একজন রুগি (ক্লায়েন্ট) ও তার ডাক্তারের (থেরাপিস্ট) মধ্যে সম্পর্কের নিয়ম-নীতিগুলো কী?

যদি কেউ মনে করেন যে নিজের কাউন্সেলিং করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তাহলে তাঁর উচিত শুরুতেই কাউন্সেলরের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর করা। এর মধ্য দিয়ে মানুষ বিবেচনা করতে পারবে যে কাউন্সেলিং করার জন্য যেসব নৈতিক নির্দেশিকা রয়েছে সেগুলো একজন কাউন্সেলর মেনে চলছে কিনা। ভালো কাউন্সেলিং একজন রুগির প্রায় যে কোনও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অনৈতিকভাবে যদি কারোর কাউন্সেলিং করা হয় তাহলে উপকারের থেকে অপকারই বেশি হবে।

কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার নৈতিক দিক কোনগুলো?

নৈতিকতা বজায় রাখা কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় একটা অন্যতম নির্দেশিকা এবং যার মূলত দুটো উদ্দেশ্য রয়েছে। অর্থাৎ এটি রুগি এবং ডাক্তার দু'জনেরই রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই নিয়ম কাউন্সেলং প্রক্রিয়া চলাকালীন একজন রুগিকে সম্ভাব্য যে কোনও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। অনেকসময়ে সম্ভাব্য ক্ষতির উৎসগুলো সম্পর্কে একজন রুগির মনে স্পষ্ট ধারণা থাকে না। যেমন-

  • কেন একজন রুগির বাড়িতে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া চালানো সমস্যাবহুল হয়?
  • কেন কাউন্সেলর ও রুগির মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কে গড়ে উঠতে পারে না?
  • কেন একজন ডাক্তার রুগির পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে
    পারে না?
  • উভয়ের মধ্যে ভালো সম্পর্কের জন্য কেন একজন রুগি তার ডাক্তারকে কোনও উপহার দিতে পারে না?
  • একটা কাফেতে বসে কেন কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব হয় না?

এই প্রশ্নের উত্তরগুলো সবসময়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট নাও থাকতে পারে। তবে একটা বিষয় বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে একজন কাউন্সেলরের হাতে তার রুগির সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা থাকে। যদিও তারা এক্ষেত্রে চেষ্টা করে নিজেদের প্রভাব প্রশমিত করতে। একজন ডাক্তারের কাছে রুগিরা খুবই মূল্যবান হয়। কারণ রুগিরা তাদের অনুভূতিগত সমস্যা, স্মৃতিশক্তি এবং অন্যান্য দুর্বলতার কথা কাউন্সেলরের কাছে খোলাখুলিভাবে বলে। এই পারস্পরিক আদানপ্রদান ছাড়া কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া আদৌ কার্যকরী হয় না। যেহেতু কাউন্সেলররাও মানুষ তাই আরেকজন মানুষের সমস্যা বোঝা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়। মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে নানারকম পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে যেমন- ভালো কাজের জন্য প্রশংসা পাওয়া, অন্যের ভালোবাসা পাওয়া প্রভৃতি। যখন একজন কাউন্সেলরের জীবনের অন্যক্ষেত্রে এসব পাওয়া সম্ভব হয় না তখন সে নিজেকে তার কাজ অর্থাৎ কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে চায়। যদিও কাউন্সেলরদের মনে নিজেদের জন্য কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকার ফলে রুগির চাওয়া-পাওয়ার বিষয় থেকে তাদের মনোযোগ বিঘ্নিত হতে পারে। আর সেই ঘটনা ঘটলে রুগির ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় রুগিরা তাদের মনের ভয়ের কথা কাউন্সেলরকে জানাতে পারে। কাউন্সেলিংজনিত সম্পর্কের বিষয়টা খুবই অনন্য। এই প্রক্রিয়ায় একজন কাউন্সেলর নিজের থেকে খুব অল্প কথাবার্তা বলে। কিন্তু রুগির মনের ভয় ও চিন্তার কথা খুব মনোযোগ সহকারে শোনে। সক্রিয় শোনার এই অভ্যাসই টক থেরাপি বা আলাপচারিতাজনিত থেরাপির মূল ভিত্তি। কাউন্সেলরের সঙ্গে রুগির মানসিক যোগাযোগ গড়ে ওঠার ফলে তারা অন্যের চোখে নিজেদের প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, যা সাধারণ ও স্বাভাবিক বলে মনে হলেও,  আমাদের জীবনে তা বিধিবদ্ধ কোনও নিয়ম হিসেবে জায়গা করে নিতে পারেনি। অন্যদিকে এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কাউন্সেলর সম্পর্কে জানার আগ্রহ গড়ে ওঠে। নীতিগতভাবে এই পরিস্থিতিতে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া যথাযথভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য কাউন্সেলরের উচিত রুগির সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা সীমা বেঁধে ফেলা। এই সময়ে নিজের বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকা জরুরি এবং কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার বাইরে রুগিকে অন্য কোনওভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

যদি কাউন্সেলর নিজে থেকে রুগির সঙ্গে বন্ধুত্ব বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ গড়ে তুলতে চায় তাহলে সে চেষ্টা করবে ব্যক্তিগত তথ্য রুগির সঙ্গে আদানপ্রদান করতে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে সে রুগির সঙ্গে দেখা করতেও ইচ্ছুক হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কাউন্সেলিং-এর বাইরে রুগির সঙ্গে মেলামেশা করার ফলে কাউন্সেলর ও রুগির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে বদল ঘটতে পারে যা রুগির পক্ষে বিপজ্জনক হয়। কাউন্সেলর-রুগির সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক শক্তির দড়ি টানাটানি চলতে থাকে। রুগি জানতে পারে না যে একজন কাউন্সেলর রুগির জন্য ঠিক কতখানি দায়িত্ব পালন করছে। যদি তা বাইরে প্রকাশ পায় তাহলে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কারচুপি ও ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যায়।

নৈতিক নির্দেশিকা একজন কাউন্সেলরকে তার দায়িত্ব পালন করতে যেমন সাহায্য করে, তেমন কাউন্সেলিংজনিত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা গড়ে তুলতে দিশা দেখায়। একজন ঝুঁকিপূর্ণ রুগির ক্ষেত্রে কখন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কখন রুগির আরও বেশি সাহায্যের দরকার সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এই নৈতিক নির্দেশিকা খুবই উপযোগী। সাধারণভাবে রুগির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বলতে বোঝায় আত্মহত্যার প্রবণতা, শিশুদের প্রতি নির্যাতন অথবা অন্যের ক্ষতির ইচ্ছা প্রভৃতি। কাউন্সেলর যখন রুগিকে সুস্থভাবে রক্ষার করার সিদ্ধান্ত নেন তখন তার দরকার সামাজিক, আইনগত ও পারিপার্শ্বিক সহায়তা। এছাড়া কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় অন্যান্য আরও কিছু বিষয় রয়েছে যা ততটা গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। যেমন- কাউন্সেলরের কি উচিত রুগির বাড়িতে গিয়ে তার চিকিৎসা করা? যদি রুগি কাউন্সেলরের পারিশ্রমিক দিতে না পারে তাহলে কাউন্সেলররা কী করবে? যদি রুগি কাউন্সেলরের পরিচিত হয় তাহলে কি থেরাপিস্ট হিসেবে তার চিকিৎসা করা উচিত? এরকম কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংজনিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কাউন্সেলর এবং রুগির স্বার্থ রক্ষার জন্য নৈতিক নির্দেশিকা থাকে।

এরকম নির্দেশিকা কাউন্সেলরদের নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে সাহায্য করে। যদি পেশাদারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে নৈতিক নির্দেশিকার নিয়মগুলো মিলে যায় তাহলে কাউন্সেলর একজন পেশাদারের মতো করেই কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া চালায়। আর কাউন্সেলিং করার ঘরে কাউন্সেলর তার মতামত জানায় রুগিকে করা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে।

নৈতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী যদি কাউন্সেলিং-এর সময়ে অস্বস্তিকর কিছু বোধ হয় তাহলে রুগি তার এই অস্বস্তির অনুভূতির প্রকৃত ব্যাখ্যা কাউন্সেলরের কাছ থেকে জানতে পারে। এবং এক্ষেত্রে তার উচিত কাউন্সেলরকে বিশ্বাস করা। যদি চিন্তার বিষয়টা চিহ্নিত করা না যায় তাহলে অন্য কোনও কাউন্সেলরের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে অথবা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান যারা কাউন্সেলিং করে তাদের সাহায্য নিয়ে চিন্তার প্রকৃত ব্যাখ্যা করা জরুরি। সাধারণ কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় নীতিগত নির্দেশিকায় এ-ও বলা রয়েছে যে যখন কাউন্সেলরের সঙ্গে রুগির কোনও সমস্যা হবে তখন তা সমাধানের জন্য নির্দেশিকার সাহায্য নেওয়া যাবে।

দুর্ভাগ্যবশত ভারতে এমন কোনও কর্তৃপক্ষ নেই যারা একজন মানুষকে কাউন্সেলর হিসেবে শংসাপত্র দেয় ও তাদের নৈতিক কিছু নির্দেশিকা মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে। এমন কোনও প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে প্রশিক্ষণের সাহায্যে এই ধরনের নৈতিক নির্দেশিকা তৈরি করা যায় এবং তারপর প্রশিক্ষিতরা তা মেনে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় যোগদান করে। কাউন্সেলিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণের আবেদন করার জন্য কয়েকটি সামান্য নিয়মকানুন রয়েছে। যার ফলে রুগির উপরেই কাউন্সেলর সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার ভার পড়ে এবং কাউন্সেলিং করার জন্য আদৌ কাউন্সেলরের প্রশিক্ষণ রয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখার দায়িত্বও নিতে হয় রুগিকে। এর সঙ্গে কাউন্সেলিং এবং কাউন্সেলর শব্দটাকেও অত্যন্ত তুচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একজন কাউন্সেলরের ভালো উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও শুধু কাউন্সেলিং-এর শংসাপত্র না থাকার জন্য তারা নিজেদের কাউন্সেলর হিসেবে দাবি করতে পারে না।

রুগিদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই ধরনের নির্দেশিকা থাকলে একজন কাউন্সেলর কোথা থেকে কী ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছে তা জানা সহজসাধ্য হয়। সেই সঙ্গে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কীরকম নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা জরুরি সে সম্পর্কেও তাদের মনে ধারণা জন্মায়। এছাড়া এর সাহায্যে কাউন্সেলিং পেশার দক্ষতার প্রতি রুগির আগ্রহ জন্মায় যা কাউন্সেলিং-কে সত্যিকারের একটা পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।

প্রবন্ধটি লিখেছেন পরিবর্তন কাউন্সেলিং ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের কাউন্সেলর এবং প্রশিক্ষক শবরী ভট্টাচার্য।  

প্রস্তাবিত