We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

স্থানান্তরের পরেঃ অচেনা শহরে ছোট ছোট সমস্যাগুলো আমায় বিরক্ত করছিল

আমি এমন একটা জায়গায় যেতে চাইতাম যেখানে আমার জানা-শোনা কোনও মানুষজন থাকবে না!

এই চিন্তাভাবনার জন্য আমি বরোদা থেকে মুম্বই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। মুম্বই শহরটি আমার কাছে কেবলমাত্র আমার কর্মসূত্রে পরিচিত ছিল। কারণ আমি যে কোম্পানিতে কাজ করতাম, সেই কোম্পানির সদরদপ্তর ছিল মুম্বইয়ে। সেখানে আমার বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্য বলতে কেউ ছিল না। আমার আশা ছিল মুম্বইয়ে যেহেতু দেশের সমস্ত অঞ্চল বা রাজ্যের ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করে,  সেহেতু সেখানে কোনওরকম ভাষাগত বা সংস্কৃতিগত সমস্যর মুখোমুখি না হয়েও, সমস্ত বাধা দূর করা সম্ভবপর হবে। মুম্বই শহরটি আমার কাছে খুবই নিরাপদ বলে মনে হয়েছিল এবং এই বিশ্বাসটিই আমার মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে গিয়েছিল।

এক দশকের পুরনো চাকরি ছেড়ে, নিজের বাড়ির নিরাপদ আশ্রয়কে পিছনে ফেলে এবং পরিচিত সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমি এক অচেনার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে গেলে মুম্বইয়ে আসার পর প্রথম ছ'মাসের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই ভয়াবহ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তখন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হত। খাওয়াদাওয়া থেকে বাসস্থান- দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুই  আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। যার ফলে আমি অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আমার স্বাস্থ্যের সমস্যা। আমার এমন একটি অটোইমিউন সমস্যা ছিল যেখানে মানসিক চাপ জন্মানো খুবই বিপজ্জনক বলে গন্য হত। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার জন্য আমায় প্রচুর  বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজেকে মানসিক চাপের কবল থেকে দূরে রাখা।

আমার আগের দেখা মুম্বইয়ের থেকে এবারের মুম্বইকে অনেকাংশে আলাদা বলে  মনে হয়েছিল। প্রত্যেকের কাছেই এই শহরটি স্বপ্নের বলে মনে হয়। কিন্তু কেউই এই শহরের নানারকম অসুবিধা বা সমস্যাগুলোর কথা বলে না। যেমন- জলের সমস্যা, নিত্যযাত্রীদের অসুবিধা, স্থান সংকুলানগত সমস্যা, রাস্তাঘাটে যানজট, চারদিকে দূষণ ও চিৎকার-চেঁচামেচি প্রভৃতি সমস্যাগুলো শহরের কোনায় কোনায়  ছড়িয়ে পড়েছিল। সবচাইতে যে বড় সমস্যাটা আমি এই শহরে এসে ভোগ করেছি তা হল স্থানগত দূরত্বের সমস্যা। ছোট শহর থেকে এসেছিলাম বলে মুম্বইয়ে কোনও জায়গায় যাওয়ার জন্য ট্রেনে দু'ঘন্টা সময় কাটানোটা আমায় একেবারে দিশাহারা করে তুলেছিল।

তিনবছর এই শহরে কাটানোর পরে আজ আমি অনেক স্বচ্ছন্দ বোধ করি। যখন প্রথম-প্রথম মুম্বইয়ে এসেছিলাম তখন আমি ছিলাম খুব লাজুক, নিস্তেজ স্বভাবের। কিন্তু এখন আমি অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছি। এই শহর আমায় শিক্ষা দিয়েছে যে নিজের কথা শোনা, নিজের চিন্তাভাবনাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আমি নিজে কী চাইছি তা জানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কারণ এর থেকেই বোঝা যায় যে একজন মানুষ কী চাইছে না। আসলে শিশুসুলভ ভেল্কিবাজির কারণে আমার মধ্যে জেগে ওঠা নানারকম প্রত্যাশার জন্য আমি মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছিলাম।

এমন একটা দিন ছিল যখন আমি পরিচিত মুখগুলোর দিকে চেয়ে ব্যাকুলভাবে প্রার্থনা করতাম যে তারা যেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসে এবং আমি কী করছি তা আমায় জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু আজ যখন আমি সবসময়ে লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করি তখন আমি এমন কয়েকজন পরিচিত মানুষজনকে দেখতে পাই যারা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। কিন্তু আমরা কখনোই একে অপরের নাম জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করি না। শুধু চোখাচুখি, নরম হাসি এবং মৃদু সম্ভাষণই এক্ষেত্রে যথেষ্ঠ বলে মনে হয়। হতে পারে এগুলো এতই সূক্ষ্ম বিষয়, যা কখনোই আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।

এক জনহীন রাতে আমার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে বসে কথা বলছিলাম, যে এখন আর  মুম্বই শহরে বসবাস করে না। কিন্তু একসময়ে করত এবং এইধরনের বড় শহরের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সে আমায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ  শিক্ষা দিয়েছিল। সেই ছিল আমার অভিভাবকসম একজন মানুষ, আমার বিপদকালীন নম্বর, আমার হেল্পলাইন এবং আমার সমস্ত আপদে-বিপদে পাশে থাকার সঙ্গী। এসব বড় শহরে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তার সবচাইতে বড় পরামর্শ ছিল নতুন শহর সম্পর্কে নিজের স্মৃতির মণিকোঠায় একটা ছবি গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে শহরের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা, শহরের কোনায় কোনায় নতুন জিনিস খুঁজে বের করা, নিজের ভালো লাগার জায়গা তৈরি করা, নিজের পছন্দের খাবারদাবারগুলোর তালিকা করা, যখনই বিষণ্ণ লাগবে তখনই নিজের ভালো লাগার জায়গায় যাওয়া, যে দোকান থেকে প্রায়ই নানারকম জিনিসপত্র কেনা হয় সেখানে গিয়ে দোকানবাজার করা প্রভৃতি। নতুন শহরে গিয়ে এগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেই নতুন শহরকে নিজের চেনা ঘর বলে মনে হওয়া শুরু হবে। আসলে অজানা, অচেনাকে চিরকালই মানুষ ভয় পায়। আর  জানা, পরিচিত বিষয়ের ক্ষেত্রে  মানুষ সবসময়েই স্বস্তি বোধ করে।

প্রবন্ধটি লিখেছেন মুম্বইবাসী নম্রতা। ইনি ব্যাঙ্কের একজন বিনিয়োগ সংক্রান্ত লেখক হিসেবে কাজ করেন।

এই প্রবন্ধটি দেশান্তর বা স্থানান্তর সংক্রান্ত এবং তার প্রভাব কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও অনুভূতির উপরে পড়ে সেই বিষয়ের অন্তর্গত। এই বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন-

1. কাজের সূত্রে স্থানান্তরিত হওয়ার মানসিক প্রভাবকে আমাদের স্বীকার  করা প্রয়োজন: ডঃ সাবিনা রাও

2.Employers must focus on the emotional cost of relocation: Maullika Sharma

3.Moving was all of these: a challenge, and adventure and an opportunity to learn about myself: Revathi Krishna.