কাজের সূত্রে স্থানান্তরিত হওয়ার মানসিক প্রভাবকে আমাদের স্বীকার করা প্রয়োজন

নতুন শহর বা দেশে যাওয়া খুবই উত্তেজনাময় একটা ঘটনা। সেখানে নতুন কাজ, নতুন জীবন, নতুন বাসস্থান- সব কিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করার সুযোগ রয়েছে। তবে নতুন শহর বা দেশে যাওয়ার ঘটনায় মানুষের মনে চাপের সৃষ্টি হয়। নিজের চেনা-জানা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ছেড়ে নতুন শহরে গিয়ে মানুষ একাকিত্বে ভুগতে শুরু করে। সেখানে তাকে সাহায্য করার মতো কেউ থাকে না এবং নতুন জীবন শুরু করার জন্য তাকে অনেক কাঠ-খড়ও পোড়াতে হয়। এই ঘটনার প্রভাব কি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পড়ে?

এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়াটা কেন একজন মানুষের উপর চাপের সৃষ্টি করে এবং এর মোকাবিলা করার জন্য মানুষ কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করবে সে বিষয়ে জানার জন্য হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে শ্রীরঞ্জিতা ঝেউরকর কথা বলেছিলেন ব্যাঙ্গালোরের সাক্রা ওয়ার্ল্ড হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাবিনা রাও-এর সঙ্গে।

ক শহর থেকে অন্য শহরে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়াকে আমাদের সবসময়ে মানসিক চাপের ঘটনা বা তা আমাদের মানসিক ক্ষেত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না বলে মনে হয়। এটা কি সত্যি?

আমার মনে হয় মানুষ দেশান্তর বা স্থানান্তরের ঘটনাকে অনেকবেশি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখতে চায়- একে তারা জায়গা বা স্থানের বাস্তব পরিবর্তন বলে ভাবে। অপরদিকে এর ফলে সামাজিকভাবে তাদের জীবনে কতটা বদল ঘটবে, কোন ধরনের সামাজিক পরিকাঠামোর উপর তাদের নির্ভর করতে হবে, সেসব বিষয় নিয়ে তারা তেমনভাবে চিন্তাভাবনা করে না। উপরন্তু, যখন স্ত্রী বা অভিভাবকরা  তাদের স্বামী বা সন্তানের সঙ্গে অন্য শহরে যায় তখন নতুন জায়গায় তাদের কোনও কাজকর্ম বা চাকরিবাকরি থাকে না। প্রত্যেকেই ভাবে যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে। অথচ বয়স্ক মানুষ অর্থাৎ অভিভাবকরা তাদের ৪০-৫০ বছরের পুরনো বন্ধুত্ব, সম্পর্ক পিছনে ফেলে রেখে সন্তানের সঙ্গে নতুন শহরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে হঠাৎ করে তারা একা হয়ে পড়ে। নতুন পরিবেশে তাদের পরিচিত মানুষজন থাকে না। এর ফলে সাংস্কৃতিক দিক থেকে তারা একপ্রকার বিপর্যয়ের
মুখোমুখি হয়।

কিন্তু তারা তো নিজের দেশের মধ্যে অন্য কোনও শহরে যায়… তাহলে সংস্কৃতিগত দিক থেকে তারা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়?

আমি মনে করি না যে মানুষের পক্ষে কোনও বড়সড় পরিবর্তন আগেভাগেই ধারণা করা সম্ভব। তারা ভাবে যে তারা তো নিজের দেশের মধ্যেই থাকছে, তাহলে কী এমন বদল ঘটবে? আমার মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে মানুষ অনেক বেশি প্রস্তুত থাকে। আমার এরকম অনেক রুগি আছে যারা অন্য দেশে বসবাস করছে। তারা সবাই কিছু বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে, তারা যে দেশে যাচ্ছে সেখানে খুব ঠান্ডা পড়ে,  সেই দেশে তারা কাউকে চেনে না, তারা সে দেশের মানুষের ভাষা বুঝতে পারবে না প্রভৃতি। যখন কেউ নতুন দেশে যায় তখন তার কখনোই আশা করা উচিত নয় যে পুরনো দেশের সঙ্গে নতুন দেশের সবদিক থেকেই দারুণ মিল থাকবে। এবং পুরনো জায়গায় তারা যেভাবে জীবনযাপন করত নতুন জায়গায়তেও তারা ঠিক সেভাবেই জীবনযাপন করবে- এমন প্রত্যাশা করাও ঠিক নয়। কিন্তু যখন আমরা দেশের মধ্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাই তখন আমরা ততটা প্রস্তুত থাকি না।

অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েরা যারা প্রথম কাজ পেয়েছে এবং নতুন জায়গায় চলে যাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে কী ঘটে? স্থানান্তর বা দেশান্তরের প্রভাব কীভাবে তাদের উপর পড়ে?  

আমার মতে কমবয়সি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া হয়। একদিকে তারা খুব উত্তেজিত থাকে। কারণ নতুন চাকরি শুরু করা, কয়েকজন আবার ভালো মাইনেও পায়। অনেকের মধ্যে আবার ছোট জায়গা ছেড়ে বড় শহরে যাওয়ার জন্যও উত্তেজনা দেখা দেয়। কিন্তু বড় জায়গার বিশালতা, প্রাচুর্য সম্পর্কে তারা আদৌ প্রস্তুত থাকে না। অনেকের মাঝেও তারা একা হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তারা তাদের কাজের জগৎ থেকে সাহায্য পায়। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে তাদের মধ্যে সম্পর্কজনিত জটিলতা শুরু হয়। এসব ছেলে-মেয়েদের বয়স কুড়ির আশেপাশে থাকে এবং তাদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর, অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা জন্মায়। তাদের হাতে টাকা থাকায় সেই টাকা তারা মদ্যপান এবং ড্রাগের পিছনে খরচ করে এবং এগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে। মানসিক একাকিত্ব, উদ্বেগ কাটানোর জন্য তারা ধূমপান এবং মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

আমার এরকম অনেক রুগি রয়েছে যারা ব্যাঙ্গালোরে আসার আগে পর্যন্ত একটা যৌথ পরিবারে বাস করত। এবং অনেকের ক্ষেত্রেই আবার পুরনো জায়গায় ফিরে যাওয়াটা খুব সহজ হয় না। বিষণ্ণতা এবং একাকিত্ব গ্রাস করার ফলে কারোর পক্ষেই পুরনো অবস্থানে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয় না। নতুন শহরে মানসিক বা অর্থনৈতিক- দুই দিক থেকেই একজন মানুষ নিজেকে নিজেই সাহায্য করতে পারে। এখন প্রশ্ন হল, ব্যাঙ্গালোরের মতো আইটি শহরে একজন মানুষের কাছের লোক কে আছে তা খুঁজে বের করা।

অন্য আরেকটা সমস্যা হল মানসিক পরিণত বোধের অভাব। অনেক ছেলে-মেয়েই সদ্য কলেজ পাশ করে চাকরিতে যোগ দেয় এবং তারা চেষ্টা করে তাদের কাজের জায়গায় নতুন বন্ধু গড়ে তোলার। সেই সঙ্গে তারা তাদের কাজটাকে সামাজিক পরিবেশের অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু প্রত্যেকের পক্ষে কার্যক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্ক যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। এমনকী, এটা ভেবে আমি অবাক হয়ে যাই যে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য যখন তাদের প্রাণপণ চেষ্টা করতে হয় তখন তারা সম্পর্কগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে; এবং কেউ কেউ আবার তাদের সামাজিক জীবনে আবেগপ্রবণ হওয়ারও চেষ্টা করে। অনেকে এই দুটোই পছন্দ করে। এরকম অনেক উদাহরণ আমি দিতে পারি যেখানে আমার কাছে এমন বহু রুগি আসছে যারা তাদের চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে শুধুমাত্র সম্পর্কজনিত সমস্যা মোকাবিলা না করার জন্য।

এই শহরগুলোতে অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েরা কি তথাকথিত সম্পর্কের আড়ালে এমন কোনও বেনামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে যার টানে তারা নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে চাইছে না?

একশো শতাংশ ঠিক বলেছেন আপনি। আমিও অবাক যে কত ছেলে-মেয়ে এক ছাদের নীচে বিয়ে না করেও একসঙ্গে থাকছে, অর্থাৎ নিজেদের মধ্যে লিভ-ইন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে সামাজিকভাবে লিভ-ইন সম্পর্ক স্বীকার করা হয় না।

ধরুন যখন কেউ লিভ-ইন করার সময়ে নিজে বাড়িতে ফেরে এবং তার পরিবারের মানুষজন সেই সম্পর্ককে স্বীকার করতে চায় না, তখন কী ঘটনা ঘটে? এই দুই ধরনের জীবনযাপনের ধরন তো একদম আলাদা।

হ্যাঁ, এটা একেবারে সত্যি কথা। প্রায় সব কমবয়সি ছেলে-মেয়ের মধ্যে আকছাড় এই ঘটনা ঘটছে। এই কাজটা তারা খুব চিন্তাভাবনা করে করছে কিনা, সে বিষয়ে আমি একেবারেই নিশ্চিত নই। কারণ প্রথমত- একজনকে যখন নতুন শহরে এসে সেখানকার জীবনযাপনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে, সেখানে সে কখনোই ওই কাজে সফল হওয়ার আগে কোনও বিশেষ সম্পর্কে জড়াতে চাইছে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে। অথবা তারা এমন কোনও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে কিনা, যাকে নিয়ে তারা অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হতে পারে। আমি এরকম কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি যারা অপরের সঙ্গে কোনওরকম কথাবার্তা ছাড়াই অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এক্ষেত্রেও আমি নিশ্চিত নই যে এই কাজটা তারা খুব ভাবনাচিন্তা করে করছে কিনা। এমনও ঘটনা দেখা গিয়েছে যে দু'জনের মধ্যে একজন বিয়ে করতে চাইলেও অন্যজন কখনোই বিয়ের ব্যাপারে রাজি নয়। তখনই যে বিয়ে করতে চাইছে তার কাছে এই বিষয়টা খুব বেদনাদায়ক হয়ে উঠছে এবং কখনও কখনও সে আত্মহত্যার কথাও চিন্তা করছে। এই ঘটনা যে দুটো মানুষের পরিণত ভাবনাচিন্তার ফল, তা কিন্তু নয়। আসলে এটা নির্ভর করে মানুষের নিজস্ব ধ্যানধারণার উপর।

চাকরি সূত্রে এক দেশ থেকে অন্য দেশ বা এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়া-আসা ইদানীং ঘন ঘন ঘটছে। যদি আপনি যে কোনও অফিস বা অঞ্চলের উপর নজর রাখেন তাহলে দেখবেন যে এমন অনেক মানুষ সেখানে রয়েছে যারা অন্য কোনও শহর বা দেশ থেকে সেখানে এসেছে। অচেনা জায়গা, অচেনা পরিবেশে তারা একদম নতুন- একথা জানা সত্ত্বেও এই ঘটনা মেনে নেওয়া কি তাদের কাছে খুব সহজ নাকি কঠিন হচ্ছে?

আমি বলব যে, জনসংখ্যার একটা বড় অংশ নতুন জায়গায় গিয়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতও করছে। কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কম শতাংশ মানুষই রয়েছে যারা নিজের শহর, বাড়ি, দেশ, নিজের খাদ্যাভ্যাস প্রভৃতির কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে বা বাদ দিয়ে নতুন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে নিতে পেরেছে। এটাই হল ভেবে দেখার মতো একটা বিষয়।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার ফলেই কি মানুষের মধ্যে নানারকম মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে?

আমার মতে, এই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগকে চিহ্নিত করা যায়। নেশার দ্রব্যের প্রতি আসক্তি হল এর আরেকটা ফলাফল। কুড়ি-তিরিশ বছর বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এই ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। কাজের চাপের থেকে মনকে অন্য দিকে ঘোরানোর জন্য যথেষ্ঠ সময়ে এসব ছেলে-মেয়েদের কাছে না থাকার ফলে তাদের মনে প্রভূত সংশয়, বিষণ্ণতা জন্ম নিচ্ছে। দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা তাদের কাজ করতে হয়। তাই যদি তাদের পরামর্শ দেওয়া হয় যে বেশ কিছু সময় যেন তারা বন্ধুবান্ধব বা শরীরচর্চা করে কাটায়, তাহলে সেই  সময়টুকুও তাদের কাছে সত্যিই থাকে না। তাই দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে তারা কোনওমতে খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পড়তে চায়। অফিসে কাজকর্ম সেরে তারা যখন বাড়ি ফেরে তখন সিনেমা বা ইউটিউব দেখার ক্ষমতা থাকলেও জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করার শক্তি তাদের থাকে না। তাই পরিস্থিতিই এমন যে তাদের কাছ থেকে এগুলো প্রত্যাশা করলেও সেই প্রত্যাশা পূরণের সময় সত্যিই তাদের
কাছে নেই।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য যে চাপ মানুষের মনে জন্মায় তা কাটানোর জন্য কী করা জরুরি?

যে দেশে সে যাচ্ছে সেই দেশের মানুষ কোন ভাষায় কথা বলে, কী ধরনের জামাকাপড় পরে, সেই দেশের সংস্কৃতি কীরকম, কী ধরনের খাবার খায় তারা, তাদের জীবনযাত্রার মান কীরকম, নতুন দেশে আমার নিজের দেশের লোক কেউ রয়েছে কিনা বা কোথায় গেলে তাদের দেখা পাওয়া যাবে তা খোঁজ নেওয়া, কীভাবে নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়া যায় তার সন্ধান করা প্রভৃতি একান্ত জরুরি। স্থানান্তরিত হওয়াকে শুধুমাত্র রোমাঞ্চ হিসেবে না দেখে এর গুরুত্বকে যথাযথভাবে স্বীকার করা দরকার। যে কোনও নতুন বিষয়ই মানুষের কাছে চাপের হয়। যেমন- নতুন বিয়ে, সন্তান হওয়া, নতুন বাড়ি কেনা, নতুন বাড়ি বানানো এবং পুরনো জায়গা ছেড়ে নতুন জায়গায় যাওয়া। এক শহর থেকে অন্য শহরে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার ফলে মানুষের মনে যে চাপের সৃষ্টি হয় তাকে আমাদের আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একে শুধু আনন্দ বা উপভোগ করার মতো বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। বাস্তবটা হল মানুষ যে জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত সেখান থেকে যদি সে অন্য জায়গায় চলে যায় তাহলে সেই জায়গার সঙ্গে পুরনো জায়গার কোনও মিল থাকে না।

যখন কেউ ভারত থেকে আমেরিকার কোনও কলেজে পড়তে যাচ্ছে তখন কলেজের সিনিয়ররা তাকে বিভিন্ন জিনিসের তালিকা করে দেয়। যেমন- তাকে সঙ্গে করে কী কী জিনিস আনতে হবে, নতুন দেশে কোন কোন জায়গা সে দেখবে, কোথায় কোথায় যাবে, নতুন দেশকে নিয়ে তার কীরকম প্রত্যাশা রাখা উচিত প্রভৃতি। কিন্তু দেশের মধ্যে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে হলে তাকে এত বিষয়ের খোঁজখবর না রাখলেও চলবে। যদি সে চায় তাহলে যে জায়গায় সে যাচ্ছে সেই জায়গায় তার আগে যে গিয়েছে সেই লোকের কাছে থেকে সে নানারকম খবরাখবর নিতে পারে। সেই লোকের সঙ্গে কথপোকথন করলে নতুন জায়গা সম্বন্ধে একটা ধারণা জন্মায় এবং নিজের প্রত্যাশাগুলো ঠিক করে নেওয়া যায়।

এক্ষেত্রে মানুষ কীভাবে বুঝবে যে তার সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে?

যদি কেউ একা মানুষ হয় তাহলে তাকে নিজের কর্মক্ষেত্র, কাজ নিয়ে উৎসাহী হয়ে উঠতে হয়, উপভোগ করতে হয়। যদি শুরুতে উত্তেজনা না থাকে তাহলে নিজের কাজের ক্ষেত্রে তার কোনও উৎসাহ থাকবে না। এটাই লক্ষণ। দেখতে হবে কোনও মানুষের কি হঠাৎ করে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশাতে অনীহা হচ্ছে, সে কি বন্ধুদের সঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছে? তাহলে সেই মুহূর্তে নিজেকে থামাতে হবে এবং জিজ্ঞাসা করতে হবে কী করলে আবার নিজেকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া যাবে? জিম বা নাচের ক্লাসে যেতে হবে অথবা নিজের পছন্দের কাজ করতে হবে...

একজন স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কী ঘটে? অনেক মহিলাকেই বিয়ের পর অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়, নতুন শহরে গিয়ে তার স্বামীই তার একমাত্র পরিচিত মানুষ হয় এবং স্বামীর তখন নিজের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়ার জোগাড় হয় ও তারা সেই শহরে, নিজের বাড়িতে একা হয়ে যায়...

সেই সঙ্গে অনেক মহিলাদেরই একটা বা দুটো বাচ্চা থাকে। তাদের দেখাশোনা করার জন্য তারা বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতেই পারে না। এবং মহিলার শ্বশুরবাড়ির লোক বা তার অভিভাবকরাও এক্ষেত্রে খুব কমই তাদের সাহায্য করতে সক্ষম হয়। তাই এক্ষেত্রে নিজেকে সাহায্য করার জন্য একজন মহিলাকে নিজে থেকে উদ্যোগ নিতে হয়। তখন তাকে এমনসব সামাজিক জায়গায় যেতে হবে, যেমন- ধর্মীয় স্থান যেখানে অনেক মানুষের ভিড় হয়, যোগা সেন্টার, পার্ক বা চেনা-পরিচিত কারোর বাড়িতে যাওয়া দরকার যেখানে সে অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে  পারবে। এমনসব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে যাদেরকে বন্ধু করা যায়। তারা হয়তো প্রথমে কারোর বন্ধু হতে নাও চাইতে পারে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলাটা শুরু করা জরুরি। আর তা না হলে মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ এবং সামাজিক উদ্বেগের জন্ম হয়। তাই নিজেদের জন্য এমন সামাজিক জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেখানে অন্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করার
সুযোগ থাকে।

বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কী হয়? এই ঘটনা কি তাদের কাছে খুবই কষ্টদায়ক হয়?

আমার মতে এটা একটা সত্যিই বড় বাধা। কারণ ৫০-৬০ বছরের মানুষ নিজেদের মনের খোরাকের জন্য সমবয়সিদের খোঁজ করে। খুব কম জায়গাতেই তারা যাতায়াত করতে পারে। যেমন- বয়স্ক নাগরিক কেন্দ্র। কিন্তু সেসব জায়গায় আবার টাকা খরচের প্রশ্নও থাকে। অনেক বয়স্ক মানুষই টাকা খরচের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখায় না। এসবের ফলে তারা বাড়িতে একেবারে একা হয়ে যেতে শুরু করে। বাড়ির কাছেপিঠে কোনও পার্কে বা ধর্মীয় স্থানেও তারা আর সেভাবে যেতে পারে না। অধিকাংশ মানুষই উঁচু উঁচু আবাসনে থাকে তাই তাদের ক্ষেত্রে নিদেনপক্ষে রাস্তাঘাটে হাঁটাহাঁটি করাও সহজ হয় না। এক্ষেত্রে বয়স্ক মানুষের উচিত নিজেদের জন্য সামাজিকভাবে সহযোগিতা করতে পারে এমন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা। এজন্য শুধুমাত্র ছেলে বা ছেলের বউ-এর উপরে নির্ভর করা ঠিক নয়।

 

এই বিষয়ে আরও জানার জন্য পড়তে পারেন-

চাকরি সূত্রে স্থানান্তর: কর্মীদের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের সাহায্য : মল্লিকা শর্মা

 

          

 

 

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত