প্রকৃত শারীরিক গঠনকে যখন অবাস্তব ছাঁচে ফেলা হয়

যখন আপনি চল্লিশ বছর পার করবেন তখন প্রথম যে বিষয়টা আপনাকে সবচাইতে বেশি নাড়া দেবে তা হল আপনি একজন অদৃশ্য মহিলা হয়ে গিয়েছেন। মানুষ আপনাকে ঠেলে চলে যাবে। দোকানে সেল্‌সম্যান আপনাকে মোটেই সময় দেবে না। আলোচনা চলাকালীন অন্যরা আপনার মত উপেক্ষা করবে। অথচ ভাগ্যের এমন পরিহাস যে যখন আপনি আয়নায় নিজেকে দেখবেন তখন নিজেকে আরও বেশি করে আপনি দেখতে পাবেন। অনেকটাই বেশি। কোমরে, যেখানে মেদ বেশ ভালোবেসে বাসা বেঁধেছে। ঠিক যেন থকথকে জেলির মতো, যা ছোঁয়া লাগলে দুলতে থাকে। নিতম্বের ত্বক যেন কমলেলেবুর খোসার মতো খসখসে। মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলার অনেকক্ষণ পরেও চোয়াল দুলতেই থাকবে, যেন নিজস্ব কোনও তালে দুলছে।

পঁয়তাল্লিশের ওপারে পৌঁছে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন খেয়াল করলাম যে গলার স্বর আপনাআপনি উঁচু হয়ে যাচ্ছে কথা বলার সময়, সাধারণভাবে যা সাজগোজ করতাম তার থেকে অনেক বেশী নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে রাখতে শুরু করেছিলাম। আমি নিজেকে বলেছিলাম যে কানে কম শুনতে আরম্ভ করেছি। চোখেও বোধহয় অত ভালো করে দেখতে পারছিনা। সত্যি বলতে কী, অনেক কিছুই কমের দিকে। এবং আমার স্তন? তারা তো আমার থেকে এতটাই দূরে চলে গিয়েছে যে তাদের বেড়ানোর জন্য ভিসা আর পাসপোর্টের প্রয়োজন হয়।

কিন্তু এক্ষেত্রে আমি একা ছিলাম না। আমার চারপাশে থাকা আরও অনেক চল্লিশ পেরোন মহিলাই তাদের দৈহিক গঠন এবং দৈহিক ভাবমূর্তির বাস্তবতার বিষয়ে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। এটা একপ্রকার নিরন্তর প্রক্রিয়া, এবং সম্ভবত যে দৃষ্টিটি আমাদের সবথেকে বেশী সমালোচনা করছে, সেটি আমাদের নিজেদের।

আসলে কখনোই আমি আমার দৈহিক গঠন নিয়ে স্বস্তিতে ছিলাম না। বয়ঃসন্ধিকালে  আমি খুব কম খাওয়াদাওয়া করতাম এবং, যদিও এখন দেখলে নিজেকে তন্বী মনে হয়, ১৭ বছর বয়সের বুদ্ধি অনুযায়ী ওই মোটা চেহারাকে না খেয়ে-খেয়ে বেতের মতো ছিপছিপে করে ফেলেছিলাম। ওই বয়সের একটি মেয়ে যেমন নিজেকে ছিপছিপে, আকর্ষণীয় রাখতে চায় আমিও তেমন চাইতাম। কিন্তু এর ফলে আমার মাথা থেকে খালি চুল উঠতে শুরু করে এবং থুঁতনির আশেপাশে চুল গজিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। সন্তানের জন্মের পর যখন বুঝলাম যে আমার ‘পাতা পেট’ আর কোনদিনও আগের চেহারায় ফিরবে না, তখন খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। আমার শারীরিক গঠন নিয়ে আমার মধ্যে সারাজিবন এক অবিশ্রান্ত যুদ্ধ চলেছে, আমার আদর্শ ধারণা আর শরীরের নিজের ধরণের মধ্যে। এখন উপলব্ধি করতে পারি যে তখন যা ছিল, অর্থাৎ একটি সুস্থ এবং সক্রিয় শারীরিক গঠনটাকে কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, তাকে কোনওদিন সম্মানও করিনি। হলই বা একটু বড়সড়।  

নিজের শরীর নিয়ে প্রথমবার আমার মনে একটা তিক্ততা দেখা দিয়েছিল প্রসব-পরবর্তী পর্যায়ে, যখন নিজের ফোলানো পেটটাকে চুপসানো অবস্থায় দেখেছিলাম।  আমার মনে আছে বাচ্চা হওয়ার পরে আমি টলমলো পায়ে বাথরুমে গিয়ে চুপসে যাওয়া পেটটাকে আয়নায় দেখেছিয়াল, যেন খালি মাঠে একটা চুপসানো প্যারাসুট পড়ে আছে যার গায়ে অনেক কুঁচকে যাওয়া স্ট্রেচ-মার্ক্স রয়েছে। মাতৃত্বের মহিমা নিয়ে কতসত কথা শোনা যায়, অথচ কেউ বলে না যে প্রসবের পড়ে নিজের শারীরিক গঠনের এই বদল মেনে নেওয়া কতটা কষ্টকর। বিশেষত এখনকার যুগে যেখানে ছবি ফটোশপ করা আর পেট মসৃণ করার জন্য প্লাস্টিক সার্জারি করা সাধারণ ঘটনা, এবং সিজারিয়ান অপারেশন করে বাচ্চা প্রসবের যুগ, যেখানে সদ্যজাত ফুটফুটে সন্তানকে কোলে নিয়ে মসৃণ পেটওয়ালা তারকারা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন অপেক্ষারত সাংবাদিকদের সামনে দাড়িয়ে কায়দার পোজ দিয়ে ছবি তোলার জন্য। ওদের দেখে মনে হয় যেন বাচ্চাটি সেলোটেপ দিয়ে পেটের উপর সাঁটা ছিল এতদিন। অবশ্যই এমন নয় যে এর পেছনে কোনও বিজ্ঞান বা পরিশ্রম নেই। প্রসবের পরে সুঠাম শরীর তাড়াতাড়ি ফিরে পাওয়ার জন্য আগে থেকেই খাওয়াদাওয়া এবং ব্যায়ামের উপর নজর দিতে হয়। কিন্তু সাধারণ ঘরের মহিলা যাদের পক্ষে এত ধরণের পেশাদারী সাহায্য লাভ করা সম্ভব নয়, তাদের উপর ওই ধরণের চেহারার চাপ অসম্ভব মাত্রায় বেড়ে যায়। এমনিতেই মহিলাদের এই সময় প্রসব-পরবর্তী অবসাদের সাথে সংঘর্ষ করতে হত, তার উপর আবার শরীর নিয়ে এত চাপ।

প্রসব-পরবর্তী শরীর এমনিতেই গোলমেলে। তবে সেই সঙ্গে এই বিষয়টা সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে খুবই সুন্দর। প্রসব-পরবর্তী সময়ে মেয়েদের নরম, দাগহীন পেটে ফুটে ওঠে স্ট্রেচ মার্ক্স, পেটের চামড়া ঝুলে পড়ে, আয়তনে হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া স্তন চুপসে যায় অথচ আবার কখনই আগের মতো হয় না।

আমার এক বন্ধু আমায় কানে কানে আরেক বন্ধুর কথা বলেছিল যে দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের পরেই “টামী টাক” এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ করার অপারেশন করিয়েছিল। “একেই আমি পরিকল্পনা বলব। ওকে দেখে মনেই হবে না যে দুটো বাচ্চা হয়ে গিয়েছে।” আরেকজন তার পেটের স্ট্রেচ মার্ক্স দূর করার জন্য লেজার প্রক্রিয়ার সাহায্য নিয়েছিল। “আর আমার চিন্তা হল যে শাড়ি পরলে যদি আমার পেটের স্ট্রেচ মার্ক্স দেখা যাচ্ছে কী না।” তৃতীয় জন মেদ কমানোর জন্য স্পট রিডাকশনের সাহায্য নিয়েছিল এক লম্বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে আমার ওই বন্ধু তার সম্ভাব্য খাদ্যতালিকা এবং শরীরচর্চার সব ব্যবস্থা করলেও তার পেট এবং নিতম্ব আর মোটেই ছিপছিপে হয়নি। তার কল্পনায় যা আদর্শ ছিল তার বাস্তব প্রতিফলন ওই বন্ধুর জীবনে দেখা যায়নি।

চল্লিশ বছর বয়সের দৈহিক ভাবমূর্তিকে ঘিরে নানারকম নেতিবাচক মনোভাব  আমাদের চারপাশে থাকা অনেক মানুষের আচরণেই প্রকাশ পায়। যেহেতু তারা তাদের  নিজেদের দৈহিক ভাবমূর্তি নিয়ে সারাক্ষণ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাই তাদের দেখে আমাদের মধ্যেও ওই একইরকম আচরণ দেখা দেয়। কারণ একটা বিষয় নিয়ে অনবরত চর্চা হলে বা কথা বলা হলে সেটাই শেষ পর্যন্ত রীতি ও অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়।

আমরা যদি কোনও কল্পনার বশবর্তী হয়ে স্থান-কাল পাত্রের বোধ হারিয়ে ফেলি তাহলে আমাদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার অভাবজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে, অবসাদও হতে পারে এবং হ্যাঁ, এইধরনের সমস্যা থেকে খাদ্যাভ্যাসজনিত অব্যবস্থা, নিজের দৈহিক গঠন পরিবর্তনের জন্য ওষুধের প্রতি আসক্তির মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। চল্লিশ বছরের পরে কিছু মহিলা নিজেকে 'গ্রহণযোগ্য' ছিপছিপে করে তোলার জন্য খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এই সমস্যা অনেকের  জীবনে বয়ঃসন্ধিকালেও হতে পারে। কিন্তু একটা বিষয় আমরা কিছুতেই বুঝতে চাই না যে কম বয়সের রোগা, ছিপছিপে চেহারা মধ্য বয়স বা বেশি বয়সে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ মহিলাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীরে মেটাবলিক প্রক্রিয়া ও হরমোনের বদল সমানে চলতে থাকে।

আমাদের বয়স যত বাড়তে থাকে তত শরীরের বাড়বাড়ন্ত কমতে থাকে, পেশির ঋজুতা বা সবলতা হারিয়ে যেতে থাকে। পেশির সবলতা আমাদের শরীরে ক্যালোরি পুড়িয়ে মেটাবলিজমের হার বা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে শরীরের বাড়বাড়ন্ত করতে সাহায্য করে থাকে। এর থেকেই শুরু হয় শরীরের ওজন বাড়া-কমার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই মেটাবলিজম প্রক্রিয়ার শুরুতে মানুষ অনেক কম পরিশ্রম করে নিজেকে সুন্দর রাখতে পারে। এই তত্ত্ব মেনেই সভ্যতা-সংস্কৃতির সৌন্দর্য, বিকাশও ঘটে। ওয়ালিশ সিম্পসন বলেছেন, স্বাভাবিকত্বের বাইরে গিয়ে মানুষ যখন জোর করে কম খেয়ে, নিয়মিত শরীরচর্চা করে নিজেকে রোগা করে তোলে তখন তা একটা সময়ে গিয়ে খুবই হাস্যকর হয়ে যায় এবং তা মানুষের নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ই বহন করে।

যে সব পুরুষ তাদের দৈহিক ভাবমূর্তির সমস্যায় ভোগে তাদের মধ্যে চুলবিহীন মানুষ বা টাকমাথার লোকেরাই এগিয়ে থাকে। সাধারণভাবে বয়স্কদের মধ্যে টাকমাথার সমস্যার জন্য আত্মনির্ভরতা হারিয়ে যেতে থাকে বা খুব বেশি বয়স হয়নি এমন মানুষ যাদের অল্পবয়সেই চুল উঠে যাওয়ার সমস্যা থাকে তাদের ক্ষেত্রেও এই জটিলতা দেখা দেয়। যদিও আমরা বলি যে মহিলাদের উপর স্লিম হওয়া বা চেহারাকে সাইজ জিরো করার পারিপার্শ্বিক চাপ থাকে না তাহলে তা  আদৌ সত্যি নয়। কারণ সেটা থাকে বলেই জিম করা বা অন্যান্য কঠোর শরীরচর্চা করার হিড়িক বা বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও আমরা মুখে বলে থাকি যে কেন বা বার্বি পুতুলের মতো চেহারা করাটা কোনও কঠিন কাজ নয়। কিন্তু একটা  কথা ভুলে গেলে চলবে না যে কেনকে কখনও সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর পেটে কোঁচকানো দাগ বা প্রসব-পরবর্তী অবসাদের শিকার হতে হয় না।

আমার এক বন্ধু বিয়াল্লিশ বছর বয়সে প্রথম জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করতে শুরু করে। এর আগে তার দৈনন্দিন রুটিনে শরীরচর্চার নামগন্ধ ছিল না। যদিও শরীরচর্চা করা সবদিক থেকেই ভালো। কারণ এর ফলে জীবনে সুলক্ষ্যের দিশা স্থির করা সম্ভব। কিন্তু শরীরচর্চা যদি মানুষের মনে সংস্কারের জন্ম দেয় তখনই তা ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিনেই যদি কেউ একসঙ্গে যোগব্যায়াম, জিম এবং দৌড়ে ছিপছিপে চেহারা বানাতে চায় তাহলে তা খুবই চাপের হয়ে দাঁড়ায়। যেমন- আমার বন্ধু তার বারো বছরের পুরনো অভ্যাস হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে জোর করে নিজের খাদ্যাভ্যাসের বদল ঘটিয়েছিল। কারণ সে ভেবেছিলযে সে খুব মোটা হয়ে গিয়েছে (কিন্তু সে আদৌ তত মোটা ছিল না, যথেষ্ট মানানসই ছিল)।

অন্যদিকে, আমি এমন অনেককে চিনি যারা শুধু নিজের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিত। কারণ তারা ভাবত যে তাদের জীবনে মেনোপজ আসন্ন। সেজন্য রোগা হওয়াটা যত না বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার থেকে অনেক বেশি জরুরি নিজেদের সুস্থ রাখা। মহিলাদের মেনোপজ মানেই শরীরের বয়স বাড়ছে আর তাই সুস্থভাবে জীবনযাপন করাটাকেই এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এই কারণে রোগা হওয়ার চাইতে মহিলাদের লক্ষ্য সুস্থ থাকার দিকেই স্থানান্তরিত হয়েছিল। সুস্থ থাকার জন্য দৈনন্দিন কার্যকলাপ এবং খাদ্যাভ্যাসের তালিকাতেও পরিবর্তন করা জরুরি। এক্ষেত্রে নিজেকে সুন্দর করার জন্য এহেন বদলের ভাবনা একেবারেই যথাযথ নয়। সৌভাগ্যবশত অনেক মহিলাই এই বিষয়টা উপলব্ধি করে। কিন্তু সমস্যা হল তারা এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছতে পারেনি।

ওজন কমানোর শিল্পের থেকে প্রসাধন এবং ওজন কমানোর শিল্পের কুপ্রভাব মানুষের আত্মবিশ্বাসকে একেবারে তলানিতে পৌঁছে দেয়। গণমাধ্যমও এক্ষেত্রে কম অপরাধী নয়। যখন ত্রিশ বছর বয়সিরা বার্ধক্য-নিরোধক ক্রিম বেশি পরিমাণে ব্যবহার করতে থাকে তখন চল্লিশ পেরনো মহিলারাও নিজেদের রূপ ধরে রাখার জন্য এহেন ক্রিমে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে একই ফল প্রত্যাশা করে। আসলে রুপোলি পর্দার চল্লিশ পেরনো মহিলা  সেলিব্রিটিদের রূপে আমরা অন্ধ হয়ে যাই এবং তাদের মতো হওয়ার জন্য তাদের অনুসরণ করা নানারকম উপায় অবলম্বন করতে শুরু করি। যেন ব্যাটারিকে নতুন করে চার্জ দেওয়ার জন্য আমরা উঠে-পড়ে লাগি। কিন্তু এইধরনের অবাস্তব কল্পনা বা প্রবণতা একজন সাধারণ ঘরের মহিলাদের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এর ফলে তাদের আত্মনির্ভরতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

যখন আমাদের দৈহিক কাঠামো ধীরে ধীরে বয়সের ভারে পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয় তখন আমাদের চোখে-মুখেও সেই বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। আমাদের বয়স যখন মধ্য চল্লিশে পৌঁছয় তখন মুখে বলিরেখা, চিন্তার ছাপ, কোঁচকানো ত্বক, ত্বকে কালো ছোপ পড়া, ঢেউ খেলানো ত্বক প্রভৃতি সমস্যা থাবা বসায়। অল্পবয়সে সানস্ক্রিন না মাখার অভ্যাস, তৈলাক্ত খাবার খাওয়া, মদ্যপান, সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস থাকার ফলে বয়স বাড়লে এইধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বোটোক্স, যা অনেকটা পিল ও ফিলারস্‌-এর মতো কাজ করে, তা মানুষের খুবই প্রিয় বস্তু হয়ে ওঠে। মানুষ অনেকসময়ে ত্বকের জৌলুস বজায় রাখার জন্য শল্য চিকিৎসকের কাছেও যায়। ত্বক সংক্রান্ত ক্লিনিকগুলো মানুষের প্রতিবেশির মতো হয়ে ওঠে। কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা যায় যখন একজন মানুষ ভুলে যায় যে তাকে কোথায় থামতে হবে। বা বয়সের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একজন মানুষ এসব ক্ষেত্রে কতখানি এগোতে পারে, সে বিষয়ে যখন সে সীমারেখা বাঁধতে পারে না তখনই জটিলতার সৃষ্টি হয়। চুলে রং করলে মানুষ পাকা চুল কিছুদিনের জন্য ঢেকে ফেলতে পারে বা মুখে বয়সের ছাপ যাতে পড়তে না পারে সেজন্য বোটোক্স বা শল্য চিকিৎসার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসবের জন্য বয়সের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কিনা, তা ভেবে দেখা একান্তই জরুরি।

মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্যের বদলে তার নিজের কৃতিত্ব এবং ব্যক্তিগত বিকাশ সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তার কী করণীয় সেটা জানাই একজন মানুষের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠা দরকার। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নটাও মনে আসে যে মানুষ স্বাস্থ্যবতী হওয়ার বদলে কেন নিজেকে রোগা, ছিপছিপে করার দিকে এতটা ঝোঁকে। তার কাছে কেন এই বিষয়টা এতটা গুরুত্ব পায়। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যেখানে মহিলাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয় যে বাহ্যিক চাকচিক্যই হল আমাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি বা যেখানে যৌবন ও ছিপছিপে চেহারা সমার্থক এবং বার্ধক্য মানেই বাহ্যিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ হারিয়ে ফেলা, সেখানে এই ঝোঁক থাকাটা কিছু অস্বাভাবিক নয়। মোদ্দা কথা হল, বোটোক্স ব্যবহার, কঠোর খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা, শল্য চিকিৎসার সাহায্য- এসবের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বয়স্ক মহিলারা আমাদের চোখে সবসময়েই গ্রহণযোগ্য থাকবে। সমাজ কখনোই জোর করে এদের গ্রহণযোগ্যতা আমাদের মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।

প্রবন্ধটি লিখেছেন কিরণ মানরাল যিনি একজন লেখিকা, কলাম্নিস্ট, বক্তা এবং উপদেষ্টা। কল্পনা ও বাস্তব জগৎ নিয়ে কিরণ আটটা বই লিখেছেন।              

          

   

                       

 

     

 

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত