অক্ষম শিশুর অভিভাবকত্ব

ওয়ান্ডার নামক বই ও সিনেমা আমাদের সামনে হাজির করেছিল অগি পুলম্যান নামক একটি বাচ্চাকে, যে ট্রেচার কলিন্স সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিল। দশ বছর বয়সে সে প্রথম স্কুলে গিয়েছিল। অগির আচার-আচরণকে নানাদিক থেকে তুলে ধরেছিল ওয়ান্ডার। স্কুলে সে যখন তার প্রিয়জনদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকত তখন তাকে কেমন দেখতে লাগত, তার স্বাস্থ্য কেমন দেখাত- এসব দেখা গিয়েছিল ওয়ান্ডারে । অর্থাৎ  তাকে নিয়ে স্কুলের অন্যান্য বাচ্চারা কতটা কৌতুহলী ছিল, তারা অগির মুখমন্ডলের বিকৃতি নিয়ে তাকে প্রায়ই প্রশ্ন করত বা তাদের নিজেদের মধ্যে তাকে নিয়ে কথাবার্তা বলত। সে তাদের মোকাবিলা করার জন্য কী চিন্তাভাবনা করত? অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ার জন্য নিজের সম্পর্কে তার কেমন বোধ জাগত?- এসব আমরা ওয়ান্ডারে দেখেছিলাম।

গল্পের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল যে তার অভিভাবকরা কীভাবে এই পরিবর্তনের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিল। যখন অভিভাবকরা জানছে যে তার বাচ্চা আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে আলাদা তখন কীভাবে সেই বাচ্চাকে তারা স্কুলে পাঠাবে? অভিভাবক হিসেবে আপনি বা আপনারা কি চিন্তায় থাকবেন যে বাচ্চাটি যদি স্কুলে গিয়ে অন্যদের আক্রমণের মুখে পড়ে তাহলে কী হবে? কীভাবে সেই ঘটনার  মোকাবিলা করা যাবে? কীভাবে ওই বাচ্চার জন্য একটা সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে অভিভাবকরা কীভাবে চেষ্টা করবে? এবং যখন পৃথিবীর সবাই ওই বাচ্চাটির প্রতি কঠোর মনোভাব দেখাবে তখন অভিভাবকরা কীভাবে তার জবাব দেবে?

যদি আপনি বা আপনারা কোনও অক্ষম বা বিকাশজনিত সমস্যায় ভোগা বাচ্চার অভিভাবক হন তাহলে এই বিষয়গুলোর সম্পর্কে আপনাদের ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি।

অক্ষম শিশুদের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে নানারকম মানসিক বাধার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। কীভাবে অভিভাবকরা এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছিলাম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অশ্লেষা বাগাডিয়া, মনস্তত্ত্ববিদ ডঃ নিথ্য পূর্ণিমা এবং কাউন্সেলর গায়িত্রি ভাট-এর সঙ্গে।

নিজের মনের দুঃখ অতিক্রম করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- অক্ষম শিশুরা যাতে নানারকম বাধার মোকাবিলা করতে পারে সেজন্য অভিভাবকদের উচিত তাদের সাহায্য করা। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা যদি প্রয়োজন বোধ করেন তাহলে একজন কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে পারে।

শিশুদের দক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করা- বাড়িতে কেমন পরিবেশ গড়ে তুলে বাচ্চাকে স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে সহায়তা করা যায় তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। বাচ্চাদের বই, খেলনা বা তাদের অন্যান্য জিনিসপত্র এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে তারা নিজেরাই সেগুলোর কাছে পৌঁছতে পারে; খাবার টেবিলের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে তারা পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করতে পারে।

যখন বাচ্চাদের জন্য কাজকর্মের ব্যবস্থা করতে হবে তখন তাদের কাজ করার ক্ষমতার মাত্রা যাতে তার সঙ্গে মানানসই হয় সেদিকে নজর রাখা দরকার। সেইসঙ্গে তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে যখনই তাদের সাহায্যের দরকার হবে তখনই অভিভাবকরা তাদের পাশে থাকবে।

বাচ্চারা 'আলাদা' বা 'পৃথক' কিছু বোধ করলে অভিভাবকদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে- এই পরিস্থিতিতে একজন বাচ্চাকে বোঝাতে হবে যে অভিভাবক হিসেবে আপনি তাকে ভালোবাসেন বা তাদের বলতে হবে যে তাদের পাশে অনেক শক্তি রয়েছে যা হয়তো চোখে দেখা যাচ্ছে না। পরিবর্তে আপনার বাচ্চার বিপর্যয়কে মূল্য দিয়ে স্বীকার করতে হবে। যেমন তাদের বলতে হবে, ''হ্যাঁ তোমার এই সমস্যাটা সত্যিই বাধাস্বরূপ''।

মনে রাখতে হবে, বাচ্চার বিপর্যয়কে মূল্য দেওয়া মানে তাকেই নির্দিষ্ট বলে মনে করা উচিত নয়। তাদের শুধু বলা জরুরি যে অভিভাবক হিসেবে আপনি বাচ্চার  সমস্যাটা দেখতে পাচ্ছেন। বাচ্চারা কেমন বোধ করছে তা বলতে তাদের উৎসাহ  দিতে হবে। এভাবে আপনি আপনার বাচ্চা যে সমস্যা ভোগ করছে তা সমাধান করার চেষ্টা করতে পারেন। আর এই চেষ্টাতে অভিভাবক হিসেবে আপনার  বাচ্চাকেও আপনি যুক্ত করতে পারেন।  

বাচ্চার ভাব-ভঙ্গিগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে- যেসব বাচ্চারা নিজের  সমস্যার কথা মুখে বলতে পারে না অথবা বুঝতে পারে না যে কী করলে তারা স্বস্তি পাবে, তখন তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা, রাগ বা হতাশা অন্যভাবে প্রকাশ পায়। যেমন- তারা প্রচন্ড অভিমানী হয়ে পড়ে, রেগে যায় বা অসংলগ্ন কাজকর্ম করে। বাচ্চাদের এইধরনের আচরণের উপর খেয়াল রাখতে হবে এবং বোঝার চেষ্টা করতে হবে তাদের আচরণের অস্বাভাবিকতাগুলোকে।

বাচ্চাদের নিজেদের যত্ন নেওয়া শেখাতে হবে- বাচ্চা যত বড় হবে তত দেখতে হবে যে তারা কী কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে এবং বিভিন্ন কাজে তাদের দক্ষতা বাড়াতে  সাহায্য করতে হবে। ছোট ছোট বিষয়ের মধ্য দিয়েই এই উদ্যোগগুলো নিতে হবে। যখন তারা ছোট থাকে তখন তাদের নিজের লালন-পালনের নিয়মকানুন শেখাতে হয়; বাচ্চা যখন একটু বড় হয় তখন তাকে বাজার যাওয়া ও নিজের পছন্দমতো জিনিসপত্র কিনতে শেখানো জরুরি। বাচ্চাদের প্রতি অভিভাবকদের সচেতনতা তাদের ভীষণভাবে উপকার করে। এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ও তাদের বিভিন্ন বিষয়গুলোর প্রতি ওয়াকিবহাল থাকা দরকার। বাচ্চারা যখন পূর্ণবয়স্ক হয় তখন টাকাপয়সার হিসেবনিকেশ শেখানো অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং এই দক্ষতা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক উপকার করে।

শিশুরা যে অভিভাবকদের কাছে মূল্যবান সেকথা বুঝতে তাদের সাহায্য করতে হবে- পরিবারে শিশুদের যে একটা ভীষণ মূল্য রয়েছে সেকথা তাদের বোঝানো জরুরি। এজন্য তাদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সময় কাটানো দরকার। তাদের ভালো কাজ ও গুণগুলোকে প্রশংসা করা দরকার। পরিবারের সদস্য হিসেবে তাদের সিদ্ধান্ত জানা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চাদের সঙ্গে সপ্তাহের শেষ দিনগুলোর কাজকর্মের পরিকল্পনা করতে হবে।

তাদের সমস্যা যে বড় সহজ নয় তা চিহ্নিত করতে হবে- অক্ষম শিশু বা বিকাশজনিত সমস্যার শিকার হওয়া বাচ্চাদের প্রায়শই শারীরিক দিক থেকে অপরের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। অভিভাবক হিসেবে এই বিষয়টি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও মানসিক চাপের। এর ফলে অভিভাবকরা ক্লান্ত বোধ করতে পারে। তারা রেগেও যেতে পারে। এজন্য তাদের নিজেদের চাপ কমানোর জন্যও কিছুটা সময় ব্যয় করা জরুরি। সেজন্য অনলাইন বা অন্যান্য উপায়ে সহযোগী দলের সাহায্য নিতে পারেন অভিভাবকরা।         

  

Was this helpful for you?