চাকরি সুত্রে স্থানান্তরঃ আমি যেখানেই গিয়েছি সেই জায়গাকেই আমি নিজের বাড়ি মনে করেছি

নন্দিনী দত্ত স্মরণ করছেন বিভিন্ন দেশে বাস করার তাঁর অভিজ্ঞতা, এবং এর ফলে তিনি নিজেকে কীভাবে চিনতে শিখেছেন

 

জীবনে বহুবার আমায় এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে হয়েছিল এবং সেজন্য আমার জীবনে অনেক অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাগুলো কোনও না  কোনওভাবে আমায় কম-বেশি নাড়াও দিয়েছিল। আমি বড় হয়েছি দক্ষিণ আফ্রিকাভুক্ত লেসোথো নামক একটা জায়গায়। যখন আমার দশ বছর বয়স তখন আমার বাবা-মা কলকাতায় চলে আসে। তখন যে আমি পুরোপুরি একটা সংস্কৃতিগত সংকটের মধ্যে পড়েছিলাম, তা নয়। কারণ প্রত্যেকবার গরমের সময়ে আমরা ভারতে আসতাম। কিন্তু কলকাতায় এসে সেই শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হতে আমার সময় লেগেছিল। যখন আমি নতুন শহরে এসে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম তখন দেখলাম এমন অনেকেই আছে যাদের সঙ্গে আগে এই শহরের তেমন পরিচয় ছিল না। তাদের সঙ্গে আস্তে আস্তে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে শুরু করল। আমার জীবনে আমার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা খুবই শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল। কিন্তু পুরনো জায়গার বন্ধুবান্ধব, পরিচিত খাবারদাবার এবং টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান না দেখতে পাওয়ার একটা কষ্ট আমি প্রায়শই উপলব্ধি করতাম।

এর কয়েক বছর পরে আমরা আবার দিল্লি চলে যাই। সেখানে গিয়ে আমি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে এগারো ও বারো ক্লাস পড়াশোনা করেছিলাম। স্কুলের প্রথম কয়েকটা মাস নতুন বন্ধুদের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হয়নি। তাদের নিজস্ব একটা দল ছিল, যা নিয়ে তারা দলবাজি করে বেড়াতো। কোন দলে আমি মানানসই হব তা আমি নিজেই জানতাম না। এমনিতে আমি খুবই সামাজিক এবং মিশুকে প্রকৃতির ছিলাম। কিন্তু দিল্লিতে থাকাকালীন এই সময়টায় আমি  অত্যন্ত একাকিত্বে ভুগতাম। পুরবর্তীকালে অবশ্য সেখানে আমার বন্ধুবান্ধব গড়ে ওঠে। তখন স্কুলটাই ছিল আমার কাছে ভীষণ প্রিয়। তবে বাড়ির পরিবেশটা হয়ে উঠেছিল বড্ড একঘেয়ে। কলকাতার মতো দিল্লিতে আমি বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়দের সাহচর্য তেমন পায়নি। ফলে সেখানে আমি খুব একা হয়ে গিয়েছিলাম। দুপুর ২টোয় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে হয় আমি পড়তে বসে যেতাম অথবা একঘেয়েভাবে আমার সময় কাটতো।

ওটাই ছিল এমন একটা সময় যখন থেকে আমি নিজেকে চিনতে-জানতে শুরু করেছিলাম। নিজের মধ্যে আমি সেই সময় কিছু অন্ধকার দিক খুঁজে পেয়েছিলাম, যেমন- কোনও পরিস্থিতিকে যদি আমি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারতাম তাহলে সেই পরিস্থিতি আমার কাছে অসহ্য বলে মনে হত।

কলেজে পড়ার জন্য আমি কানাডায় চলে যাই। কারণ আমি একটা নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চেয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকে আমি এমন মানুষজনের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছি যেখানে আমায় কখনও নিজের হাতে চা করে খেতে হয়নি। কিন্তু কানাডায় এসে আমায় রান্নাঘরে ঢুকে হাত পুড়িয়ে নিজের খাবার নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে, তা সে পাস্তা বা স্যান্ডউইচ- যাই হোক না কেন। কানাডায় পড়ার সময়ে ৫-৬ মাস আমি প্রচণ্ড শীতের মধ্যে কাটিয়েছিলাম। তখন আমি বরফ পড়া দেখেছিলাম, যা আমার কাছে একটা নতুন ও উত্তেজক ঘটনা ছিল। সেই সময়ে আমি প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম যে নিজের কাজ আমি নিজেই করতে পারি। ফলে আমার মধ্যে একপ্রকার শক্তি জন্মেছিল। আমি স্বাধীন ও স্বনির্ভর হয়ে উঠেছিলাম।

কলেজের পড়া শেষ করে আমি কানাডা থেকে দিল্লি ফিরে আসি এবং চাকরি খুঁজতে শুরু করি। দিল্লিতে আমি বড় হয়েছি, জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি তবু সেখানে বন্ধুবান্ধব বলতে আমার বিশেষ কেউ ছিল না। তাই দিল্লিকে আমার কখনোই নিজের শহর বলে মনে হত না। সেই সময় আমি খুব হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। শেষমেশ আমি ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাই এবং সেই কাজেই আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। কাজের জায়গায় সহকর্মীদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। যদিও প্রত্যেকের চেয়েই আমি বয়সে ছোট ছিলাম। সেই সঙ্গে একটা সংস্কৃতিগত পার্থক্যও গড়ে উঠেছিল। কারণ যে দিল্লিকে আমি আগে দেখেছিলাম তা পরে অনেক বদলে গিয়েছিল। পরিবর্তিত দিল্লিতে ছিল শপিং সেন্টারের ছড়াছড়ি, ম্যাকডোনাল্ডের মতো দোকানপত্র... আমার প্রতিবেশীদের মধ্যেও অনেক বদল ঘটেছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে আমি মানিয়ে নিতে পারব কিনা তা নিয়ে আমার খুব চিন্তা হত।

আমার সাহায্য পেয়ে আমার কাজের দল বেশ ভালো কাজ করছিল। কিন্তু কাজটা খুব পরিশ্রমসাধ্য ও কঠিন ছিল। যেহেতু আমি একটু সামাজিক মানুষ ছিলাম সেহেতু কখনও কখনও কাজের শেষে আমি সিনেমা দেখতে যেতাম। কিন্তু তেমন উপভোগ করতে পারতাম না। আসলে অনেক বিষয়ের সঙ্গেই আমি একটু-আধটু মানিয়ে নিতে বাধ্য হতাম। ক্রমে আমরা সহকর্মীরা নানারকম খাবারদাবারের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করি। নতুন নতুন খাবারের জায়গা আবিষ্কারের নেশায় আমরা সেই সময়ে মেতে উঠেছিলাম। আমাদের মধ্যে একজন বাঙালি সহকর্মী ছিলেন। তিনি ঠিক আমার মতোই ছিলেন। তাই তাঁর সঙ্গে আমার বেশ মনের মিল হয়েছিল।

আমি এখন উপলব্ধি করতে পারি যে নিজের বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্ট ভোলার জন্য আমি অনেক উপায়, ব্যবস্থা অবলম্বন করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু পরিস্থিতি এবং অভিজ্ঞতা দুটোই ছিল আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। আর সেজন্যই আমার মধ্যে হতাশা জেগে উঠত।

আমি উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য ইউনাইটেড কিংডম-এ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আগে  আমি অবশ্য লন্ডনে গিয়েছিলাম। কিন্ত এবারে আমি লেইসেসটার-এ থাকার ব্যবস্থা করি, যেখানে প্রচুর ভারতীয় থাকত। তবে তাদের অধিকাংশই ব্রিটেনে বড়  হয়েছিল। তাই তাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন ছিল। তাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আমার বেশ অসুবিধা হয়েছিল এবং আত্মপরিচয়ের সংকটও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সমাজতত্ত্বের ক্লাসে, যেখানে ভারতীয় বা এশিয়ার ছাত্র-ছাত্রী খুব কম ছিল, সেখানে কিন্তু আমি অনেক বেশি স্বস্তি পেতাম।

আমি যেখানেই থাকতাম সেখানেই আমি চেষ্টা করতাম নিজস্ব, স্বস্তিদায়ক একটা পরিবেশ গড়ে তুলতে। যেমন- প্রথমবার দিল্লিতে থাকার সময়ে আমার স্কুলজীবনটা ছিল খুব স্বস্তিদায়ক, পরবর্তীকালে আমার কাজের জায়গাতেও স্বস্তি ছিল। ব্রিটেন  এবং কানাডায় থাকার সময়ে কলেজের ক্লাসগুলো ছিল আমার পছন্দের, স্বস্তির জায়গা। এই জায়গাগুলো আমার কাছে সেই জায়গা ছিল যেখানে আমার নিয়ন্ত্রণ থাকত, আমি জোর গলায় বলতে পারতাম আমি এখানে খুব স্বাচ্ছন্দ্য
বোধ করছি।

যখন মাস্টার ডিগ্রি করে আমি দিল্লি ফিরে এলাম তখন পরিস্থিতি আগের থেকে ভালো ছিল। পরিবর্তনগুলো তেমন চরম আকার নেয়নি এবং সেগুলোর সঙ্গে আমায় তেমনভাবে মোকাবিলাও করতে হয়নি। আমার মায়ের একটা সমাজ-কল্যাণমূলক দল ছিল। মা আমায় সেই দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। আমি আমার পুরনো কর্মক্ষেত্রেও এইসময়ে ফিরে গিয়েছিলাম, যা আমার কাছে বরাবরই স্বস্তিদায়ক ছিল। আমি তখন একজন পুরোদস্তুর সমাজতাত্ত্বিক হয়ে উঠেছিলাম। নিজের উপর তখন আমার ভরসা, বিশ্বাস ছিল তুঙ্গে এবং আমার জীবনে শান্তিও ছিল বেশি।

ছোটবেলায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার যাওয়ার সিদ্ধান্তগুলো আমার ছিল না। জোর করে এই বিষয়টা আমায় মেনে নিতে হয়েছিল। যদিও স্থানান্তরের ফলে আমার জীবনে কিছু ভালো ঘটনাও ঘটেছিল।। যেমন- আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে দক্ষিণ আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং সেই পরিস্থিতিতে ভারতে  চলে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। প্রাথমিকভাবে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার কারণে আমার মধ্যে বিরক্তি দেখা দিলেও পরে আমি দেখেছি যে এই স্থানান্তরের ফলে আমি জীবনে কতকিছু পেয়েছি, যেমন- পরিবার, বৃহত্তর পরিবার, আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোন প্রভৃতি। আফ্রিকায় থাকলে আমি কখনো সেইসব
পেতাম না।

আমার অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার পিছনে আমার সিদ্ধান্তই ছিল প্রধান। যেমন- যখন আমি কানাডায় গেলাম তখন আমি নিজের সিদ্ধান্তেই সেখানে গিয়েছি। এবং তখন আমি বেশিরভাগ কাজই নিজের সিদ্ধান্তে করতে চেয়েছিলাম। নানা জায়গার মানুষকে জানতে এবং তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমায় অনেক বেশি সচেষ্ট
হতে হয়েছিল।

যখন আমার বয়স মধ্য কুড়িতে পৌঁছায় তখন আমি চেয়েছিলাম থিতু হতে। সেই  সময়ে আমার মধ্যে নিজের শিকড়ের সন্ধান করাও শুরু হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই আমায় বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক বছর অন্তর এক জায়গা থেকে আরেক  জায়গায় যেতে হত। তাই নিজের শিকড়ের সঙ্গে আমার বড় একটা পরিচয় গড়ে ওঠেনি। আমি নিজে ভারতীয় হয়েও যখন আমি ভারতে ছিলাম তখন নিজেকে আমার বিজাতীয় বা বিদেশি বলে মনে হত। যেহেতু ছোট থেকেই আমি মিশুকে, সামাজিক প্রকৃতির ছিলাম তাই অনেকসময়ে নিজেকে অন্য দেশের বাসিন্দা ভাবার জন্য হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়তাম।

একবার যখন আমি নতুন জায়গায় যেতাম তখন আমি উপলব্ধি করতাম যে আমায় অনেক বিষয়ের সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে এবং সেগুলো অধিকাংশই অভ্যন্তরীণ। আমি কোনওদিনও নতুন খাবারদাবার, নতুন সংস্কৃতি, নতুন মানুষজন নিয়ে তেমনভাবে ভাবনাচিন্তা করিনি। কিন্তু নিজের অন্তরে আমি একটা প্রশ্ন প্রায়শই নিজেকে করেছি যে আমি আসলে কে।

আমি একটা বিষয় উপলব্ধি করেছি যে জীবনে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে বা নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর পুনর্বিবেচনা করার ক্ষমতা জন্মায়। শেষমেশ আমার এটাই ধারণা হয়েছে যে নিজের চাহিদা, প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রত্যাশা পূরণের জন্য আমাদের উচিত সদা
সচেষ্ট হওয়া।

 

এই প্রবন্ধটি দেশান্তর বা স্থানান্তরের প্রভাব কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে পড়ে সেই বিষয়ের অর্ন্তগত। এই বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন-

১. কাজের সূত্রে স্থানান্তরিত হওয়ার মানসিক প্রভাবকে আমাদের স্বীকার করা প্রয়োজন - ডঃ সাবিনা রাও 

২. চাকরি সূত্রে স্থানান্তর: কর্মীদের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের সাহায্য

৩. Moving was all of these: a challenge, and adventure and an opportunity to learn about myself: Revathi Krishna.          

প্রস্তাবিত