মনোরোগের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা বলতে কী বোঝায় এবং এটা কাদের জন্য?

সাইকিয়াট্রিক হসপিটালাইজেশন বা মনোরোগের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা বলতে কী বোঝায়?

যখন একজন রুগিকে কিছু সময়ের জন্য (কয়েক দিনের জন্য বা কয়েক মাসের জন্য) চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় এবং ভর্তি থাকাকালীন তার চিকিৎসা করা হয় সেই পরিস্থিতিকে সাইকিয়াট্রিক হসপিটালাইজেশন বলা হয়। মনোরোগের হাসপাতাল বলতে একটি নিরাপদ পরিবেশকে বোঝানো হয় যেখানে রুগিরা যথাযথ চিকিৎসা ও থেরাপির সাহায্যে তাদের অসুস্থতা কাটিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে।

সাইকিয়াট্রিক হসপিটালাইজেশন কত ধরনের হয়?

২০১৭ সালের মানসিক স্বাস্থ্যসুরক্ষা আইনে (মেন্টাল হেলথ্‌কেয়ার অ্যাক্ট, ২০১৭)  দু'ধরনের হাসপাতালে ভর্তির কথা বলা হয়েছে- স্বেচ্ছায় ভর্তি হওয়া এবং অন্যের সহায়তায় রুগিকে ভর্তি করা। প্রথম ক্ষেত্রে, রুগিদের মধ্যে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও চিকিৎসার জন্য নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। এই আইন অনুযায়ী, রুগির এই ক্ষমতাটি রুগির চিকিৎসার দায়িত্বে থাকে মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞ খতিয়ে দেখেন। এক্ষেত্রে রুগিরা স্বেচ্ছায় হাসপাতালে ভর্তি হয় বলে তারা যেকোনও সময়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে এবং এর জন্য তাদের কারোর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। হাসপাতালে রুগি যেই মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর কাছে ২৪ ঘণ্টার সময় থাকে এটি নির্ধারণ করার যে অসুস্থতার কারণে রুগির নিজের জীবনের কোনও ঝুঁকি নেই এবং তাদের দিক থেকে অন্যের দৈহিক ক্ষতি ও কোনও সম্পত্তি নষ্টেরও সম্ভাবনা নেই।

দ্বিতীয় ধরনের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও ক্ষমতা থাকে না, অথবা এক্ষেত্রে তারা বয়সে নাবালক বা নাবালিকা হওয়ার জন্য তাদের চিকিৎসার সমস্ত সিদ্ধান্ত নেয় তাদের আইনসিদ্ধ অভিভাবকরা। যখন একজন মানুষের মধ্যে নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যায় তখন একজন মনোনীত প্রতিনিধি তার হয়ে তার বিষয়ে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এরপর যখন তারা আবার নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরে পায় তখন আর ওই মনোনীত ব্যক্তির কোনও অধিকার থাকে না তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

যদি মনোনীত প্রতিনিধি খুঁজে পাওয়া না যায় তাহলে রুগির নিকটাত্মীয়রা তাকে  মনোরোগের হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য সম্মতি দিতে পারে। ২০১৭ সালের আইনের দ্বাদশ অধ্যায়ের ধারা ৮৯ (উপধারা)-এ রুগির সক্ষমতাজনিত নিয়মকানুনের ব্যাখ্যা রয়েছে; অন্যের সম্মতির সাহায্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রুগি সর্বোচ্চ কতদিন হাসপাতালে থাকতে পারবে তা ধারা ৮৯ (উপধারা ২)-এ বলা আছে; ধারা ৮৯ (উপধারা ৯)-এ রুগির চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে গঠিত বোর্ডের কাছে চিকিৎসার বিষয়ে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; এবং রুগিকে যদি কোনও কারণে হাসপাতালে ৩০দিনের থেকে বেশি সময় থাকতে হয় তাহলে তার ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ধারা ৯০-এ।

মনোরোগের জন্য একজন মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি ভর্তির সময়সূচি, ভর্তির উদ্দেশ্য এবং হাসপাতালে রুগির চিকিৎসা পরিকল্পনা- এই তিন ভাগে বিভক্ত।

  • অ্যাকিউট হসপিটালাইজেশন

এক্ষেত্রে রুগিরা যখন চরম অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়  তখন তাদের অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এই ঘটনা হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে আপদকালীন ভর্তি হিসেবেও পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হল অসুখের লক্ষণগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রুগি ও তার পরিবার-পরিজনদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা।

এই চিকিৎসা কাদের প্রয়োজন- যারা সাইকোসিস, ম্যানিয়া, গুরুতর অবসাদ, অবসাদজনিত আত্মহত্যার সমস্যা এবং নেশাজাত দ্রব্যের ব্যবহার থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে চাইছে তাদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা প্রযোজ্য।

  • সাইকিয়াট্রিক ইন্টেনসিভ-কেয়ার ইউনিট (মনোরোগের নিবিড় পর্যবেক্ষণ বিভাগ)

একজন রুগির দ্বারা যখন তার নিজের এবং অন্যের ক্ষতি করার ঝুঁকি বা বিপদ আসন্ন হয়ে ওঠে তখন হাসপাতালের এই বিভাগে তার চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হয়। এক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং সুরক্ষার মাত্রা অত্যন্ত বেশি হয়। প্রত্যেকটি রুগির জন্য দু'জন নার্স নিযুক্ত থাকে।

কাদের জন্য এই চিকিৎসা জরুরি- যাদের মধ্যে নিজের ক্ষতি করা বা হিংসাত্মক মনোভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে তাদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

  • দীর্ঘকালীন থাকার বিভাগ (লং-স্টে ওয়ার্ড) বা লং অ্যাডমিশন

এক্ষেত্রে রুগিদের পুনর্বাসনের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে রুগিদের মানসিক অসুস্থতা দূর করার জন্য বিভিন্ন থেরাপির ব্যবস্থা করা হয় এবং সমাজে তাদের বসবাসযোগ্য করে তোলা ও কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।

এই চিকিৎসা পরিষেবা কাদের জন্য দরকার- আসক্তিজনিত সমস্যা, ক্রনিক বা লাগাতার অসুখ এবং স্থায়ী মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য এই পরিষেবা জরুরি।

১৯৬০ সালের শেষদিকে ডিইনস্টিটিউশনালাইজেশন আন্দোলনের আগে রুগিদের পাগলাগারদে বা এইধরনের প্রতিষ্ঠানে সারা জীবনের জন্য ভর্তি করে দেওয়া হত। কিন্তু এই আন্দোলনের ফলে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটেছে। এখন রুগিদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার এবং তার জন্য সামাজিক সুরক্ষার পদক্ষেপ করা হয় (এসিস্টেড লিভিং এবং হাফ ওয়ে হোমের মাধ্যমে)।

  • অবকাশ বা বিরাম

এখানে এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন পর্যন্ত থাকা যায়। বেশ কিছু মানসিক চাপের ঘটনা যেমন- চাকরি চলে যাওয়া, পরিবারের পরিস্থিতির বদল ঘটা বা চাপযুক্ত কোনও কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়।  

কাদের জন্য এটি প্রযোজ্য- যেসব রুগিরা অত্যন্ত মানসিক চাপ বা চাপজনক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করে তাদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

কিছু হাসপাতালে বয়সের অনুপাতে মনোরোগের চিকিৎসা করা হয়। যেমন- শিশুদের জন্য যে মনোরোগ বিভাগ থাকে সেখানে ১৮ বছরের কম বয়সিদের চিকিৎসা হয়। আবার বার্ধক্য বিভাগে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা রুগিদের চিকিৎসা করা হয়। এর ফলে প্রতিটি রুগি নিজেদের নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী চিকিৎসার সুযোগ পায়।

কখন একজন রুগির হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি হয়ে ওঠে?

নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে একজন রুগির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে (নীচের তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়)-

  • যখন নিজের বা অন্যদের দৈহিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে
  • যখন রুগির অসুস্থতা একেবারে চরমে পৌঁছয় কিন্তু রুগি চিকিৎসা করাতে চায় না
  • যখন একজন রুগিকে পর্যবেক্ষণ করে স্পষ্টভাবে তার রোগ নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে ওঠে
  • যখন একজন রুগিকে নানাধরনের ওষুধ খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয় এবং এর জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় ধার্য করা হয়, যে সময়টাতে ডাক্তাররা ভালোভাবে লক্ষ রাখেন যে রুগিদের অসুখের লক্ষণগুলো স্থিতিশীল হচ্ছে কিনা
  • যখন একজন অসুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সামাজিক সহায়তার অভাব থাকে (যেমন- ছাত্ররা যখন পড়াশোনার জন্য নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকে তখন তারা পর্যাপ্ত সামাজিক সাহায্য না-ও পেতে পারে। তখন তার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এমন একটা বিধিবদ্ধ পরিবেশের প্রয়োজন হয় যার সাহায্যে সে তার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে)
  • ড্রাগ ডিটক্সিফিকেশন বা মদক দ্রব্যের বিষাক্ত প্রভাব কাটিয়ে উঠার জন্য
  • যখন সার্বিকভাবে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা দূর করার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়

যদি রুগির পরিস্থিতির সাথে উপরের যে কোনও একটা পরিস্থিতির মিল থাকে সেই ক্ষেত্রেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার আগে একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা একান্ত জরুরি।

যদি আমার পরিচিত কোনও মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হতে না চায় তখন আমি কী করব?

কেউ যদি হাসপাতালে ভর্তি হতে না চায় তাহলে সেই ক্ষেত্রে আইনে ব্যবস্থার কথা বলা আছে। অবিলম্বে বিশেষজ্ঞের দেখাশুনার দরকার রয়েছে অথচ তার পরিচর্যাকারীর পক্ষে তা সম্ভব নয় বা রোগের প্রভাবের কারণে অসুখের ধরনটা রুগি নিজে ঠিকমতো ধরতে পারছে না বলে তার পক্ষে সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝা সম্ভব নয় - এমন একজন রুগিকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে সাপোর্টেড অ্যাডমিশন উপকারী হয়। যেমন- স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রুগিদের ক্ষেত্রে সাইকোটিক পর্যায় চলার সময় তাদের যে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে সে বিষয়ে তারা সচেতন না-ও থাকতে পারে।

এসব পরিস্থিতিতে একজন মনোনীত প্রতিনিধি বা (যেখানে মনোনীত প্রতিনিধি থাকে না সেখানে) রুগির পরিবারের সদস্য মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠানগুলি একজন অসুস্থ মানুষকে রুগি হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারেন। এক্ষেত্রে হাসপাতালে যেতে না চাওয়া রুগিকেও হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়। রুগির ইচ্ছার বিরুদ্ধে এভাবে হাসপাতালে ভর্তি করার সময়ে দু'জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতামত ও সম্মতির প্রয়োজন হয়। তবে হাসপাতালে রুগির সম্মতি নিয়েই তার চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু আপদকালীন পরিস্থিতি বা যখন একজন রুগির সম্মতি দেওয়ার মতো অবস্থা থাকে না তখন তার হয়ে যথাযথ চিকিৎসা করার সম্মতি দেয় মনোনীত প্রতিনিধি বা রুগির নিকটাত্মীয়রা।

মনোরোগের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রুগিদের জন্য আইনে অনেক বেশি শক্তিশালী নিয়মকানুন প্রচলিত আছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হল রুগির সুচিকিৎসার অধিকার সুনিশ্চিত করা। যার ফলে একজন রুগি যখন হাসপাতালে ভর্তি হয় তখন তার প্রতি অবিচারের দৃষ্টান্ত কম দেখা যায়। এই আইনের বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আপনি (৮৫ থেকে ৯৯ ধারার) দ্বাদশ অধ্যায় পড়তে পারেন। মনোরোগের হাসপাতালে ভর্তির সম্পূর্ণ নিয়মকানুন, চিকিৎসা এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার খুঁটিনাটি বিষয় লিপিবদ্ধ আছে।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য ডঃ দিব্যা নাল্লুর এবং ডঃ সন্দীপ দেশপাণ্ডের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।