We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা ও মহিলাদের উপর তার মানসিক প্রভাব

কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি (প্রতিরোধ, নিষিদ্ধকরণ ও প্রতিবিধান) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, যে কোনও কর্মস্থলে ১০ জনের বেশি মহিলা কর্মচারী থাকলে সেখানে একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে মহিলারা  কোনও রকমের যৌন হয়রানির প্রতিকার করতে পারেন।

এই আইন অনুযায়ী, নিম্নলিখিত অনভিপ্রেত আচরণগুলিকে ‘যৌন হেনস্থা’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

  • গায়ে হাত দেওয়া বা দেওয়ার চেষ্টা করা
  • যৌন সাহচর্যের দাবি অথবা অনুরোধ
  • যৌন উস্কানিমূলক মন্তব্য
  • অশ্লীল বই, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি দেখানো
  • অবাঞ্ছিত দৈহিক, মৌখিক, নিঃশব্দ যৌন ইশারা অথবা ব্যবহার

যৌন হয়রানি একজন মহিলাকে বিভিন্ন ভাবে, বিশেষ করে তাঁর মানসিক শান্তি ও সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

এটি একজন মহিলাকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে?

কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সাশা ইন্ডিয়ার আইনজীবী সৌম্যা ভাট বলছেন, “ধরা যাক একজন পুরুষ একটি মহিলাকে বললেন যে তার উপরে নীল রং খুব ভাল মানায়। সেই মহিলাটি হয়ত চান না যে সেই পুরুষটি তাঁর দিকে তাকান। সেই জন্য তিনি নীল রঙের কোনও কিছু পরা বন্ধ করে দিলেন, হাতকাটা জামা পরা বন্ধ করে দিলেন। এমন কোনও কিছু যা পরলে পরে তাঁকে আকর্ষণীয় লাগতে পারে সেই সমস্ত কিছু পরা বন্ধ করে দিলেন। যৌন হেনস্থা একজন মহিলার উপরে এতটাই মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এর ফলে আমাদের স্বাভাবিক ব্যাক্তিত্ব হারিয়ে যায় এবং আমরা নিজেদের মতন থাকতে আর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। ফলে আমাদের মানসিকতা ব্যাপক ভাবে বিপর্যস্ত হয়।”

সৌম্যার মতে এই ধরনের অভিযোগ করার আগে, “৯৯% নিপীড়িতা  কাঁদতে কাঁদতে বিনিদ্র রাত কাটান, যার সাথে নানাবিধ খারাপ অভিজ্ঞতা যেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা, যৌন সাহচর্যের দাবি অথবা অনুরোধ, যৌন হেনস্থা, অভিযোগ জানানোর মতন ভরসাযোগ্য কোনও লোক না পাওয়া, অসহায় বোধ করা, নিজের কেরিয়ার বা  চাকরি নিয়ে আতঙ্কে ভোগা, হাঁটাচলা ও কথাবার্তার মধ্যে পরিবর্তন আসা, কাজের গুণমান খারাপ হয়ে যাওয়া, আততায়ীকে এড়িয়ে চলার জন্য অফিসের কনফারেন্সে না যেতে চাওয়া, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় থাকা, লোকজনের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং সমাজে মেলামেশা বন্ধ করে দেওয়া যোগ হয়।”

যখন নিয়ম-শৃঙ্খলা আপনাকে হতাশ করে

সঠিক সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও বহু অভিযোগকারী মহিলাই অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিতে জানিয়েছেন, “উনি একজন ভাল মানুষ, তাই ওনাকে সাবধান করে ছেড়ে দেওয়া হোক। ওনার একটা পরিবার রয়েছে।” সৌম্যা বলছেন, “অভিযোগকারীদের মধ্যে অনেক সময়ই নানান রকম আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।” সম্ভবত ভয় ও লজ্জা থেকে বা আততায়ী এবং তার পরিবারের উপর সমবেদনা থেকেই তাঁরা এই রকমটা করে থাকেন। তাঁরা কখনই চান না যে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির অপরাধের শাস্তি তার পরিবার ভোগ করুক। অনেক সময় যৌন হেনস্থার পরিস্থিতিতে সোশ্যাল কন্ডিশনিং বা সামাজিক নির্মাণের কারণে মহিলারা মনে করেন যে তাঁদের হয়ত স্বাভাবিক ভাবেই ‘আপোষ করে’, ‘মানিয়ে নিয়ে’ এবং ‘উপেক্ষা করে’ চলা উচিৎ।

তাছাড়া আদৌ কতগুলো সংস্থা এই আইনটি পূর্ণাঙ্গ ভাবে মেনে চলেন (অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি থেকে শুরু করে যৌন হেনস্থার অভিযোগের মীমাংসা পর্যন্ত), তার কোনও পরিসংখ্যান নেই। অনেক সময় কোনও কোনও সংস্থা বাধ্যতামূলকভাবে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করলেও এই ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে পারে না  বা আইনটি সম্পর্কে সঠিকরূপে জানে না।

সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী আততায়ীর কাউন্সেলিং

কর্মস্থলে কতৃপক্ষের উচিৎ ভুক্তভোগী ও আততায়ী, উভয়েরই কাউন্সেলিং-এর ব্যাবস্থা করা, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায়। যিনি যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন, তাঁর জন্যে কাউন্সেলিং খুবই প্রয়োজনীয় যাতে তিনি মানসিক আঘাত সামলে আবার স্বাভাবিক পরিবেশে কাজ করতে পারেন।

কাউন্সেলিং কার্যকর করার প্রথম শর্ত হল সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির নিজে থেকে বিষয়টিতে যোগদান করা। জোর করে কারও কাউন্সেলিং করা সম্ভব নয়। এই রকম পরিস্থিতিতে থেরাপিস্টদের সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির আচরণে পরিবর্তন আনতে উৎসাহ দেওয়া উচিৎ। সেরেইন নামে একটি সংস্থা কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করে। তার প্রতিষ্ঠাতা ঈশানি রায় বলছেন, “কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার ভুক্তভোগী কাউন্সেলিং পেলে পরে তাঁর কাজের জায়গায় ফেরাটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে যখন কাউন্সেলিং বা অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটির থেকে কোনও সাহায্য আসে না, তখন পুনরায় সেই একই জায়গায় কাজ করাটা কঠিন হয়।”

বিভিন্ন সেক্টর জুড়ে বাস্তবায়ন

ইদানিং সরকারি অফিসগুলিতেও উক্ত আইনটির মতন কিন্তু সহজ কিছু নিয়মাবলী চালু করা হয়েছে, যাতে কোনও অসুবিধা না হয়। আর কিছু না হোক, নিঃসন্দেহে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

প্রাইভেট সংস্থাগুলি যারা বিদেশী কোম্পানি আর ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করে তারা ২০১৩’র আইনটি সম্পূর্ণ রূপে মেনে চলে, এবং কোনও ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়।

ভাট আরও বলছেন, “এটাও সত্যি যে অনেক সংস্থাই আদপে যৌন হেনস্থার মানে বোঝেন না। অনেক সময় কাজের ধরনও এই রকমের অভিযোগ তোলার সুযোগ দেয় না, ফলে তাঁরা এই বিষয়ে চুপ থেকে যান। উদাহণস্বরূপ হোটেল বা রেস্তোঁরাতে এই ধরনের অভিযোগ কখনও শুনবেন না। হসপিটালের ক্ষেত্রেও, যেখানে প্রচুর লোকজন বিভিন্ন রকম কাজের সাথে যুক্ত এবং সারাদিনে নানারকম লোকজন আসা-যাওয়া করছেন, সেখানে এই ধরনের আইন মেনে চলা খুবই কঠিন। এই পরিস্থিতিগুলি খুবই জটিল যার সমাধান শীঘ্রই বের করা উচিৎ।”

অনেক কর্পোরেট সংস্থাই একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করে এমন ভাব দেখান যেন কোনও সমস্যাই নেই। ভাট বলছেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংস্থার কর্মকর্তাদের ভয়ে কেউ কোনও অভিযোগ করেন না। যিনি যৌন নিপীড়ন করেছেন তাকে হয় সাবধান করে দেওয়া হয় বা চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। যদি তিনি পদমর্যাদায় বড় হন, তাহলে তার গায়ে প্রায় কোনও আঁচড়ই আসে না। যদি নিপীড়িত মহিলার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতীতে কোনও সম্পর্ক থেকে থাকে, তাহলে অভিযোগের তির মেয়েটির দিকেই ঘুরে যায়। অনেক সময় চাকরি হারানোর ভয়ে মেয়েরা গোড়ার দিকে প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেন এবং পরে বুঝতে পারেন যে তাঁকে ব্যাবহার করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অভিযোগ তুললেও ঘটনার তদন্তের আগেই বিভিন্ন রায় তৈরি হয়ে যায়।”

সমাধান

সমাধান কর্মক্ষেত্রের মধ্যেই হওয়া সম্ভব। যদি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি যথেষ্ট সংবেদনশীল হয়, তাহলে তাদের পক্ষে এই ধরনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করতে কোনও অসুবিধা হবে না। ভাট তাও মনে করেন, “সংবেদনশীলতা শিখতে আমাদের এখনও অনেকটা সময় লাগবে।” একটি ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে একজন মহিলাকে তার এক পুরুষ সহকর্মী অশ্লীল ছবি পাঠিয়েছেন এবং ধরা পড়ার পরে অম্লান বদনে বলেছেন যে মহিলাটির ব্যাপারটায় সম্মতি ছিল। কারণ হল এর আগে রাত্রের দিকে যখন সেই মহিলাটিকে তিনি মেসেজ করেছেন, মহিলাটির তাকে জবাবে ‘শুভরাত্রি’ লিখে পাঠিয়েছেন।

একদিকে যেমন অনেক সংস্থা এই আইনগুলো মেনে চলেন এবং অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ পান, এ’রকম হাজার হাজার সংস্থা আছে যারা এই আইনটি মেনে চলেন না। কোনও কোনও সংস্থায় অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি থাকলেও তারা যৌন হেনস্থা সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ এবং তারা দেখাও দেন না। এই সমস্যাগুলোর কোনও শেষ নেই এবং বহু ক্ষেত্রেই এর সমাধানও হয় না।

এই সবের পেছনে আমাদের মানসিকতাও অনেকটাই দায়ী। কর্মক্ষেত্র ও তার কর্মচারীদের উচিৎ বিষয়টিকে হালকা ভাবে না নেওয়া। এর ফলে অভিযোগ জানতে কেউ দ্বিধা বোধ করবেন না।

অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটির বাইরে আইনের সাহায্য নেওয়া

সৌম্যার মতে, “সঠিক তদন্ত এবং রিপোর্টিং করার জন্যে  অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটির যথেষ্ট প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।” অনেক সময়ই অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটির তদন্ত নিয়ে অভিযোগ ওঠে এবং বিষয়টা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতে একবার এই ধরনের মামলা উঠলে তা বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে অনেকদিন পর্যন্ত চলতে পারে।

প্রত্যেকটি পরিস্থিতি ভীষণই আলাদা

যদিও এই আইনটির মূল উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার কিন্তু  তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি হল:

১. কার্যকরী রুপায়ন

২. কর্মীদেরকে আইনটি সম্পর্কে জানানো

৩. অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া

আইনটির মূল উদ্দেশ্য

সৌম্যার কথা অনুযায়ী, “যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত নিজেদের অফিসের কাজে দক্ষ হন। সেই জন্য তাদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলাটা মোটেই সহজ হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই লোকে মেধাবী লোকজনদের সৎ বলে মনে করেন। তাদেরকে সবাই শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রাখেন বলেই তাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ টেঁকে না।” কাজেই শুধু আইন মানলে চলবে না, আইনটির উদ্দেশ্য সার্থক করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে এই ধরনের অভিযোগের মীমাংসা সংবেদনশীলতা, সমবেদনা ও মনুষ্যত্বের সাথে করা হয়। এর জন্য সঠিক প্রশিক্ষণ খুবই প্রয়োজনীয়।

কর্মক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা

  • আইন মেনে চলুন
  • অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করুন
  • সমস্ত সমস্যাগুলো মাথায় রেখে একটি নিয়মাবলী তৈরি করুন
  • সবাইকে এই আইনটি সম্পর্কে জানানোর উদ্যোগ নিন

সাশা ইন্ডিয়া যুগ্ম আহ্বায়ক সৌম্যা ভাট সেরেইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ঈশানি রায়ের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে লেখাটি রচনা করা হয়েছে

সৌম্যা সাশার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন সমাজ সচেতন আইনজীবী উনি কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা নিয়ে দায়িত্ব সহকারে,একজন প্রশিক্ষক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন সোম্যার আইন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা লিঙ্গ সংবেদীকরণ নিয়েকাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে

ঈশানি একজন সফল গবেষক যিনি বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য নিয়ে নতুন আলোর দিশা দেখাচ্ছেন সেরিইন- বিভিন্ন বিষয় যেমন,অবচেতন ভাবে পক্ষপাতিত্ব না করা,কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ করা এবং লিঙ্গ সংবেদীকরণ নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন