ঘুমানোর সময়ে বৈদ্যুতিন যন্ত্র ব্যবহার করা কি ঠিক?

আপনার কি বেশি রাতে ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করার অভ্যাস আছে? বা রাতে বিছানায় কি ল্যাপটপ ব্যবহার করেন? যদি তাই হয় তাহলে আপনি হয়তো এখনই ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন বা আপনার এধরনের সমস্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমাদের জীবনে প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার ক্রমশ সর্বব্যাপী হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যকর ব্যবহার এবং অপব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়ে বা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু যদি দেখা যায় যে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রভাব মানুষের ঘুমের উপর পড়ছে তাহলে বুঝতে হবে যে বৈদ্যুতিন যন্ত্র অত্যন্ত বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে।

শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে একজন মানুষের প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মানুষের এই ঘুমের সময়টা যদি বৈদ্যুতিন যন্ত্রের ব্যবহার দখল করে নেয়, বিশেষ করে ইমেল দেখা ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বাড়ে তাহলে ঘুমের সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। বৈদ্যুতিন যন্ত্র ব্যবহারের প্রভাব একজন মানুষের জীবনে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে পড়তে পারে-

  • ঘুমের সময় নষ্ট করে দেয়
  • ঘুমের সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হয়
  • স্পষ্ট চিন্তাভাবনা করার দক্ষতা কমে যায়
  • দীর্ঘ সময় ধরে সৃষ্টিশীল কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস পায়
  • নানারকম মানসিক অসুস্থতা যেমন- অবসাদ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া দেখা দিতে পারে।

এই প্রসঙ্গে এসএইচইউটি (সার্ভিস ফর হেলদি ইউজ অফ টেকনোলজি) ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠাতা ও মনোবিদ ডঃ মনোজ শর্মা জানিয়েছেন, ''আমরা প্রায়শই দেখি অভিভাবকরা তাদের বাচ্চাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তারা নাকি রাতে না ঘুমিয়ে অনলাইন গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে।'' এধরনের সমস্যাকে বলা হয় প্রযুক্তির  প্রতি আসক্তিগত সমস্যা। তিনি আরও জানিয়েছেন যে অনেক বাচ্চা অনলাইনে খেলা করার সময়ে অন্য দেশের অনেক মানুষের সঙ্গে একটা দল গঠন করে, যাদের দেশের টাইম জোনের সঙ্গে আমাদের দেশের টাইম জোনের কোনও মিল থাকে না। ফলে বাচ্চাদের রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং পরের দিন সকালে তারা ঝিমোতে থাকে ও ক্লান্ত বোধ করে।''

কী কারণে রাতে একজন মানুষের অনলাইনে থাকার প্রতি ঝোঁক বাড়ে? বিশেষজ্ঞদের মতে একাকিত্ব, একঘেয়েমি, অতিরিক্ত কৌতুহল এবং কাছের মানুষের চাপই এর জন্য দায়ী থাকে। অন্যদিকে, কিছু মানুষের অভ্যাস থাকে ঘুমানোর সময়ে ভিডিও গেম খেলা বা গান শোনার, যা প্রযুক্তিগত আসক্তির একটা উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এসএইচইউটি ক্লিনিক সমীক্ষা করে দেখেছে যে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী কর্মক্ষেত্রে ২৫০জন কর্মচারী প্রযুক্তির ব্যবহার করে। আরও দেখা গিয়েছে যে ৫৮.৮ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন, ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ বাড়ি ও অফিস- দু'জায়গাতেই ব্যবহার করে থাকে। কাজের পরেও নানা কারণে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ৪২ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে, ৫ শতাংশ মানুষ খাওয়াদাওয়া বা ঘুমের থেকে অনলাইনে নিজেদের ব্যস্ত রাখতে বেশি পছন্দ করে। দেখা গিয়েছে যে এধরনের মানুষ মধ্য রাতে অন্তত চারবার ঘুম থেকে উঠে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইমেল দেখে। এর ফলে তাদের ঘুম পর্যাপ্ত হয় না। এই কারণে সকালে তারা নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে ঘুম থেকে ওঠে।

জৈবিক দিক থেকে রাতে প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের শরীরে মেলাটোনিন নামক হরমোন ক্ষরণের উপর প্রভাব ফেলে, যে হরমোনটি মানুষের ঘুমের চক্র বা সারকাডিয়ান রিদিম বা ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এর প্রতিকারের জন্য আপনি বা আপনারা কী করতে পারেন?

নীচে এমন কয়েকটি উপায়ের কথা বলা হয়েছে যার সাহায্যে মানুষ ঘুমের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে পারে-

  • রাতে ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে সবরকম বৈদ্যুতিন যন্ত্রের সুইচ বন্ধ
    করা জরুরি।
  • মোবাইল ফোনের অ্যালার্মের পরিবর্তে ঘড়ির অ্যালার্ম ব্যবহার করা উচিত। এর ফলে রাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার প্রবণতা এড়ানো সম্ভব।
  • ঘুমাতে যাওয়ার ও ঘুম থেকে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখার অনুশীলন করতে হবে। এভাবে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে মানুষের শরীর ওই সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
  • রাতের অপর্যাপ্ত ঘুম দিনের বেলায় পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা একেবারেই ঠিক নয়।
  • রাতে ঘুমানোর আগে উত্তেজক পানীয় যেমন- শক্তি উদ্রেগকারী পানীয় বা কফি খাওয়া এড়ানো প্রয়োজন। নিজের শরীরের কার্যকলাপ বিবেচনা করে কখন এই উত্তেজক পানীয় খাওয়া যেতে পারে, যার ফলে রাতে ভালো ঘুম হতে পারে তা খুঁজে বের করা দরকার।
  • দৈনন্দিন শারীরিক কসরত ঘুমের উন্নতি ঘটাতে সহায়ক হয়।
  • রাতে ঘুমানোর দু'ঘণ্টা আগে হালকা খাবার খাওয়া জরুরি।

 

সূত্র-

Shrivastava, Apoorva, Manoj Kumar Sharma, and Palaniappan Marimuthu. ''Internet addiction at workplace and it implication for workers life style: Exploration from Southern India.'' Asian journal of psychiatry 32 (2018): 151-155.

Shyam, H.R., Manoj Kumar Sharma, and T. Palanichamy. ''Exploration of technology use pattern among teenagers and its relationship with psychological variables.'' ASEAN J Psychiatry 17 (2016): 239-49.    

       

 

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত