আত্মহত্যা প্রতিরোধঃ বাধাপ্রাপ্ত কিন্তু কীভাবে বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব

একদিন ভোরে খবর এল মুম্বইয়ের তেইশ বছরের একটা ছেলে বাড়ির উনিশ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেলেছে। কেন এইধরনের ঘটনাগুলো আমায়  ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। কারণ যখন আমার তেইশ বছর বয়স ছিল তখন  আমার মনে প্রথম আত্মহত্যার চিন্তা বা অভিপ্রায় জেগেছিল। একটা তেইশ বছরের ছেলে বা মেয়ের চোখে এই বিশাল জগৎটা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এইসময় একজন মানুষ শৈশবস্থা কাটিয়ে যৌবনের দিকে পা বাড়ায়। তার কাঁধে সেইসময়ে কেরিয়ায়, বিয়ে প্রভৃতির দায়দায়িত্ব এসে পড়ে। তখন একজন মানুষের ভাবনায় গোলাপ ফুলের মতো রঙিন আভা ফুটে ওঠে। তার মনে আনন্দ ও সুখের রং লাগে।

জীবনের কোনও ব্যর্থতাই যে এইসময়ে মেনে নেওয়া যায় না, তা আমি জানি। ব্যর্থতার তাৎপর্য বা মূল্যায়ন এবং কীভাবে সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা যায় সে সম্পর্কে কোনও প্রবন্ধ পড়তে খুব সহজ লাগলেও, মানুষের জীবনে বারবার ব্যর্থতার পর কীভাবে তার মানসিক স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখার জন্য বিশেষভাবে নজর দেওয়া যায়, সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি।

হতাশা মানুষের জীবনের একটা অংশ। কিন্তু মানুষ যদি বারবার আশাহত হতে  থাকে তাহলে মানুষের মনে অদ্ভুত সব ভাবনাচিন্তা জাগতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতে শুরু করে এবং তার মুখের হাসিটুকুও মিলিয়ে যায়।

যখন আমার গভীর অবসাদ এবং বাইপোলার সমস্যা দেখা দিয়েছিল তখন একদিন সকালে আমি আমার চারতলা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম এবং নীচের খড়খড়ে  মাটির দিকে দেখছিলাম। ওই মুহূর্তে মানুষের এটা মনে হওয়া খুব সহজ যে যদি আমি নিজেকে একবার শূন্যে ছুড়ে দিই তাহলে একনিমেষেই সব কিছু শেষ হয়ে যাবে।

আমার জীবনে এসব ঘটেনি ঠিকই। এবিষয়ে আমি আমার পরিবার এবং কাছের  বন্ধুদের সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞ। যাতে আমি সবার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে না রাখি সেজন্য আমার বন্ধুরা অধিকাংশ সময়ে আমার কাছে আসত এবং আমার সঙ্গে গল্পগুজব করত। তারা আমার কাছ থেকে শুনেছিল যে আমার পরিবারে এমন একজন অদ্ভুত মানুষ ছিল যে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত এবং তাকে আমাদের পরিবারের বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছিল। একথা শুনেও তারা কখনও আমায় সে বিষয়ে কোনও কথা বলেনি। কিন্তু আমার হাতটা তারা শক্ত করে ধরে রেখেছিল ও আমার প্রতি নিজেদের আনুগত্য দেখিয়েছিল।

আমি জানি আত্মহত্যার হাত থেকে কাউকে দূরে রাখার জন্য কী কী কথা সাধারণভাবে মানুষ বলে থাকে-

'নিজের পরিবারের কথা একবার ভেবে দেখুন। আত্মহত্যার ঘটনাকে পরিবার কীভাবে মেনে নেবে?'

'এর মতো খারাপ জিনিস আর কিছুই নেই। তাই আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপ না করাই যুক্তিযুক্ত।'

'আপনি কি মনে করছেন যে একমাত্র আপনিই সমস্যার মধ্যে রয়েছেন? আপনি কি জানেন এমন অনেক মানুষ রয়েছে যাদের দুর্দশা আপনার থেকে আরও অনেক বেশি এবং সেই সব নিয়েই তারা বেঁচে আছে?'

মূল সমস্যাটা লুকিয়ে রয়েছে দু'টি শব্দের মধ্যে। শব্দ দু'টি হল- দোষ এবং লজ্জা।

আসলে যার মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা ঘুরপাক খায় তার মধ্যে দোষারোপ ও লজ্জা এই বিষয় দুটো কোনওভাবেই গুরুত্ব পায় না। আসলে আত্মহত্যাকারীরা তো আগেভাগেই নির্যাতনের চরম রূপটাকে নিজের নাগালের মধ্যে দেখে ফেলেছে। কতগুলো নেতিবাচক কথা তার মাথায় সূঁচ ফোটানোর মতো করে ঢোকানো হয়েছে।  সেগুলো ক্রমাগত তার মাথায় আঘাত করে কানে কানে বলছে যে, 'তুমি একটা অপদার্থ। কোনও কাজেই লাগ না। তোমার উচিত নিজের অস্তিত্বকে মুছে ফেলা।' যদি আমাদের চারপাশে থাকা তথাকথিত জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজন কারোর মনে এইসব কথাগুলো জোর করে ঢোকাতে থাকে তাহলে সে মানুষটা কী করবে?

এই পরিস্থিতিতে কী করা দরকার তা মানুষের জানা উচিত। এই বিষয়ে সহানুভূতি এবং সান্ত্বনা- এই বিষয় দুটো খুবই জরুরি।

  • নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে। আত্মহত্যাকারীর পরিচিত মানুষটিকে সেই অভিজ্ঞতার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে এবং আত্মহত্যাকারীর যন্ত্রণা, তার অস্বাভাবিক নীরবতা বা অস্বাভাবিক আতিশয্যের দিকে লক্ষ রাখাও একান্ত প্রয়োজন।
  • যদি কেউ তার প্রিয়বন্ধুর কাছ থেকে আত্মহত্যার বিষয়ে কোনওরকম কথা নাও শুনতে পায় তাহলে তাকে নিজের কাছে ডাকতে হবে, তাকে তার বাড়িতে দিয়ে আসতে হবে, তাকে দুপুরের খাবার খাওয়ানোর জন্য বাইরে কোথাও নিয়ে যেতে হবে। এভাবে তার সঙ্গে নানাভাবে কথাবার্তা বলে তার মনের চিন্তাভাবনার কথা জানার চেষ্টা করাই হবে প্রধান উদ্দেশ্য।
  • আত্মহত্যাকারীর কথা শোনার জন্য দয়ালু এবং ইচ্ছুক হতে হবে। দয়া করে তাদের যথেচ্ছভাবে দোষ দেওয়া বন্ধ করা জরুরি। বুঝতে হবে যে আক্ষরিক অর্থেই তারা অসহায়।
  • আসলে সমস্যাটা একেবারেই শারীরিক নয়। গভীরভাবে মানসিক। মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার কারণেই মানসিক অসুস্থতা বা আত্মহত্যার চিন্তা জাগে।
  • প্রয়োজন মতো বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।
  • আত্মহত্যা রোধ করার জন্য হেল্পলাইনের নম্বর কাছে রাখা দরকার। সেখানে ফোন করার জন্য কখনও দ্বিধা করা যাবে না।

আমি জানি সমাজে আত্মহত্যা বন্ধ করার জন্য 'আত্মহত্যা প্রতিরোধকারী দিবস' এবং 'মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা মাস' পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হল মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং আত্মহত্যার মতো মানসিক অসুস্থতা ঠেকিয়ে আত্মহত্যাকারীকে সাহায্য করা। কিন্তু এর জন্য দরকার অনবরত প্রচার।

আমার বিশ্বাস আমরা যদি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিই তাহলে একদিন আত্মহত্যার মতো ঘটনা সমাজ থেকে নির্মূল হয়ে যাবে।

যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারোর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা জাগে তাহলে তা বন্ধ করার জন্য আপনি বা আপনারা নিম্নলিখিত হেল্পলাইনের সাহায্য
নিতে পারেন:

১. পরিবর্তন কাউন্সেলিং অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার- ৯১ ৭৬৭৬ ৬০২ ৬০২ বা ০৮০ ৬৫৩৩৩৩২৩ (সোমবার থেকে শুক্রবার, বিকেল ৪টে থেকে রাত ১০টা)। ই-মেল: ychelpline@gmail.com

২. আইকল সাইকোসোশ্যাল হেল্পলাইন- ০২২-২৫৫২১১১১ (সোমবার থেকে শনিবার, সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা)। ইমেল: icall@tiss.edu

৩. স্নেহা, চেন্নাই: ৯১ (০) ৪৪ ২৪৬৪ ০০৫০ (কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা,৭দিন)। ইমেল: help@snehaindia.org. মুখোমুখি কাউন্সেলিং-এরও ব্যবস্থা রয়েছে (প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা)। ঠিকান- ১১ পার্ক ভিউ রোড (চেন্নাইয়ের কালিয়াপ্পা হাসপাতালের কাছে), আরএ পূরম, চেন্নাই- ৬০০ ০২৮।

প্রবন্ধটি লিখেছেন শৈলজা বিশ্বনাথ। ইনি একজন ফ্রিলান্স লেখক, সর্বক্ষণের সম্পাদক এবং শখের ব্লগ লেখক। অভিভাবকত্ব, পড়াশোনা, লেখালিখি, সাঁতার কাটা এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট শৈলজার পছন্দের বিষয়গুলোর মধ্যে একেবারে উপরের সারিতে রয়েছে। এই প্রবন্ধটিও মূলত তাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইট shailajav.com-এ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।