স্ট্রেস বা মানসিক চাপ বলতে কী বোঝায়?

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কোনও না কোনওভাবে মানসিক চাপের জন্ম হয়। যে কোনও পরিস্থিতি বা অবস্থার কারণে আমাদের মধ্যে স্ট্রেস হতে পারে। যেমন- স্কুলের বিষয় নিয়ে একটা বাচ্চার মধ্যে মানসিক চাপ দেখা দিতে পারে; বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তাদের প্রিয়জনদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়ে ওঠার জন্য মানসিক চাপের জন্ম হয় আবার কাজের সফলতা বা সম্পর্কজনিত কারণকে কেন্দ্র করে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মনে মানসিক চাপ দেখা দিতে পারে। এখন প্রশ্ন হল মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কাকে বলে?   

যখন আমরা বলি যে আমরা মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছি, তখন সাধারণত আমরা এটাই বোঝানোর চেষ্টা করি যে পরিবেশ বা পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী আমরা কোনও না কোনও প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করছি বা বিশেষ কোনও পরিস্থিতির কারণে আমাদের মধ্যে উত্তেজনা এবং অস্বস্তির বোধ জাগছে। ডাক্তার উইলিয়াম আর লোভাল্লো তাঁর 'Stress and Health' বইতে স্ট্রেস সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন এটা এমন একটা অবস্থা বা বিষয় যার দুটো উপাদান রয়েছে- একটা হল বাহ্যিক উপাদান, যা আমাদের দৈহিক পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত; আরেকটা হল মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক উপাদান, যার সঙ্গে মানবজীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তিমানুষ কীভাবে তার করণীয় কাজ বা আচরণ করবে তা  যুক্ত থাকে।

মানসিক চাপকে আমরা জীবনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই বিবেচনা করি। আমাদের জীবনে ঘটা বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে মানসিক চাপ জন্মানোর সম্ভাব্য কারণগুলো লুকিয়ে থাকে। দৈনন্দিন জীবনে রান্না করা বা গাড়ি চালানোর মতো ঘটনা থেকে স্ট্রেসের জন্ম হতে পারে; মানসিক চাপের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হল পরীক্ষার প্রস্তুতি, চাকরির ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার অথবা পুরনো জায়গা ছেড়ে নতুন কোনও জায়গায় চলে যাওয়া, জীবনে ঘটে যাওয়া বড়সড় বিপর্যয় যেমন- প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভয়াবহ অসুস্থতা প্রভৃতি।

উদ্দীপনা বা প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মানসিক চাপ

জীবনে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে উত্তেজনার বোধ জাগে। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা মানসিক চাপের শিকার হতে পারি। এক্ষেত্রে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলার করার প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল অথবা উদ্দীপনামূলক কার্যকলাপ হিসেবে আমাদের মধ্যে মানসিক চাপের জন্ম হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এটি একপ্রকার ঘটনা বা পরিস্থিতি, যার ফলে আমাদের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। যেমন- পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, নতুন বাড়িঘরের খোঁজ করা, নতুন চাকরির সন্ধান করা অথবা এমন যে কোনও ঘটনা যা গ্রহণ করা আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং যা আমাদের মধ্যে বদল ঘটায়। এই ঘটনা বা পরিস্থিতি, যা বেশ কঠিন ও প্রতিবন্ধক, তা কীভাবে আমরা মোকাবিলা করব তার উপর নির্ভর করে আমাদের দৈহিক ও মানসিক শক্তি বা ভার। এর ফলে আমাদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। যখন আমরা উত্তেজিত হই তখন আমাদের মধ্যে স্নায়ুর দুর্বলতা বা নার্ভাসনেস দেখা যায়; কখনও হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়, গলা শুকিয়ে যায় বা আমরা ঘামতে থাকি। কিছু মানুষের মধ্যে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে যে  উত্তেজনা বা টেনশনের জন্ম হয় তার মাত্রা অনেকসময়ে বেড়ে গিয়ে আতঙ্কের
রূপ নেয়।

মানসিক চাপ একটা আপেক্ষিক বিষয়

আমাদের জীবনে যত্রতত্র মানসিক চাপের জন্ম হতে পারে। আমাদের জীবনে যদি কোনওরকম চাপ না থাকে তাহলে জীবনটা খুব একঘেয়ে হয়ে যায় এবং মানুষ হিসেবে আমরা নতুন কিছু শেখার সুযোগ ও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হতে পারি। আমাদের জীবনে সৃষ্টি হওয়া কিছু মানসিক চাপ ভালো ফল দেয় এবং সেগুলো আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতাকে বাড়াতে সাহায্য করে। এরকম অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়, যেমন- জীবনে প্রথমবার স্কুলে যাওয়া, নতুন কাজ শুরু করা, বিয়ে করা বা সন্তানের অভিভাবক হওয়া।

অন্যান্য যে সব পরিস্থিতির ফলে আমাদের মধ্যে মানসিক চাপ দেখা দিতে পারে সেগুলো হল-

  • কোনও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি- দুর্ঘটনা, প্রিয়জনের আচমকা মারা যাওয়া বা আমাদের কাছে মূল্যবান এমন মানুষের অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া বা আচরণ
  • এমন কোনও পরিস্থিতি যেখানে আমরা স্বচ্ছতা খোঁজার চেষ্টা করি- রুগিদের নিজেদের স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার বিষয়ে জ্ঞানের অভাব
  • অনভিপ্রেত বা অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি- প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি
  • এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া, যার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতের বাইরে চলে যাওয়া- আতঙ্কের কোনও অভিজ্ঞতা মন থেকে দূর করতে না পারা

কখনও কখনও খুব অল্প সময়ের জন্য আমরা মানসিক চাপ অনুভব করি। আবার অনেকসময়ে বেশিদিন ধরে আমরা মানসিক চাপের শিকার হই। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন হয় যার ফলে আমাদের মানসিক চাপ খুব গভীর হয়। আবার কখনও আমাদের মধ্যে কোনও মানসিক চাপই থাকে না।

একজন মানুষ সাধারণভাবে যে সব পরিস্থিতিতে পড়ে মানসিক চাপের শিকার হয় সেগুলো হল- পরীক্ষা দেওয়া বা নতুন শহরে চলে যাওয়া। তবে সবার ক্ষেত্রেই যে এই ঘটনাগুলো চাপের কারণ হয় তা নয়। কেউ কেউ এসব পরিস্থিতিতে পড়ে মানসিকভাবে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতে পারে। তাই সময়বিশেষে মানসিক চাপের বোধ মানুষে-মানুষে আলাদা হতে পারে। এমন অনেক পরিস্থিতি থাকে যার চরিত্র বা প্রকৃতির মূল্যায়নের উপর নির্ভর করে মানসিক চাপের মাত্রার তারতম্য ঘটে-

  • আমাদের পারিপার্শ্বিক সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ, যার সঙ্গে আমাদের দেহ-মনের যোগাযোগ রয়েছে (আমাদের চিন্তাভাবনা, আবেগ এবং আচরণ) ও  সামাজিক সহযোগিতা
  • পরিস্থিতির চাহিদা
  • পরিস্থিতির চাহিদা এবং মানুষের সাধ্যের মধ্যেকার পার্থক্য, অর্থাৎ উচ্চ আশা থাকলেও তা পূরণ করার জন্য শক্তি বা সাধ্যের অভাব অথবা এর
    বিপরীত ঘটনা।

মানসিক চাপ যদিও আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছে তবু আমাদের উচিত পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করে, সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী সুস্থ বা ভালো থাকার চেষ্টা করা এবং নিজেদের শক্তি ও সাধ্যমতো বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।

মানসিক চাপ কম থাকার প্রভাব

মানসিক চাপ সাধারণভাবে এড়ানো যায় না এবং অনেকসময়ে আমাদের মানসিক চাপ মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। যদি আমাদের মধ্যে মানসিক চাপ মানিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি না থাকে তাহলে এমন কিছু ব্যবস্থা বা পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয় যা মানসিক চাপের প্রভাব রুখতে বা কমাতে সহায়ক হতে পারে-

  • সামাজিক সহযোগিতা বাড়ানো- যখন কেউ মানসিক চাপের শিকার হয় তখন সেই সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সামাজিকভাবে অন্যের সহযোগিতা চাওয়া প্রয়োজন।
  • আমাদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার উন্নতি করা- নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ শক্তি বিকাশের মধ্য দিয়ে মানসিক চাপের বাধা দূর করা ও আত্মনির্ভরতা
    বাড়ানো সম্ভব।
  • জীবনকে খুব সুস্থ-সুন্দরভাবে গোছানো জরুরি- আমাদের নিজেদের জগৎ বা পারিপার্শ্বিককে সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিজেদের মনের হতাশাগুলোকে দূর করা, সময়ের অপচয় ও সম্ভাব্য মানসিক চাপ রোধ করা যায়। যেমন- সময়ের সদ্ব্যবহার এবং জিনিসপত্র পর্যায়ক্রমে সাজানো-গোছানো।
  • জীবনযাত্রার মানের যত্ন নেওয়া দরকার- প্রতিদিন সঠিক সময়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং শরীরচর্চা আমাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ও মানসিক চাপ দূর করতে সাহায্য করে।
  • মানসিক চাপযুক্ত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে নিজেকে প্রস্তুত করা- জীবনের প্রতিকূল বা বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য নিজেদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা একান্ত জরুরি।

 

এই বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন- Health psychology: Biopsychosocial interactions by Edward P Sarafino and Timothy W Smith