যদি আপনার গর্ভপাত ঘটে তাহলে কীভাবে আপনি নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেবেন

কয়েক বছর আগে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটে। অন্য একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চারজনের মধ্যে কমপক্ষে একজন মহিলার গর্ভপাত হয়। ভারতে ২৪০০ জন মহিলার উপর করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে এর মধ্যে ৩২ শতাংশ গর্ভবতী মহিলার জীবনে গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে।

গর্ভপাতের ঘটনা সর্বসমক্ষে স্বীকৃতি পাওয়ার চেয়ে বাস্তবে অনেক বেশি ঘটে এবং যে মহিলার জীবনে গর্ভপাতের মতো ঘটনা ঘটে তার প্রভাব মহিলার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পড়ে। গর্ভপাতের মানসিক প্রভাব সম্পর্কে জানার জন্য হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন-এর পক্ষ থেকে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ শাইব্যা সালদানহা, ডঃ অরুণা মুরলিধর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অশ্লেষা বাগাডিয়ার সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল।

গর্ভপাত কি মহিলাদের জীবনে খুব গুরুতর ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়?

নানাদিক থেকে গর্ভপাতের ঘটনা একজন মহিলার জীবনে সন্তান হারানোর সমতুল্য বিষয়। এর ফলে একজন মায়ের মনে গভীর দুঃখ ও বিষণ্ণতা জন্মায় এবং এই পরিস্থিতি অতিক্রম করতে তার বেশ খানিকটা সময়ও লেগে যায়। প্রায়শই গর্ভপাতকে ঘিরে নানারকম নিষিদ্ধ মনোভাব থাকার কারণে একজন মা তার দুঃখ,  যন্ত্রণা প্রকাশ করার সুযোগ খুব কম পায়। ফলে এই ক্ষতির মোকাবিলা করা তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

গর্ভধারণের পর বেশ কিছু সময় কেটে যাওয়ার পরে যদি গর্ভপাত হয় তাহলে সেই ক্ষতির মোকাবিলা করতে মায়েদের বেশ সমস্যা হয়

গর্ভাবস্থাকালীন সময় যত এগোতে থাকে একজন হবু মায়ের মনে তার আসন্ন বাচ্চাকে নিয়ে অনেক ছবি ফুটে উঠতে থাকে। এভাবে হবু বাচ্চার সঙ্গে ভাবী মায়ের বন্ধনও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করে। সেজন্য গর্ভবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায় গিয়ে যদি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে তাহলে তার প্রভাব হবু মায়ের মানসিক  স্বাস্থ্যের উপর খুব গভীরভাবে পড়ে।

অধিকাংশ মহিলা ভাবে তারা ভুল করেছে বলেই গর্ভপাত ঘটেছে, কিন্তু এ যুক্তি আদৌ সত্যি নয়

মহিলাদের গর্ভপাত হলে তারা অপরাধ বোধে ভোগে ও আপশোস করতে থাকে এবং তার মনে হয় যে সে জীবনে খুব বড়সড় ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে। সে ভাবে যে কাজ করা তার উচিত ছিল না সেই কাজ সে ঝুঁকি নিয়ে করেছে এবং সেজন্য মহিলারা নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে। একটা সাধারণ প্রবাদ চালু আছে যে গর্ভপাত ঘটার পিছনে কারণ হল নির্দিষ্ট ক্রিয়াকলাপ, ঘোরাফেরা বা পেঁপে খাওয়া। যখন অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ক্ষেত্রে গর্ভপাত হয় তখন মহিলারা ভাবে যে সে সন্তান চায়নি বলেই গর্ভপাত ঘটেছে। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় ঘটা অধিকাংশ গর্ভপাতের পিছনে থাকে ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতা।

কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঘটনা স্বীকার করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে

কিছু কিছু গর্ভপাতের ক্ষেত্রে রক্তপাত, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা খামচে ধরা এবং শরীরের পিছন দিকের নীচের অংশে ব্যথা উপলব্ধি হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাতের জন্য কোনও শারীরিক বা বাহ্যিক লক্ষণ চোখে পড়ে না। এই পরিস্থিতি  একজন মহিলার পক্ষে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় মহিলারা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে বা গর্ভস্থ বাচ্চার হৃদ্‌স্পন্দনের গতি ঠিকঠাক আছে কিনা, তার প্রমাণ চাইতে পারে।

প্রাথমিক পর্বে গর্ভপাত ঘটলে তা মহিলাদের খুব ব্যক্তিগত দুঃখ বলে মনে হয়

যদি গর্ভধারণের প্রথম পর্যায় গর্ভপাত ঘটে তাহলে মহিলারা সে খবর খুব কাছের বন্ধু এবং পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে বলতে চায় না। একদিকে সে ভাবে যে এই দুঃসংবাদটা নিজেদের ছাড়া বাইরের কারোর কাছে বলাটা ঠিক নয়। অন্যদিকে, সে তার এই দুঃখকে খুব ব্যক্তিগত বলে মনে করে এবং সে তার গর্ভের সন্তান হারানোর শোক প্রকাশ্যে বলতে সক্ষম হয় না। এক্ষেত্রে একমাত্র মহিলারা চাইলেই গর্ভপাতের খবর বাইরে আনা সম্ভব হয়।

কীভাবে গর্ভপাতের ঘটনা মায়েদের মানসিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলে

এই ঘটনায় পরিবারের লোকেরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে এবং সেই প্রতিক্রিয়া একজন মহিলা কীভাবে মোকাবিলা করছে, সেই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। যদি পরিবারের সদস্যরা গর্ভপাতের জন্য মাকে দোষ দেয় অথবা মায়ের কোনও ভুল কাজের দিকে ইঙ্গিত করে, তাহলে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া একজন মায়ের পক্ষে খুবই সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার হাত থেকে  বাঁচার জন্য চাই সহযোগী ও ভালোবাসাপূর্ণ একটি পরিবেশ, যা মহিলাদের বাস্তব সম্পর্কে বোঝাতে সহায়তা করতে সক্ষম হবে।

গর্ভপাতের মোকাবিলা: আমি কী করতে পারি?

যদি আপনি বা আপনারা গর্ভপাতের মুখোমুখি হন তাহলে আপনার উচিত নিজের শারীরিক, এমনকী মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। এজন্য আপনি নিম্নলিখিত উপায়গুলো নিতে পারেন-

১. পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন। যেহেতু গর্ভপাতের পরে মহিলাদের জীবনে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যায় তাই সেক্ষেত্রে শরীর সুস্থ করতে এক বা দু'সপ্তাহ বিশ্রাম নেওয়া জরুরি হয়ে ওঠে।

২. কোন মানুষ আপনার কথা জানতে চাইছে তা বুঝে তার কাছে নিজের মনের দুঃখ ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। যদি কেউ আপনার কথা শুনতে না চায় তাহলে তাকে আপনার পরিষ্কার করে ভদ্রভাবে জানিয়ে দেওয়া জরুরি যে আপনিও তার সঙ্গে গর্ভপাতের বিষয়ে কোনও আলোচনা করতে চাইছেন না।

৩. যাকে আপনি বিশ্বাস করেন তার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে পারেন, সেই মানুষটি আপনার সঙ্গী, পরিবারের সদস্য বা বন্ধু- যে কেউ হতে পারে। মহিলারা তাদের স্বামীকে এই আলোচনায় অর্ন্তভুক্ত করতে পারে। কারণ মনে রাখতে হবে স্বামীও স্ত্রীর মতো তার সন্তানকে হারিয়েছে।

৪. নিজের মনের কষ্ট আপনি আপনার পছন্দমতো উপায়ে প্রকাশ করতে পারেন। যেমন- লিখে, শৈল্পিক ভঙ্গি বা অন্য কোনও সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে মহিলারা নিজের উপলব্ধির কথা প্রকাশ করতে পারেন।

৫. এমন প্রথা খুঁজে বের করতে হবে যা আপনাকে আপনার ক্ষতি স্বীকার করতে সাহায্য করতে পারে এবং সেইমতো কাজ করে নিজের দুঃখ অতিক্রম করা জরুরি।

কখন গর্ভপাতের ঘটনা মহিলাদের জীবনে 'শুধু দুঃখ বা বিষণ্ণতা'-র চেয়ে বেশি কিছু হয়ে ওঠে?

গর্ভস্থ সন্তান হারানোর পর একজন মায়ের মনে গভীর আঘাত লাগে। কিন্তু প্রায়শই এই গভীর দুঃখ দুই সপ্তাহ ধরে বজায় থাকে এবং এরপরে মায়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে আগের থেকে সুস্থ বোধ করে। কিন্তু ঠিক কোন পরিস্থিতিতে পড়লে মহিলাদের যথাযথ সাহায্যের প্রয়োজন হয় তা আমাদের জানা প্রয়োজন-

  • ঘুমের সমস্যা, হয় খুব কম ঘুম বা অতিরিক্ত ঘুম হওয়া
  • লাগাতার অপরাধ বোধে ভোগা (''আমি নিশ্চয়ই কিছু ভুল করেছি'' বা ''এজন্য আমিই দোষী'')
  • বারবার এক চিন্তা মাথায় আনা (''আমি আর কখনোই সন্তানের মুখ দেখতে পারব না'')
  • কাউকে নিজের ক্ষতির কথা বলতে না পারা
  • অবসাদের অন্যান্য উপসর্গ, যেমন- মানসিক যন্ত্রণার ফলে অত্যন্ত রেগে যাওয়া,  হতাশা এবং শারীরিক সমস্যার কথা বলতে না পারা
  • মৃত্যু বা মরে যাওয়ার কথা চিন্তা করা

যদি এই লক্ষণগুলো দু'সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে চলতে থাকে তাহলে মহিলাদের উচিত হেল্পলাইন বা একজন কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া।  

 

  

        

Was this helpful for you?