We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

স্তনপান সম্পর্কে আপনার যা জানা উচিত

স্তনপানের সময়ে একজন মায়ের যত্ন নেবার জন্যে পরিবারের সবার এই বিষয়ে আগে ভাল করে জেনে নেওয়া উচিত।

স্তনপানের ফলে যে শুধু আপনার শিশু সংক্রমণ মুক্ত থাকে তাই না, এটি মা ও তাঁর সন্তানের সম্পর্ককেও আরও সুদৃঢ় করে তোলে। পবিত্র জয়রামন –এর সাথে কথা বলতে গিয়ে স্তনপান বিশেষজ্ঞ শৈব্য সালদানহা এই বিষয়েই জোর দেওয়ার পাশাপাশি জানালেন যে কিভাবে একজন মা এই সময়ে বিভিন্ন সমস্যাকে অতিক্রম করতে পারেন। নির্বাচিত অংশ:

স্তনপানের সঙ্গে মানসিক সুস্থতার কী সম্পর্ক?

স্তনপান শিশুর জন্যে খুবই জরুরি। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক সময়ই নানান সমস্যার কারণে তা সুষ্ঠু ভাবে হয়ে উঠতে পারে না। গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পরেই আসে স্তনপান, কাজেই সেটা ঠিকমত না হলে অথবা তা নিয়ে মা অত্যাধিক  দুশ্চিন্তা বা হতাশায় ভুগলে, ধীরে ধীরে তাঁর মানসিক স্বাস্থ ব্যপক হারে বিপর্যস্ত হতে পারে।

শহরাঞ্চলে মহিলারা স্তনপানে কী ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন?

মানুষের স্বভাবই হল পরকে দেখে শেখা। তা সে হাত দিয়ে খাওয়াই হোক, বা চামচ দিয়ে খাওয়া; অথবা প্রকৃতির ডাকে সারা দেওয়ার পর জল বা টিস্যুর ব্যবহার, এ’সব কোনও কিছুই নিজে থেকে মানুষ শেখে না। আমি খুব খুশি হলাম যে আপনি শহরাঞ্চলের মহিলাদের কথা জিজ্ঞেস করলেন কারণ মিডল ক্লাস কালচারে স্তনপান এক গোপন অভ্যাস। ফলে শহরাঞ্চলে বড় হওয়া খুব কম মেয়েই ছোটবেলায় স্তনপান দেখে বড় হয়। গ্রামাঞ্চলে বা বস্তিতে অনেক মেয়েই ছোটবেলায় তাঁদের মাকে বা বৌদিকে স্তনপান করাতে দেখে। কাজেই সে কিন্তু সেটা না বুঝলেও, শিখে ফেলে  - কিভাবে সন্তানকে কোলে নেব, দুধ খাওয়াব, ঢেঁকুর তোলাব। তাই, তাঁদের কোনও স্তনপান বিশেষজ্ঞের পরামর্শ লাগে না।

স্তনপান বিশেষজ্ঞরা একজন মহিলাকে সব কিছু শিখতে সাহায্য করেন। অনেকে তো জানেনই না যে অনেক সময় প্রথম বার ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত বুকে দুধই আসে না। দ্বিতীয় দিনে, তা আনুমানিক ২০-৩০ মি.লি. মতন হয়। তৃতীয় দিনে বুকে দুধ আসতে শুরু করে এবং স্তন অত্যন্ত শক্ত এবং পিণ্ডাকার হয়ে ওঠে। তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েন যখন, প্রথম ৩-৪ দিনে বাচ্চার ওজন কমতে শুরু করে। তাঁরা ভাবেন, “হে ভগবান, বাচ্চার ওজন কমে যাচ্ছে। এবার কী হবে?” তখন বাচ্চার যত্ন নেওয়ার চাপে তার দুধ খাওয়ার দিকে নজর দেন না।

স্তনপানের প্রস্তুতি কবে থেকে নেওয়া উচিত?

প্রসবের পর, সেলাই-এর স্থানে যন্ত্রণা শুরু হয়, স্তন অত্যন্ত শক্ত এবং পিণ্ডাকার হয়ে ওঠে এবং মহিলা ঘুমাতে পারেন না; এই সময় তাঁকে স্তনপান নিয়ে জ্ঞ্যান দিয়েও লাভ নেই। যদি দিতেই হয়, তাহলে তা প্রসবের আগেই দেওয়া উচিত। পরিবারের সাথে এই নিয়ে একত্রে আলোচনায় বসা উচিত, কারণ শিশুর স্তনপান শুধু মায়ের দায়িত্ব না। তাঁর স্বামী, মা, শাশুড়ি এবং পরিবারের অন্য যে সদস্যরা মায়ের যত্ন নেবেন, সবারই স্তনপান সংক্রান্ত সমস্যাগুলি জেনে নেওয়া উচিত। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ভুল ধারণা। আপনার জেনে নেওয়া উচিত, “কী কী শুনেছ?” কারণ তাঁরা হয়ত বলবেন, “ওহ! আমার বন্ধুর তো একদমই দুধ আসত না” বা “বাচ্চা খেতেই চাইত না” বা “সারারাত কাঁদত” ইত্যাদি। এই অবান্তর জ্ঞানের ফলে শিশুর মা আরও অসুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

স্তনপান করানো এত কঠিন কাজ কেন?

গর্ভাবস্থা ও তার পরে, স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি বেড়ে যায়, বিশেষত যদি মহিলা মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত না হন। পরিবারের সদস্যদের জেদে, তাঁরা অনেক সময়ই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মা হতে বাধ্য হন। উপরন্তু যদি শিশুর লিঙ্গ বা গায়ের রঙ পছন্দ না হয়, তাহলে তাঁরা মানসিক ভাবে আরোই ভেঙ্গে পড়েন।

আমার এক রোগীর একটি বাচ্চা মেয়ে হয়েছিল। তিনি, তার স্বামী এবং পরিবারের সবাই খুব খুশি ছিলেন। তিনি জন্মের সাথে সাথেই বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে শুরু করেন। দ্বিতীয় দিনে, আমি টহল দিতে গিয়ে দেখলাম সে বসে কাঁদছে, এবং বাচ্চাটারও মেজাজ খারাপ। জানতে পারলাম যে বাচ্চা নাকি সারারাত কেঁদেছে এবং তিনি দুধও খাওয়াননি। আমি জানার চেষ্টা করলাম যে তাঁর সেলাই –এর স্থানে কোনও রকম যন্ত্রণা হচ্ছে কিনা, বা ঘরে কোনও সমস্যা আছে কিনা। আরও কিছুটা জেরা করে জানতে পারলাম যে সেই মহিলার এক পিসি বলেছেন, “এমা কি কালো বাচ্চা। এমা এটা দেখি মেয়ে।” ব্যাস! মহিলা তার আগে অবধি খুশি ছিলেন, বাচ্চাকে ঠিকঠাক দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। কিন্ত তাঁর পিসির অমানবিক কথাবার্তার জন্যে মহিলা ভেঙ্গে পড়েছিলেন।

স্তনপানের ফলে মা ও সন্তানের সম্পর্ক কিভাবে গড়ে ওঠে?

স্তনপানের সময় অক্সিটোনিন নামে একটি হরমোনের নিঃসরণ হয়। একে আদরের হরমোন বলা হয়। এই নামটি ভ্যালেন্টাইন’স ডে –তে খুবই জনপ্রিয়। এর ফলেই মা এবং তার সন্তানের মাঝে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। স্তনপান করানোর সময় মা অনেক নিশ্চিন্ত বোধ করেন এবং শিশুকে আরামে রাখার চেষ্টা করেন। শিশুও এদিকে ন’মাস পরে গর্ভের বাইরে নতুন পরিবেশে মায়ের কোলকেই নিজের দুনিয়া বানিয়ে নেয়। মায়ের বুকে মাথা রেখে সে এই ন’মাসের অতি পরিচিত শব্দ – মায়ের হৃদপিণ্ডের কম্পন শোনে! এভাবেই গড়ে ওঠে সম্পর্ক। এই সবের পরে আসবে ঠিক করে বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার প্রসঙ্গ! অনেক মহিলাই, যারা মা হতে চান এবং হওয়ার পরেও খুশি থাকেন, ধীরে ধীরে সমস্ত নিয়ম-কানুন শিখে নেন। মানুষের ক্ষেত্রে বাচ্চাকে দুধ খেতে শেখাতে হয়। কুকুর ছানা বা বেড়াল ছানা যেমন নিজে থেকেই শিখে ফেলে, আমাদের ক্ষেত্রে তা হয় না। কাজেই বাচ্চাকে কিভাবে কোলে নেবেন, খাওয়াবেন তা জানা দরকার বৈকি।

কর্মরত একজন মহিলাও কি স্তনপান করাতে পারেন?

শিল্পায়নের ফলে স্তনপানের অভ্যাস অত্যবত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ মানব সম্পদের চাহিদা মেটেতেই কৃত্রিম দুধ খাওয়ানর অভ্যাসটি শুরু করা হয়। এর ফলে শিশুর স্বাস্থের ব্যাপক রকম ক্ষতি হয়। এই যে বিভিন্ন সরকারি চাকুরীতে ৮৪ দিনের চেয়ে বেশি মাতৃত্বকালীন ছুটি না দেওয়া হয়, প্রাইভেটে তো আরও কম; এতে সবথেকে বেশি ক্ষতি হয় নিষ্পাপ শিশুটির। তা সত্বেও, মনে সদিচ্ছা থাকলে কিন্তু শিশুকে স্তনপান করানো যায়। যদি খিলে রাত্রের দিকেও তিনি বাচ্চাকে দুশ খাওয়ান তাহলেও অন্তত পক্ষে সে ৫০০-৬০০ মি.লি. দুধ খেতে পাবে। দিনের বেলায় উনিশিশুর জন্য সহজপাচ্য খাবার তৈরি করতে পারেন। কৃত্রিম বা কৌটোর খাবার সম্পূর্ণ বর্জন কা উচিত।

মনোরোগী একজন মা কি তার বাচ্চাকে স্তনপান করাতে পারেন?

আগে আপনাকে জানতে হবে যে মহিলা কি আদৌ মানসিক ও শারীরিক ভাবে মা হতে তৈরি? কারণ দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে, এটা ধরে নেওয়া হয় যে মেয়ে মানসিক রোগী হলে তাঁকে কোনও রকমে ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত, এবং মা হওয়ার পর সব ঠিক হয়ে যাবে। বলাই বাহুল্য যে এই ধরণের মানসিকতা মা এবং সে শিশু উভয়ের পক্ষেই বিপজ্জনক। যদি কোনও মহিলা তার স্বামীর যথোপযুক্ত সহায়তার মাধ্যমে রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন, তবেই গর্ভাবস্থার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। তাঁদের অনেক বেশী স্নেহ, যত্ন, ভালবাসা ও সহায়তার প্রয়োজন। তাঁদের কে কখন কি ওষুধ খেতে হবে তা বোঝানো প্রয়োজন, এবং সেই রকম হলে তিনি প্রসবের পরেও নির্ভয়ে ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশিও শিশুকে স্তনপান করাতে পারেন।

একজন নতুন মায়ের প্রতি তার পরিবারের ভূমিকা কী?

স্তনপান তখনই সফল হবে যদি প্রসবের পরে মহিলা তার পরিবার এবং চিকিৎসকের কাছ থেকে সন্তানের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সহায়তা পান। এর ফলে মহিলার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্ম নেবে। এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিশুকে দুধ খাওয়ালে, তিনি মাতৃত্ব উপভোগ করবেন। এটি একজন মায়ের জন্য একজন মায়ের পক্ষে এক অভিনব অভিজ্ঞতা, এবং শিশুর পক্ষে এক সুন্দর যাত্রার সূত্রপাতও বটে।

আমরা মনে করি যে, স্তনপান সন্তানের প্রথম টিকাকরন। সন্তানের মানসিক গড়ন, সক্রমনের সাথে লড়াই, মায়ের সাথে সম্পর্ক, এই সব কিছুই এই সময়ে গড়ে ওঠে। এই জন্যে সবার আগে আমাদের পরিবারবিদ্যায় স্তনপানের গুরুত্ব বুঝতে হবে। অর্থাৎ, মা, শাশুড়ি, ঠাকুমাদের এই নতুন মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে। একজন স্বামীকেও এই অবস্থায় তার পাশে দাঁড়াতে হবে, কারণ একজন মহিলার জন্যে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।