মানসিক বিপর্যয় বলতে কী বোঝায়

বিপদের সতর্কবার্তা- কোনও মানুষের সম্ভাব্য মানসিক বিপর্যয়ের তথ্য এই প্রবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে

যখন আপনি বা আপনারা মানসিক আতঙ্ক বা কোনও আঘাতজনিত কারণে  মানসিক ক্ষত নামক শব্দটি শুনতে পান তখন আপনাদের কী মনে হয়? মাথায়  আঘাত পাওয়া, গাড়ি দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, শিশু নির্যাতন- এসব ঘটনা শুনেই বা কী চিন্তা হয় আপনাদের? হতেই পারে এসব বিষয়ের সঙ্গে মানসিক আতঙ্ক বা মানসিক  বেদনাবহ ঘটনার যোগাযোগ থাকতে পারে। যদি এই শব্দটি (আতঙ্ক) কাউকে সন্দিহান বা অনিশ্চিত করে তোলে, তাহলে সেক্ষেত্রে সে একা অনিশ্চয়তায় ভোগে না, তার মতো আরও অনেক মানুষই সন্দিহান হয়ে পড়ে। মানসিক আতঙ্ক বা ক্ষতের অনেকগুলো স্তর এবং জটিল অর্থ রয়েছে। সেই সঙ্গে এই বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের অগোচরেই থেকে যায়। তাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়ে ওঠে না।

পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার(পিটিএসডি)-এর আলোচনায় মানসিক আতঙ্ক বা ক্ষতজনিত চাপের প্রসঙ্গ আমাদের সামনে এসেছে। কিন্তু রোগ নির্ধারণের সঙ্গে এই চাপের প্রভাব কতখানি বিপজ্জনক, তা সবসময়ে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারা সম্ভব হয় না। এমন বহু মানুষ, যারা কোনও না কোনওভাবে মানসিক আতঙ্কের শিকার হয়েছে, তাদের সঙ্গে পিটিএসডি নামক সমস্যার সব শর্তের মিল না-ও থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ মানুষই মানসিক আতঙ্কজনিত ঘটনা বা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলে যে দিশাহারা হয়ে পড়ে এবং কিছু সময়ের জন্য হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সক্ষম হয় না, তা একপ্রকার জোর দিয়েই বলা যায়।

একজন মনস্তত্ত্ববিদ হিসেবে আমার কাছে এমন অনেক রুগি আসে যারা বলে যে তারা জীবনের কোনও না কোনও সময়ে জটিল পরিস্থিতিজনিত কারণে মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। যখন আমি তাদের কাছে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই তখন তারা বলে যে ''আমার কাকা আমার সঙ্গে খুব বেঠিক কাজ করেছে'' বা ''আমার বিগত সম্পর্কটা খুব গোলমেলে ছিল'' অথবা ''আমার বোন তার নিজের জীবন শেষ করে ফেলেছে, কিন্তু সেটা প্রায় অনেককাল আগের ঘটনা।'' এই ঘটনাগুলোর সবটা শুনে আমার মনে হয় যে এই ঘটনাগুলোর প্রভাব তাদের সম্পর্ক, আত্মপ্রত্যয়, তাদের মানসিক উদ্বেগ এবং তাদের সর্বাঙ্গীন শরীর-স্বাস্থ্যের উপর তেমনভাবে পড়েনি। যদিও এই ঘটনাগুলো যে আদপে আতঙ্কজনিত বিষয় সে ব্যাপারে তারা আদৌ ওয়াকিবহাল নয়। ঘটনাগুলো তাদের মনে কম পরিমাণে হলেও ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তারা পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে দিশাহারা হয়ে  পড়েছে এবং তারা হয়তো ভয় পেয়েছে, অসহায় হয়ে পড়েছে, এমনকী মানসিক চাপেরও শিকার হয়েছে। তবু তাদের জীবনে সেই ঘটনাগুলোর প্রভাব খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

কোনও দুর্ঘটনা হেতু মানুষের মনে আতঙ্ক বা ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া বা গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়া যে কোনও মানুষের জীবদ্দশায় এক চিরকালীন সত্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। মানসিক আতঙ্কের শিকার হওয়ার পর প্রত্যেকটি মানুষই নিজের সাধ্যমতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। এর  পিছনে থাকে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, তাদের জৈবিক গঠনতন্ত্র এবং তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব। এবিষয়ে চিকিৎসক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হল কিছু মানুষ মানসিক আতঙ্কের শিকার হওয়ার পর খুব তাড়াতাড়ি নিজেদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা ফিরে পায়। সেক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে ওই ঘটনার প্রভাব অত্যন্ত সামান্য হয়। কয়েকজনের ক্ষেত্রে আবার তার প্রভাব মাঝারি ধরনের হয়। তারা ভবিষ্যতে সেই অভিজ্ঞতা মনে  রাখতে চায় না, মাঝে মাঝেই ভীত বা বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারে না বা তাদের মনঃসংযোগ ব্যাহত হয় এবং তারা অন্যদের ও পৃথিবীকে একটু  ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। এইধরনের মানুষজনের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি কাউন্সেলিং বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা খুব ভালো ফল দেয়। এর ফলে তাদের মধ্যে মানসিক স্থিতিস্থাপকতাজনিত দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের পছন্দমতো কাজ করতে সক্ষম হয়।

অন্যদিকে আবার বেশ কিছু মানুষের মধ্যে মানসিক আতঙ্কের প্রভাব খুব গুরুতর হয়, ঠিক যেমন পিটিএসডি-তে আক্রান্ত হলে মানুষের মধ্যে যেসব লক্ষণ প্রকাশ পায়, এক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা দেয়। সেগুলো হল-

  • মানসিক অবসাদ, অধীর মনোভাব এবং রেগে গিয়ে মেজাজ-মর্জির ঘন ঘন
    বদল ঘটা
  • আতঙ্কের ঘটনা বারবার চোখের সামনে চলে আসা
  • নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা
  • ঘুমের সমস্যা হওয়া বা দুঃস্বপ্ন দেখা
  • নিজের চরম পরিণতি অনুভব করা
  • পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য অতিরিক্ত মদ্যপান করা
  • অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা
  • পারস্পরিক সম্পর্কে জটিলতা দেখা দেওয়া

আতঙ্কের ঘটনা, যেগুলোর পারস্পরিক চরিত্র রয়েছে, যেমন- শিশুদের যৌন নিগ্রহ এবং যৌন নির্যাতন বা দীর্ঘদিন ধরে চলা মানসিক নির্যাতন প্রভৃতির ফলে মানুষের মনে মানসিক ক্ষত জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে বা একে সি-পিটিএসডি বলা  হয়। এই অবস্থায় মানুষ অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে না এবং কাছের সম্পর্ক বা ভালোবাসার সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। মানুষের অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে সমস্যা হয় এবং প্রাত্যহিক জীবনের মানসিক চাপ সহ্য করাও অসম্ভব হয়ে ওঠে।

মানসিক আতঙ্কের প্রভাব কোনও কোনও মানুষের ক্ষেত্রে একবারই পড়ে। আবার অনেক সময়ে তা বারবার ফিরে আসে। আসলে মানসিক আতঙ্কের প্রভাব  ক্রমবর্ধিষ্ণু। অর্থাৎ, প্রথমবার ঘটা ঘটনার প্রভাবের মাত্রার চেয়ে দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার এবং চতুর্থবার বা তারও পরে ঘটা ঘটনার প্রভাবের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি যদি কখনও আপনার সমস্যার লক্ষণগুলোর সঙ্গে পিটিএসডি-র লক্ষণের কোনও মিল না থাকে তাহলেও আপনি হয়তো চেষ্টা করবেন সেই লক্ষণগুলোর সঙ্গেই মিল খোঁজার। আমার রুগিরা সবসময়ে আমায় বলে,'' কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা অন্যদের মতো তত খারাপ নয় বা আপনি আমায় কেমন দেখছেন।'' আমি তাদের বলি যে সমস্যা চরম আকার ধারণ করার আগেই বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া দরকার। যেমন- কোনও মানুষ হয়তো সবেমাত্র নতুন একটি ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েছে এবং শুরুতেই সে দেখল যে তার সঙ্গী তাদের সম্পর্ক নিয়ে অদ্ভুত আচরণ করছে। এমন হতে পারে যে সেটা হয়তো পিটিএসডি-র লক্ষণের মতো নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার প্রভাব একজন মানুষের ব্যক্তিগত সত্ত্বার উপরে পড়তে পারে এবং প্রতিকূল পরিবেশে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের কী অনুভূতি হচ্ছে, তা-ও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে।

যদি কেউ বিপর্যয়কর ঘটনার পরে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে তাড়াতাড়ি চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে ঘটনা ঘটার পর একমাস পেরিয়ে গেলে যদি সে তৎপর হয়, তাহলে তখনই জরুরি একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্যের। যিনি তাকে চিন্তা করার মতো কিছু রয়েছে কিনা সে বিষয়ে পথ দেখাতে পারবে। এর ফলে তা ওই ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যকে চনমনে করে তুলতে কার্যকরী ভূমিকা নেবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি মানুষের নিজের সদিচ্ছা ও সহযোগী শক্তি তার মানসিক আতঙ্ক দূর করার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই সহযোগী শক্তির মধ্যে  প্রিয়জন, পোষ্য, শারীরিক কসরত, নিজের যত্ন, এমন কোনও পরিবেশ যেখানে একজন মানুষ নিরাপত্তা বোধ করতে পারে এবং অন্যান্য কিছু পন্থা, যা মানসিক চাপের মোকাবিলা করতে আমাদের সাহায্য করতে পারে, সবই থাকতে পারে।

প্রবন্ধটি লিখেছেন ডঃ দিব্যা কান্নান। তিনি সম্প্রতি ক্লিনিক্যাল  সাইকোলজিস্ট হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাসভিল্লি-র ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাঙ্গালোরে স্থানান্তরিত হয়েছেন। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ে শেষ কয়েক বছর ধরে ডাক্তার কান্নান হিংসা  থেকে বেঁচে ফেরা পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাহায্যার্থে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবে ব্যাঙ্গালোরে অনুশীলনরত।               

Was this helpful for you?