল না। নিউরোডিজেনারেটিভ অসুখের সূত্রপাত অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স্কদের মধ্যেই হয় বা বংশগত প্রবণতার কারণেও সাধারণত ৬০ বছর বয়সের পর মানুষের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ৪০ বা ৫০ বছরের শুরুতেও নিউরোডিজেনারিটেভ অসুখের সূচনা হতে পারে।

নিউরোডিজেনারেটিভ অসুখে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে এক বা একাধিক অন্য কোনও লাগাতার অসুখের সহাবস্থান দেখা যায়। অর্থাৎ অ্যালঝাইমার্স, পার্কিনসন্স এবং ডিমেনশিয়ার সঙ্গে একজন মানুষের মধ্যে অবসাদ, উদ্বেগ ও অন্যান্য যে কোনও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা হতে পারে। দুটো শারীরিক সমস্যা তথা ডায়াবেটিস (মধুমেহ) বা হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্তচাপ)-এর ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায়।

মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যোগাযোগ

জেরিয়াট্রিক সাইকিয়াট্রিস্ট বা বার্ধক্যজনিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ সৌম্য হেগড়ে বলেছেন, ''নিউরোডিজেনারেটিভ অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অধিকাংশ দীর্ঘস্থায়ী অসুখ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার প্রবণতা বা ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তিত হয়ে ওঠে, অনিশ্চয়তায় ভোগে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের শিকার হয়। সেই সঙ্গে অনেক বাধা ও প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় তাদের।'' যেহেতু প্রত্যেকটি মানুষ ভিন্ন ভিন্নভাবে সমস্যার প্রতিক্রিয়া ও মোকাবিলা করে, সেহেতু মানসিক বিপর্যয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে যদি তার চিহ্ন ও লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা যায় তাহলে তা সাহায্যদায়ক হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা জৈবিক এবং মনো-সামাজিক যে কোনও কারণের ফলেই  হতে পারে। অথবা এই দুটোর মিলিত কারণেও হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার জন্য জৈবিক প্রবণতা দায়ী থাকে; আবার কয়েকজনের ক্ষেত্রে মনোগত বিভিন্ন বিষয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার প্রবণতা বাড়ায়। যেমন-

  • স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু
  • সন্তানদের দ্বারা আঘাত পাওয়া বা পরিত্যক্ত হওয়া
  • অর্থনৈতিক চাপ এবং অবসর জীবনযাপন করা
  • বাসস্থান হারানো
  • বন্ধু ও নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু

মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ এবং সমন্বয় ব্যাধির (শনাক্তযোগ্য বা চেনা-জানা-পরিচিত জীবনের চাপগুলোর জন্য অস্বাভাবিক এবং অত্যধিক প্রতিক্রিয়া দেখানো) মতো কিছু মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা প্রায়শই হতে দেখা যায়, যা একজন রুগির ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। এসব অসুখের বিষয়ে জানা-বোঝা, তার মোকাবিলা করা, অসুস্থতাজনিত প্রতিকূল পরিস্থিতিকে স্বীকার করে নেওয়া এবং সব বাধা অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু মানুষের কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, কয়েকজনের কিছু মাস সময় লাগে আবার এমন মানুষও থাকে যাদের অসুস্থতাজনিত পরিস্থিতি স্বীকার করে নিতে গোটা বছর সময় লেগে যায়। এক্ষেত্রে যদি মনে হয় যে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার কোনও লক্ষণ দেখা দিচ্ছে বা অস্বাভাবিকতার বোধ অনুভূত হচ্ছে তাহলে মানুষের উচিত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া।

চিকিৎসা

যদি গুরুতর দুর্বলতার কারণে কারও মধ্যে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয় এবং লক্ষণগুলো একনাগাড়ে দু'সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, সেই সঙ্গে যদি মানুষের  কর্মশক্তি হ্রাস পায় (দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে না পারা, খুব সহজ কাজ করার ক্ষেত্রে অক্ষমতা, যা অসুখের লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগে খুব সহজেই করা যেত) সেক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক রুগিকে নির্দিষ্ট ওষুধ ও থেরাপির পরামর্শ দিতে পারেন। মানসিক বা মনো-সামাজিক কারণের জন্য প্রয়োজন সাইকোথেরাপির বা একজন অভিজ্ঞ মনোবিদের কাউন্সেলিং অথবা একজন কাউন্সেলরের উচিত রুগির মানসিক অবস্থার গঠনের উপর জোর দেওয়া যাতে সে তার অসুখ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারে এবং তার সীমাবদ্ধতাগুলোকেও বুঝতে পারে।

একজন মানুষ তার অসুস্থতার সময়ে নিজের পরিবারের সদস্য এবং প্রাথমিক পরিচর্যাকারীদের কাছ থেকে লাগাতার সাহায্য পেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিষয় হল রুগির অসুখ সম্পর্কে তার পরিবারের সদস্য ও প্রাথমিক পরিচর্যাকারীদের সঠিক শিক্ষা ও জ্ঞান থাকা। এরা প্রায়শই একজন যোগ্য, সমানুভূতিসম্পন্ন কাউন্সেলরের কাছ থেকে উপকৃত হয়।

অসুখের সময়ে কাউন্সেলিং কীভাবে সাহায্য করে?

অসুখের সময়ে কাউন্সেলিং একজন রুগির ক্ষেত্রে খুবই ফলদায়ক হয়ে ওঠে। প্রথম প্রথম মাঝে মাঝেই ডাক্তারের কাছে যেতে হয়, কিন্তু ক্রমে যখন অসুখের সঙ্গে  একজন মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে এবং তার জীবনে বদল ঘটে তখন ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আর দরকার হয় না। পার্কিনসন্স-এর মতো রোগের ক্ষেত্রে একজন পেশাগত থেরাপিস্ট রুগির জীবনযাপনে সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে অত্যন্ত কার্যকরী ব্যবস্থা বা উপায় অবলম্বন করেন যেখানে রুগি তার কর্মক্ষমতা এবং স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারে।

সঠিক রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা করা

অ্যালঝাইমার্স, পার্কিনসন্স বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের সঠিক নির্ধারণ বা নির্ণয় করা বেশ কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা যুক্ত থাকার ফলে একজন রুগির ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ার বিপদ থাকে। কারণ পরবর্তী পর্যায়ে ঠিক কী ঘটতে চলেছে সেই সম্পর্কে মানুষের কোনও ধারণা থাকে না বা পরবর্তী পর্যায়ের মোকাবিলা কীভাবে সম্ভব সেই বিষয়টাও একজন মানুষের কাছে অজানা থাকে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয় মানুষকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।

যদি আপনি বা আপনারা এসব অসুখের মধ্যে যে কোনও একটায় আক্রান্ত হন তাহলে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা একান্ত জরুরি। এইধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসুখের ক্ষেত্রে আপনি নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করবেন সে বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জেনে নেওয়াও প্রয়োজন।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চাই সঠিক যত্ন

''অসুস্থতার পর্ব নিয়ে প্রত্যেকটি মানুষের অভিজ্ঞতা অনন্য হয় এবং মোকাবিলার পথ বা পন্থাও ভিন্ন হয়। তবে মূল চাবিকাঠিটি হল ইতিবাচক থাকা এবং সমস্যাটিকে খোলা মনে গ্রহণ করা''- এমনটাই মনে করেন ডঃ সৌম্য হেগড়ে। নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য এখানে কয়েকটি উপায়ের কথা বলা হয়েছে-

  • যত্ন এবং নিজের দেখভাল করা- যেহেতু রোগ নির্ণয় রুগির জীবনে বড়সড় পরিবর্তন আনে, তাই তা খুব ক্লান্তিকর হয়। তথাপি গুরুত্বপূর্ণ হল যতদূর সম্ভব নিজের মানসিক সুস্থতা ও দৈহিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল থাকা। সেই সঙ্গে পরিচর্যাকারী ও পরিবারের সদস্যদেরও নিজের যত্নের কাজে শামিল করা একান্ত জরুরি।
  • সাহায্য চাওয়া- মনে রাখতে হবে যে নিউরোডিজেনারেটিভ অসুখ নির্ণয় হওয়া মানেই সামাজিক আদানপ্রদান এবং পারিবারিক দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। রোগ নির্ণয়ের ঘটনাকে ভয়ের বা কলঙ্কজনক বলে মনে করা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে একজন মানুষের উচিত তার প্রতিবেশি, বৃহত্তর পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে নিজের অসুস্থতার কথা বলা এবং তাদের সাহায্য চাওয়া। জীবনে অসুস্থতাজনিত ওঠ-পড়ার সময়ে আমাদের চারপাশে যে সবসময়ে সহায়ক ব্যবস্থা থাকে সেবিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
  • সামাজিক যোগাযোগ- রোগ নির্ণয়ের বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন। আপনার কাছের মানুষকে জানান যে দেখাসাক্ষাৎ করার জন্য আপনি একদম ঠিক আছেন। মাঝে মাঝে বন্ধু ও পরিবারের লোকজনের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। এই সময়টা পার করা খুব কষ্টসাধ্য চেষ্টা বলে মনে  হলেও, কাছে-দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে তা অনেক সহজসাধ্য ও উপভোগ্য বলে মনে হতে পারে।
  • টাকা-পয়সার সঠিক যোগান বা ব্যবস্থাপনা করা- নিজের টাকা-পয়সার ব্যবস্থাপনার কথা পরিবারের বিশ্বাসভাজন কোনও সদস্য বা প্রাথমিক  পরিচর্যাকারীর কাছে বলা জরুরি। নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে সেভিংস অ্যাকাউন্ট করা উচিত এবং সেখানে পরিষ্কারভাবে নিজের নমিনির নাম উল্লেখ করতে হবে। এটাই সবচাইতে ভালো সময় নিজের ইচ্ছাপত্র বা দানপত্র তৈরি করার বা নিজের ধনসম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন ভারপ্রাপ্ত মানুষের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার কথা চিন্তা করা। এবং সেই প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা প্রয়োজন।

প্রবন্ধটি লেখার জন্য ব্যাঙ্গালোরের একজন জেরিয়াট্রিক সাইকিয়াট্রিস্ট বা বার্ধক্যজনিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ সৌম্য হেগড়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।